যেখানে হারিয়ে যেতে নেই মানা

এমএনএ ডেস্ক রিপোর্ট : চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চন্দ্রঘোনার এলাকায় অবস্থিত শেখ রাসেল এভিয়ারি অ্যান্ড ইকো পার্ক। যেখানে হারিয়ে যেতে নেই মানা। ওপরে দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ। নিচে দৃষ্টি নন্দন লেক আর সবুজ অরণ্য। এরকম পরিবেশে হারিয়ে যেতে কার না মন চায়!

লেক আর সবুজ অরণ্য ঠিক এই দু’য়ের মাঝখানে ভূমি থেকে প্রায় দুইশ ফুট উচ্চতায় যদি বসে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া যায়! বাতাসের ওপর ভেসে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাওয়া যায়! এমন সময় যদি আপনার চোখের সামনে দিয়ে উড়ে যায় বক, টিয়া কিংবা শঙ্খ চিল।

যদি দেখা মেলে গাছে গাছে বানরের দুষ্ট-মিষ্টি লাফালাফি! তাহলে আপনার অনুভূতিটা কেমন হতে পারে? আর সেটি যদি হয় অত্যাধুনিক ও সুনিরাপদ ক্যাবল কারে চড়ে তাহলেতো আর কথায়ই নেই। শুধু ক্যাবল কারে বসে সবুজ বৃক্ষরাজি আর লেকের সৌন্দর্য দেখেই আপনার মুগ্ধতার রেশ কাটছে না। এই রোমাঞ্চকর যাত্রা শেষ হতে না হতেই সঙ্গে সঙ্গে আপনি দেখতে পাবেন দৃষ্টি নন্দন পাখি ম্যাকাও আর গ্রেপ্যারট, ইলেকট্রাস প্যারটের মতো বিদেশি পাখির চোখজুড়ানো রূপ। আর দেশীয় প্রজাতির নানা জাতের প্রায় দুইশ’ পাখির সুরালো কিচিরমিচির ডাক তো থাকছেই।

যান্ত্রিকতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ এই জীবনে যদি প্রকৃতির এতোই কাছে যাওয়ার সুযোগ মেলে তাহলে নিশ্চিত সেটি মিস করতে চাইবেন না কেউ। প্রায় আড়াই কিলোমিটারের ক্যাবল কারে চড়ে পাহাড় আর লেকের সৌন্দর্য দেখার সুযোগের জন্য ভাবছেন আপনাকে থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়ায় যেতে হবে? না আপনাকে কোথাও যেতে হবে না।

প্রকৃতির এই রূপের সৌন্দর্য বিছিয়ে দিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চন্দ্রঘোনার এলাকায় অবস্থিত শেখ রাসেল এভিয়ারি অ্যান্ড ইকো পার্ক। দেশি-বিদেশি প্রকৃতি প্রেমিদের মন জুড়াতে একেবারে প্রকৃতি প্রদত্ত সৌন্দর্য ও সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে শেখ রাসেল এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্ককে। গত ৪ ডিসেম্বর পার্কে নতুন করে ক্যাবল কার সংযোজন করার পর থেকে চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে এই পার্কটি।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কোদালা বন বিটে হোসনাবাদ ইউনিয়নের নিশ্চিন্তাপুর এলাকায় কাপ্তাই সড়কের পাশ ঘেঁষেই পাহাড় ও সমতলের প্রায় পুরো ৫২০ একর এলাকা জুড়ে পার্কটি গড়ে উঠেছে। ২০১০ সালের ৭ আগস্ট ব্যতিক্রমী এ পক্ষিশালার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন স্থানীয় সাংসদ তৎকালীন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। আর ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাগড়াছড়ি থেকে টেলি কনফারেন্সের মাধ্যমে এটির উদ্বোধন করেন।

এই পার্কটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে সর্বমোট ৩০ কোটি টাকা। এই পার্কে ভেষজ ও অন্যান্য প্রায় ৭১ হাজার নানা প্রজাতির গাছ ও ৩০ হাজার সৌন্দর্যবর্ধক গাছ রোপণ করা হয়েছে। পার্কের চারপাশে এক ধরনের বিশেষ নেট দিয়ে পুরো ৫২০ একর পাহাড়ি ভূমি ঘিরে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে রয়েছে রেস্টহাউস, ঝুলন্ত সেতু, আধুনিক  রেস্তোরাঁ, লেক, হেলানো বেঞ্চ, আরসিসি স্টিল ছাতা, ওয়াচ টাওয়ার এবং শিশুদের সময় কাটানোর বিনোদনের ব্যবস্থা। এছাড়াও রয়েছে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ট পুত্র শেখ রাসেলের ম্যুরাল, হরিণ বিচরণক্ষেত্র ও কুমির প্রজনন ক্ষেত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রণিজগৎ সম্পর্কে গবেষণায় সহায়তার জন্য রয়েছে গবেষণা কেন্দ্রও।

এই পার্কে বাবুই, দোয়েল, শ্যামা, শালিক, ঈগল, শকুন, বুলবুলি, পেঁচা, হলদে পাখি, টুনটুনি, টিয়া, ঘুঘু, মাছরাঙা, সাদা বকের মতো বিলুপ্ত প্রায় ২শ প্রজাতির পাখি সংরক্ষণ করা হয়েছে। দেশী প্রজাতির পাখির পাশাপাশি এই পক্ষিশালায় যুক্ত হয়েছে আফ্রিকার পলিক্যান, সোয়ান, রিং ন্যাক, ইলেকট্রাস প্যারট, মেকাউসহ বিভিন্ন বিদেশি পাখি।

সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের বিশেষ সহকারী এনায়েতুর রহীম বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্ক নেই। এশিয়ায় শুধু মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে এ পার্ক রয়েছে। এশিয়ার তৃতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই পার্কটি। ইতোমধ্যে পার্কটি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে হাজার হাজার পর্যটকদের কাছে টানছে দেশের প্রথম ক্যাবল কার সমৃদ্ধ এই পার্কটি।’

বৃক্ষাচ্ছাদিত সবুজ এই পাহাড়ি বন-জঙ্গলে চোখের সামনেই উড়ে যাচ্ছে শত শত পাখি। পাখিদের কলতানে মুখরিত হচ্ছে বুজ বন। গত ৪ ডিসেম্বর এই পার্কের সবচেয়ে প্রধান আকর্ষণ ক্যাবল কার সংযোজন ভ্রমণ পিপাসুদের মনে বাড়তি আনন্দ দিচ্ছে। এ বিনোদন কেন্দ্রের পাশেই রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ কল কর্ণফুলী পেপার মিল।

তার ১ কিলোমিটার পূর্বে গেলে কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক, কর্ণফুলী নদীর পাড়ে জুম রেস্তোরাঁ, বনশ্রী পর্যটন, নেভি পার্ক ও সর্বশেষ বাংলাদেশের একমাত্র পানিভিত্তিক কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র।  পার্কে প্রবেশ মূল্যের দাম হচ্ছে ২৩ টাকা আর ক্যাবল কার চেপে যদি পার্কের আসল সৌন্দর্য দেখতে চান তাহলে আপনাকে ব্যয় করতে হবে ২৩০ টাকা। তবে শিশুদের জন্য সেই মূল্য ধরা হয়েছে ১১৫ টাকা। মোট ১২টি ক্যাবল কার রয়েছে এই পার্কটিতে। রয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক পথে বাসে চেপে এক ঘণ্টার মধ্যে রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত শেখ রাসেল এভিয়রি ও ইকোপার্কে সহজেই পৌঁছা যায়।

Scroll Up