কম বয়সে বিয়ের বিধান রেখে বিল পাস

এমএনএ রিপোর্ট : বিভিন্ন মহলের আপত্তির মুখে বিশেষ প্রেক্ষাপটে কম বয়সে ছেলেমেয়েদের বিয়ের বিধান রেখে বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল ২০১৭ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বিলের ওপর বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানো ও সংশোধনী প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি আজ সোমবার বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।

আলোচিত এই বিলটি গত বছরের ৮ ডিসেম্বর সংসদে উত্থাপিত হয়। পরে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটি বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান শুধু মেয়েদের জন্য নয়, ছেলেদের জন্যও প্রযোজ্য করার প্রস্তাব করেছে। এর আগে মন্ত্রিসভা অনুমোদিত প্রস্তাবিত আইনে এই বিধান শুধু মেয়েদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। সংসদীয় কমিটি ৯ ফেব্রুয়ারি বিলের প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করে।

মন্ত্রণালয়ের উত্থাপিত বিলের ১৯ দফায় বলা হয়েছে, এই আইনের অন্যান্য বিধানে যা কিছু থাকুক না কেন, কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীর সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশক্রমে এবং মাতা-পিতার সম্মতিক্রমে বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিয়ে সম্পাদিত হলে তা এই আইনের অধীন অপরাধ বলে গণ্য হবে না।

এ ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটি ‘কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীর’ শব্দগুচ্ছ বাদ দিয়ে ‘বিধি দ্বারা নির্ধারিত কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্কের’ এবং ‘মাতা-পিতা’ শব্দের পরিবর্তে ‘পিতা-মাতা বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের’ শব্দগুচ্ছ যোগ করার সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ সংসদ সংসদীয় কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করলে নারীর পাশাপাশি পুরুষের ক্ষেত্রেও বিশেষ প্রেক্ষাপটের বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে প্রস্তাবিত আইনে বিশেষ বিধানের বিষয়টি ছাড়া মেয়েদের বিয়ের ন‌্যূনতম বয়স আগের মতো ১৮ বছর রাখা হয়েছে।

সামাজিক ক্ষেত্রে নানা সূচকে অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ বাল্য বিয়ে রোধের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে।

ইউনিসেফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বাল্য বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি। ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়।

প্রস্তাবিত আইনের বিশেষ এই বিধানের সুযোগে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ উৎসাহিত হবে আশঙ্কা করে তা বাতিলের দাবি তুলেছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন। এর জবাবে বিলটি সংসদে তোলার একদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছিলেন, বিরোধিতাকারীরা বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞান। সমাজবাস্তবতার কথা বিবেচনায় রেখেই এ আইন করা হচ্ছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ বলেন, ‘বাল্যবিবাহ সারা বিশ্বের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এ সমস্যাটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাল্যবিবাহ মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাল্যবিবাহ বন্ধে একটি যুগোপযোগী আইন থাকা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশের মানুষ বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে জানেন, কিন্তু মানেন না।’

পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করলে তিনি সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের দণ্ডিত হবেন।

বিল সম্পর্কিত নোটিশের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বিরোধী জাতীয় পার্টির সাংসদ ফখরুল ইমাম বলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে, কারও বয়স ১৮ হলে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হবেন। প্রাপ্তবয়স্করা ভোটার। কিন্তু ১৮ বছরের আগে কেউ ভোটার হতে পারেন না। সুতরাং এই আইনে প্রাপ্তবয়স্কের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।’

ফখরুল ইমাম প্রাপ্তবয়স্কের সংজ্ঞার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন। তবে প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ এ প্রশ্নের কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

বিলটি কার্যকর হলে ব্রিটিশ আমলে প্রণীত ‘চাইল্ড ম্যারেজ রেসট্রেইন্ট অ্যাক্ট-১৯২৯’ বাতিল হয়ে যাবে।

২০১৪ সালে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত গার্লস সামিটে প্রধানমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন, তা বাস্তবায়নে এই আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করেন প্রতিমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে বিয়ের হার শূন্যে, ১৫-১৮ বছর বয়সীদের বিয়ের হার এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনার পর ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমাদের দেশের মানুষ বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে জানেন কিন্তু মানেন না। বাল্যবিবাহ বন্ধে সংসদে উত্থাপিত আইনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।”

পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ বাল্য বিয়ে করলে তিনি সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজারের বদলে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

সংসদে উত্থাপিত বিলে ১৫ দিনের আটকাদেশ বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের সম্মুখীন হওয়ার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছিল। সংসদীয় কমিটি দণ্ডের বিধান পরিবর্তনের সুপারিশ করে।

x

Check Also

নির্বাচনী উত্তাপ যেনো উত্তপ্ত না হয় : সিইসি

এমএনএ রিপোর্ট : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের উদ্দেশ্য করে প্রধান নির্বাচন ...

Scroll Up