আজ উত্তমকুমারের ৯০ তম জন্মদিন

মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ) ডেস্ক : ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেতা উত্তম কুমার। সেই মহানায়কের আজ জন্মদিন। বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হত ৯০ বছর।

বাঙালিদের চলচ্চিত্রে নিখাদ বিনোদন দিতে যিনি ছিলেন অনবদ্য। তিনি একাধারে অভিনেতা, চিত্রপ্রযোজক ও পরিচালক। চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি মঞ্চেও ছিলেন সরব। বাঙলা চলচ্চিত্র জগতে তাকে ‘মহানায়ক’ আখ্যা দেয়া হয়েছে।
সত্তরের দশক। কলকাতার সিনেমা হলগুলোর বাইরে বড় বড় পোস্টার। তাতে শুধু উত্তম-সুচিত্রা। কখনো উত্তমের সঙ্গে সাবিত্রী বা মাধবী। কখনো বা শর্মিলা। কিন্তু উত্তমকুমার কমন। তার চলন বলন, কথাবার্তা… আর সেই হৃদয়ে আলোড়ন জাগানো হাসি। সে কী আর কেউ ভুলতে পারে?
আজ মহানায়কের ৯০ তম জন্মদিন। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় মামাবাড়িতে জন্ম নেন উত্তম কুমার।
উত্তম কুমারের প্রকৃত নাম অরুণ কুমার চ্যাটার্জী। সিনেমায় এসে তার নাম পরিবর্তিত হয়ে উত্তম কুমার হয়। উত্তম কুমার কলকাতার সাউথ সাবারবান স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং পরে গোয়েন্কা কলেজে ভর্তি হন। কলকাতার পোর্টে চাকরি নিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে পারেননি। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠা পেতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে।

ফ্লপ মাস্টার। একসময় টালিউডের স্টুডিওপাড়ায় ওই নামে তাকে সবাই চিনত। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত একের পর এক সিনেমা করেছেন। কিন্তু ফ্লপ। বারবার রুপোলি পর্দা তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এভাবেই চলছিল। তারপর ১৯৫৩ সালে এল সাড়ে চুয়াত্তর। সেই শুরু। তারপর থেকে টলিপাড়ার ফ্লপ মাস্টার হয়ে গেলেন রোম্যান্টিসিজ়মের নায়ক উত্তমকুমার।

ছিলেন পোর্ট কমিশনার্সের কেরানি। বেশ ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ মাথায় ভূত চাপল সিনেমা করবেন। আর দেখে কে। টালিউডের স্টুডিও স্টুডিওয় ঘুরঘুর করতে লাগলেন তিনি। এ দরজা থেকে ও দরজা। কিন্তু কাজ জোটে না কোথাও। তাই বলে কী এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়া যায়? মোটেই না। কাজ জুটছে না তো কি? হত্যে দিয়ে পড়ে থাকলেন স্টুডিওপাড়ায়।

শেষে শিকে ছিঁড়ল। চান্স পেলেন উত্তমকুমার। দিলেন নীতিন বোস। আর প্রথম সিনেমাতেই জাঁদরেল অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ। ছবি বিশ্বাস, অসীত বরণ, কৃষ্ণচন্দ্র দে… চাপ খাওয়ারই কথা। কিন্তু ঘাবড়ালে চলবে কেন? তাকে যে হিরো হতে হবে। সিনেমা হল। মুক্তিও পেল। কিন্তু ফ্লপ। তার পরেরটাও ফ্লপ। তার পরেরটাও। এর মধ্যে ঘটল আর এক ঘটনা। ওরে যাত্রী সিনেমার শুটিং চলছে। অভিনয়ে ব্যস্ত উত্তমকুমার। হঠাৎই ফ্লোর থেকে ভেসে এল টিটকিরি। চেহারা তো বটেই, অভিনয় নিয়েও কমপ্লিমেন্টের বাহারে টেকা দায়। কেউ বলে নেক্সট দূর্গাদাস, কেউ আবার ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে তুলনা টানে। আর একের পর এক ফ্লপ সিনেমার হিরোর তখন অবস্থা টাইট।

কিন্তু সময় কখনো থেমে থাকে না। এক্ষেত্রেও তাই হল। সাড়ে চুয়াত্তর-এর অফার পেলেন উত্তমকুমার। নায়িকা নবাগতা সুচিত্রা সেন। বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। অভিনয়ের অ-ও জানেন না। কিন্তু রিস্ক নিলেন উত্তমকুমার। এমনিতেই বরাত খারাপ যাচ্ছে। একটা ট্রাই নিলে আর কী ক্ষতি হবে? তার পরের কথা তো সবাই জানে।

তবে এর আগে অবশ্য উত্তমকুমারের ভাগ্যে একটু আধটু প্রশংসা জুটেছিল। নির্মল দের বসু পরিবার সিনেমায়। সমালোচনায় বেরিয়েছিল উত্তম নাকি অসম্ভব লাউড অভিনয় করেছেন। উত্তমকুমার তো এও বলেছিলেন, নিজের প্রশংসা শুনতে তিনি দর্শকের ভিড়ে মিশে যেতেন। চোখে কালো চশমা পরে নিতেন, যাতে তাকে কেউ চিনতে না পারে।

সাড়ে চুয়াত্তর সিনেমার পর ততদিনে উত্তম বুঝে গেছেন, তাকে ঠিক কী করতে হবে। কীভাবে নিজেকে প্রেজ়েন্ট করতে হবে ক্যামেরার সামনে। কীভাবে দর্শকের কাছে প্রেজ়েন্টেবল হতে হবে। আর উত্তমের হোমওয়ার্ক যে ষোলো আনা কাজে দিয়েছিল তা তার সিনেমাগুলো দেখলেই বোঝা যায়।

পরবর্তীতে উত্তমকুমার আকাশ ছোয়া খ্যাতি পেলেও, পা রাখতেন মাটিতেই। শোনা যায়, শুটিংয়ের সময় একটা শটের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন তিনি। অধৈর্য হওয়া তার ধাতে ছিল না।

উত্তম কুমারের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ছিল দৃষ্টিদান। এই ছবির পরিচালক ছিলেন নিতীন বসু। এর আগে উত্তম কুমার মায়াডোর নামে একটি চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন কিন্তু সেটি মুক্তিলাভ করেনি। বসু পরিবার চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম দৃষ্টি আকর্ষন করেন। এরপর সাড়ে চুয়াত্তর মুক্তি পাবার পরে তিনি চলচ্চিত্র জগতে স্থায়ী আসন লাভ করেন। সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে তিনি প্রথম অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের বিপরীতে অভিনয় করেন। এই ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সফল উত্তম-সুচিত্রা জুটির সূত্রপাত হয়।
উত্তমকুমার এবং সুচিত্রা সেন বাংলা চলচ্চিত্রে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অনেকগুলি ব্যবসাসফল এবং প্রশংসিত চলচ্চিত্রে মুখ্য ভূমিকায় একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। এগুলির মধ্যে প্রধান চলচ্চিত্রগুলো হল, হারানো সুর, পথে হল দেরী, সপ্তপদী, চাওয়া পাওয়া, বিপাশা, জীবন তৃষ্ণা এবং সাগরিকা।
উত্তম কুমার বহু সফল বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি হিন্দি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। তাঁর অভিনীত হিন্দি চলচ্চিত্রের মধ্যে ছোটিসি মুলাকাত, অমানুষ এবং আনন্দ আশ্রম অন্যতম। তিনি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। প্রথমটি নায়ক এবং দ্বিতীয়টি চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানা চলচ্চিত্রে তিনি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
সঙ্গীতের প্রতিও ছিল তার অসীম ভালবাসা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা মান্না দে’র গানেই সবচেয়ে বেশি ঠোঁট মিলিয়েছেন উত্তম। ছবির গান রেকর্ডিংয়ের সময় শিল্পীর পাশে বসে তার অনুভূতি উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন। এতে করে না কি পর্দায় ঠোঁট মেলাতে তার বেশ সহজ হতো। সঙ্গীতপ্রেমী উত্তম ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবির সবগুলো গানের সুরারোপ করেন। ছবিটি ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায়। অভিনেতা প্রযোজক, পরিচালক, সব মাধ্যমেই তিনি ছিলেন সফল।
উত্তম কুমার অভিনীত, পরিচালিত, প্রযোজিত এবং সুরারোপিত চলচ্চিত্রের তালিকার জন্য দেখুন উত্তম কুমারের চলচ্চিত্রের তালিকা :
* দৃষ্টিদান (১৯৪৮)
* কামনা (১৯৪৯)
* মর্যাদা (১৯৫০)
* সহযাত্রী (১৯৫১)
* ওরে যাত্রী (১৯৫১)
* নষ্টনীড় (১৯৫১)
* সঞ্জীবনী (১৯৫২)
* বসু পরিবার (১৯৫২)
* কার পাপে (১৯৫২)
* সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩)
* নবীন যাত্রা (১৯৫৩)
* লাখ টাকা (১৯৫৩)
* বৌ ঠাকুরানীর হাট (১৯৫৩)
* সদানন্দের মেলা (১৯৫৪)
* ওরা থাকে ওধারে (১৯৫৪)
* মনের ময়ূর (১৯৫৪)
* মরণের পারে (১৯৫৪)
* মন্ত্র শক্তি (১৯৫৪)
* কল্যাণী (১৯৫৪)
* গৃহপ্রবেশ (১৯৫৪)
* চাঁপাডাঙার বউ(১৯৫৪)
* ব্রতচারিনী (১৯৫৪)
* বকুল (১৯৫৪)
* বিধিলিপি (১৯৫৪)
* অনুপমা (১৯৫৪)
* অন্নপূর্ণার মন্দির (১৯৫৪)
* অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪)
* সাঁঝের প্রদীপ (১৯৫৫)
* উপহার (১৯৫৫)
* শাপ মোচন (১৯৫৫)
* হ্রদ (১৯৫৫)
* সবার উপরে (১৯৫৫)
* কঙ্কাবতীর ঘাট (১৯৫৫)
* রাইকমল (১৯৫৫)
* দেবত্র (১৯৫৫)
উত্তম কুমার বহু সফল বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি হিন্দি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। তাঁর অভিনীত হিন্দি চলচ্চিত্রের মধ্যে ছোটিসি মুলাকাত, অমানুষ এবং আনন্দ আশ্রম অন্যতম। তিনি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় দু’টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। প্রথমটি নায়ক এবং দ্বিতীয়টি চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানা চলচ্চিত্রে তিনি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। রোমান্টিক ছবির ফাঁকে দু’একটা ভিন্ন সাদের ছবিতেও অভিনয় করছেন তিনি। এর মধ্যে একদিন সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে ডাক পেলেন উত্তম ‘নায়ক’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য।

শুধু সিনেমর ফ্রেমেই বন্দি থাকেননি উত্তমকুমার। মঞ্চেও অভিনয় করেছেন তিনি। উত্তমকুমারের আরেকটি বড় গুণ ছিল, কখনো কোনো শিল্পী সমস্যায় পড়লে আগে এগিয়ে যেতেন তিনি। বিশেষ করে কেউ আর্থিক সমস্যায় পড়লে সাহায্য করতে দ্বিধা করতেন না তিনি।

তাই তো এখনো তিনি মধ্যগগনে বিদ্যমান। একমেবদ্বিতীয়ম মহানায়ক। ২০০শ’রও বেশি বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। এ ছাড়া একাধিক হিন্দি সিনেমাতে অভিনয় করেছেন। অভিনেতা ছাড়াও তিনি প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবেও সফলতা পেয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

x

Check Also

আগামীকাল বুধবার পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

এমএনএ রিপোর্ট : আগামীকাল বুধবার পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। নবী দিবস। এটি মানবজাতির শিরোমণি। মহানবী ...

Scroll Up