ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না: সেলিম ওসমান

এমএনএ রিপোর্ট : নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমানের কাছে সাংবাদিকেরা জানতে চান, এ ঘটনায় সারা দেশের লোক ‘সরি স্যার’ বলছে। সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক মহল থেকে সাংসদের ক্ষমা চাওয়ার দাবি উঠেছে। আপনি ক্ষমা চাইবেন কি না? এতে সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্ন করে সাংসদ বলেন, ‘আমি কার কাছে ক্ষমা চাইব? আল্লাহর কটাক্ষকারীর সাজা হয়েছে। আমি যদি মরেও যাই, তা-ও ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে ‘তার-ছেঁড়া’ উল্লেখ করে স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমান বলেছেন, শিক্ষক ইসলামধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন। জীবন বাঁচানোর জন্য তিনি স্বেচ্ছায় কান ধরে ওঠবস করেছেন।

আজ বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সাংসদ সেলিম ওসমান এই দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলন হলেও সেখানে দলের শতাধিক নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।

একজন শিক্ষককে কান ধরানো অপরাধ ও এতে আইনভঙ্গ হয়—এ কথা স্বীকার করে সেলিম ওসমান বলেন, শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে বাঁচানোর জন্য তিনি তা করেছেন। ইমানদার মুসলমানেরা শিক্ষকের শাস্তি চেয়েছিলেন দাবি করে তিনি সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, ‘আমরা কি ইবলিশের রাজত্বে বাস করছি? আপনারা জবাব দেন।’

Selim-Osman-1সংবাদ সম্মেলনে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সেলিম ওসমান বলেন, সেদিন সকাল ১০টার দিকে ঘটনা শুরু হয়েছিল। আমি সেখানে গিয়েছি বিকেল চারটায়। গিয়ে দেখি, চার থেকে পাঁচ হাজার লোক সেখানে জড়ো হয়েছে। গিয়ে আমি শুনেছি, ওই শিক্ষক একজন ছাত্রকে মেরেছিলেন। ছাত্র পরে অসুস্থ হয়ে যায়। শিক্ষক বাজার থেকে ওষুধ এনে ছাত্রকে খাওয়ান। ওই ছাত্র আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই ওই শিক্ষক ইসলামধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন বলে এলাকার লোকজন তাঁকে গণপিটুনি দিয়েছিল। পুলিশ শিক্ষককে একটি ঘরে নিরাপত্তা দিয়ে রাখে। আমি সেখানে যাওয়া মাত্র এলাকার লোক আমাকে বলেছে, ‘ওই শিক্ষককে আমাদের হাতে ছেড়ে দেন।’ কিন্তু আমি কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চাইনি।

সেলিম ওসমান বলেন, আমি তখন শিক্ষকের কাছে যাই। তিনি ইসলামধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন কি না জানতে চাই। শিক্ষক বলেন, আমার মাথার ঠিক নেই। বলতেও পারি। শিক্ষকের কাছে জানতে চাই, তোমার কী শাস্তি হবে? তিনি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেবেন বলে জানান। তিনি বলেন, আমার তিন মেয়ে আছে। তাদের বিয়ে হয়নি। সেলিম ওসমান বলেন, এ সময় তাঁর মনে হয়, তাঁর নিজেরও তিন মেয়ে আছে।

সেলিম ওসমান দাবি করেন, ওই শিক্ষক নিজেই কান ধরে ওঠবস করার প্রস্তাব দেন। এতে আমি রাজি হই। শিক্ষক স্বেচ্ছায় কান ধরে ওঠবস করেন। আমি যা করেছি, একজন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য।

সেলিম ওসমানের দাবি, ওই দিন তিনিই পুলিশকে বলে ঘটনাস্থল থেকে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। হাসপাতালে সব চিকিৎসার খরচ তিনিই বহন করছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন তাঁকে বলেছেন, ‘ওই শিক্ষক তারছেঁড়া।’

Selim-Osman-2

শ্যামল কান্তি ভক্তের সঙ্গে তাঁর ফোনে যোগাযোগ হচ্ছে। আজ সকালেও শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। ওই শিক্ষক বলেছেন, তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত। বলেছেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি ভারতের ভেলোরে যেতে চান। তিনি তাঁকে সহায়তা করবেন।

সরকারি তদন্ত কমিটি শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে ‘ধর্মীয় অবমাননার’ অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পায়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সেলিম ওসমান বলেন, তদন্ত কমিটির কেউ তো আমার সঙ্গে কথা বলেনি। শিক্ষামন্ত্রী তো আমার সঙ্গে কথা বলেননি। শিক্ষামন্ত্রী তাঁর মতো করে কথা বলেছেন। আমার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে—ওই শিক্ষক কটূক্তি করেছেন। তিনি নিজে আমার কাছে অপরাধ স্বীকার করেছেন। তাঁর পরিবার আমার কাছে লিখিত দিয়েছে।

সেলিম ওসমান বলেছেন, এখানে কী ঘটেছিল তা আমি কাউকে জানাই নি। কারণ, আমি চাই নি এটা আমার এলাকা ছাড়িয়ে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ুক। কিন্তু যেকোনো ভাবেই হোক এটা ছড়িয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আজ আমার এলাকার এক নেতা আমাকে বলল জনগণের সামনে প্রকাশ্যে মাফ চাইতে। একথা শুনে নারায়ণগঞ্জে আমার ভালবাসার মানুষেরা উত্তপ্ত হয়েছে। আমি তাদের শান্ত করেছি। আমার কাছে মাওলানারা জানতে চেয়েছেন, এলাকার মুরব্বীরা জানতে চেয়েছেন। কিন্তু আমি চেয়েছি এ ঘটনা শুধু আমার এলাকার মধ্যেই থাক। এখানে কী ঘটেছিল কী হতে পারতো। এ বিষয়টা কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেও এরকম বক্তব্য তারা দিতেন না।

সেলিম ওসমান বলেন, কেউ কেউ বলেছে আমাকে নাকি গণধোলাই দেবে। উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমাকে যখন গণধোলাই দিতে আসবে, তখন কি আপনারা চুড়ি পরে বসে থাকবেন?’ এ সময় হলভর্তি নেতা-কর্মীরা সমস্বরে বলে ওঠেন, ‘না’।

Selim-Osman-3

সংবাদ সম্মেলনে সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জে তাঁর বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাংসদ হওয়ার পর তিনি শিক্ষা, চিকিৎসা ও শিল্পায়ন এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। শিক্ষার উন্নয়নে বিভিন্ন ইউনিয়নে সাড়ে ২২ কোটি টাকা দিয়েছেন।

স্থানীয় এমপি হিসেবে নিজের ভূমিকার ব্যাপারে সেলিম ওসমান বলেন, আমি সব সময় শিক্ষা, চিকিৎসা ও শিল্পায়নের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আর এ কাজে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ সর্বস্তরের মানুষ সহযোগিতা করেছে। তার ধারাবাহিকতায় কাজ করে যাচ্ছি। আমি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব না।

শিক্ষার্থীকে মারধর ও ‘ইসলামধর্ম নিয়ে কটূক্তির’ অভিযোগে গত ১৩ মে শুক্রবার শ্যামল কান্তিকে স্থানীয় সাংসদের উপস্থিতিতে মারধর ও কানে ধরে ওঠবস করানো হয়। পরে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। আজ বেলা ১১টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানান, ‘ধর্মীয় অবমাননার’ অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পায়নি সরকারি তদন্ত কমিটি। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি অন্যায়ভাবে শ্যামল কান্তিকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল। তাই ওই কমিটি বাতিল করা হয়েছে। আর শ্যামল কান্তিকে তাঁর স্বপদে বহাল রাখা হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।

শিক্ষক লাঞ্ছনার বিষয়টি নিয়ে কয়েক দিন ধরেই দেশজুড়ে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা চলছে।

শ্যামল কান্তিকে লাঞ্ছনার ঘটনায় জাতীয় পার্টির স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমানসহ জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই রুল দেন।

x

Check Also

মাথাপিছু আয় বেড়ে ১ হাজার ৯০৯ ডলার

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৮ ...

Scroll Up