Ramadan Lantern

সমাজ জীবনে মাহে রমজানের অপরিসীম প্রভাব

মীর মোশাররেফ হোসেন (পাকবীর) : মানব জাতির সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যেই রমজানের আগমন। অতএব সঙ্গত কারণেই আমাদের সমাজে রয়েছে মাহে রমজানের অপরিসীম প্রভাব।
রমজানে বিশ্বের মুসলমানরা অত্যন্ত আগ্রহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে রোজা পালন করে থাকেন। রোজার মাধ্যমে তারা আল্লাহতায়ালার আদেশ-নিষেধ মোতাবেক জীবন চলার পথ পরিচালনা করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সমাজে নিয়ম-শৃঙ্খলা ফিরে আসে, সমাজ হয় সুন্দর-সুশোভিত। মাহে রমজানে আমাদের মধ্যে জবাবদিহিতার অনুভূতি বৃদ্ধি পায়। যদ্দরুন যাবতীয় কাজ-কর্মে বিশেষ গতি ফিরে আসে। কাজে গতি আসলে সমাজের উন্নতি ত্বরান্বিত হয়।
সিয়ামের প্রভাবে বিশেষত: রোজাদাররা কাজে যেমন নিষ্ঠাবান হয়ে উঠেন তেমনি কথা-বার্তায়ও সত্যপরায়ণ হয়ে উঠেন। কেউ কাউকে ঠকানোর চেষ্টা করেন না বরং অপরের অধিকার বুঝিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকেন। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি, হৃদ্যতা ইত্যাদি বেড়ে যায়। এভাবে সমাজব্যবস্থা হয়ে উঠে সাবলীল-সুখময়।
মাহে রমজানে মুসলিম সমাজ সকল প্রকার ঝগড়া-বিবাদ, কটূ কথা ও অশ্লীলতা-বেহায়াপনা পরিহার করে একটি সুন্দর জীবন যাপনে ব্রতী হয়। কেউ কোনো রোজাদারকে গালি দিলেও সে হাদিসে বাণী অনুসারে বলে দেয়- ‘আমি রোজাদার।’ এরূপ পরিবেশ যেখানে বিদ্যমান থাকে সেখানে আদৌ ঝগড়া-বিবাদ হতে পারে না। ফলে সমাজে অবধারিতভাবেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত থাকে।
রমজানের রোজার প্রভাবে মুসলিম সমাজে সকল প্রকার লোভ-লালসা হ্রাস পায়। ফলে যাবতীয় হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে একে অপরকে বিশ্বাস করে, ভালোবাসে। সকলেই ওয়াদা-আমানত রক্ষা করে চলতে সচেষ্ট হয়। এছাড়া রোজার প্রভাবে যেহেতু কু-প্রবৃত্তিসমূহ অবদমিত হয় সেহেতু সমাজের মানুষের মধ্যে শংকা থাকে না, নিরাপত্তার কোনরূপ অভাব বোধ হয় না। গোটা সমাজেই এরূপ অবস্থার প্রতিফলন ঘটে।
আমাদের সমাজে মাহে রমজানে ভ্রাতৃত্ব-ভালোবাসা, উত্তম আচরণ, দানশীলতা ইত্যাদি যেমনটি প্রত্যক্ষ করা যায় অন্য সময়ে তেমনটি কল্পনা করতেই কষ্ট বোধ হয়। এ মাসকে কেন্দ্র করে বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সমবয়সীদের প্রতি সৌহার্দ্য ও ছোটদের প্রতি স্নেহের মাত্রা বেড়ে যায়। এভাবে আমরা একটি বেহেশতি পরিবেশ অনুভব করি।
রমজান মাসে মুসলিমরা তাদের অধীনস্তদের প্রতি অন্য সময়ের তুলনায় বেশি সদয় হন। অনেকেই তাদের খাটুনিকে কমিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে অধীনস্তদের বোঝা হালকা করে দিবে তাকে আল্লাহ মাফ করে দেবেন ও জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন। মুসলিমদের মধ্যে এর অনুশীলন হয় যার প্রভাব সমাজে পড়ে । ফলে মালিক-শ্রমিক সকলের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। এ সুসম্পর্ক অর্থনীতির চাকাকে মজবুত করে।
এ মাসে দানশীলতা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। বিশেষত রোজাদাররা গরীব-দুঃখী, অসহায় এতিম- মিসকিনদের প্রতি তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। ফলে তাদের মাঝে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে আসে। সাধারণ দান ছাড়াও বিত্তবানরা ফেতরা, জাকাত ইত্যাদি আদায় করে থাকেন। এভাবে সমাজের একটি বিরাট অংশ রোজা দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাদের জন্য মাহে রমজান সত্যিই আশীর্বাদস্বরূপ।
রমজান মাসে বিভিন্ন অফিস-আদালতের কাজে জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধ বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে রাসূল (সা.)-এর সেই হাদিস স্মরণযোগ্য। ‘সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ তাই আমরা দেখি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আত্মপর্যালোচনার সঙ্গে তাদের কাজ-কর্ম সম্পাদন করে থাকেন। এভাবে কাজ করলে কাজ অনেক সুচারুরূপে সম্পাদিত হয়। ফলে সামগ্রিকভাবে সমাজের উন্নতি বিধান হয়।
মাহে রমজানে আমাদের সমাজে এক অভূতপূর্ব ঐক্য, সাম্য-মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ বিরাজ করে থাকে। ধনীব্যক্তিরা রোজা রাখার ফলে দরিদ্রের কষ্ট কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারেন। ফলে তারা হতদরিদ্র মানুষদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। এছাড়া একত্রে তারাবি নামাজ আদায় করা কিংবা একত্রে ইফতারির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি সামষ্টিক কাজের দরুন উঁচু-নীচু, ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ অনেকাংশেই বিলীন হয়ে যায়।
মাহে রমজানের প্রভাবে কোরআন তেলাওয়াত বৃদ্ধি পায়। কোরআনের বক্তব্যকে জানার আগ্রহ তথা সামগ্রিক জ্ঞান চর্চা বৃদ্ধি পায়। তাকওয়া অর্জনের প্রচেষ্টা চলে। ঈমানদারগণ নেকির কাজে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে অগ্রসর হয়। কোরআনের সেই আয়াত এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য। ‘তোমরা দৌড়াও তোমার রবের মাগফিরাতের দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার ব্যাপ্তি গোটা আসমান ও জমিনের পরিধির ন্যায় বিশালতর। আর মুত্তাকিদের জন্যই তা নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে।’
এ মাসের মর্যাদা রক্ষার্থে মুসলিম সমাজের পাশাপাশি অমুসলিম সম্প্রদায়ও অনেক ভূমিকা রেখে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, ইতিপূর্বে ভারতে হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশ কয়েক জন সদস্য বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে এবং রোজা থেকে কল্যাণ লাভের আশায় মুসলমানদের সঙ্গে রোজা পালন  করেছেন। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকে মাহে রমজানকে সম্মান দেখানোর এরূপ ঘটনা ইতিহাসে অনেক রয়েছে।
অতএব, মাহে রমজানের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আমাদের জীবনকে সুন্দর ও পরিমার্জিত করার মধ্য দিয়ে আমরা যাতে একটি কাঙ্ক্ষিত কল্যাণকর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারি যেমন কায়েম করেছিলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। এটাই এবারের রমজানে আমাদের ঐকান্তিক প্রত্যাশা।
                                                          লেখক : সাংবাদিক, সমাজ সেবক, শিশু সংগঠক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী।
x

Check Also

খতমে তারাবির কোরআন তেলাওয়াতে তাড়াহুড়া নয়

মীর মোশারেফ হোসেন : আমাদের দেশে অধিকাংশ খতমে কোরআন তারাবির মুসল্লি নিজে যে মসজিদে তারাবি ...

Scroll Up