আধুনিক পদ্ধতিতে সরিষা চাষের এখনই সময়

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : সরিষা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান তেল বীজ ফসল। সরিষার তেল শহর-গ্রাম সবখানেই জনপ্রিয়। আমাদের দেশের অনেক জমিতে সরিষা চাষ করা হয়। তবে আধুনিক পদ্ধতিতে সরিষা চাষের এখনই সময়। এখনো গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ভোজ্যতেল হিসেবে সরিষার উপর নির্ভর করে। তাই ব্যবসায়িক ভিত্তিতে সরিষার চাষ ও বাজারজাত করা জরুরি।

মাটি
সরিষা মূলত বেলে দো-আঁশ এবং দো-আঁশ মাটিতে ভালো জন্মে।

জমি
চার-পাঁচটি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হয়। জমির চারপাশে নালার ব্যবস্থা করলে পরবর্তীতে সেচ দিতে এবং পানি নিকাশে সুবিধা হয়।

বপন
সরিষা বীজ সাধারণত ছিটিয়ে বোনা হয়। সারি করে বুনলে সার, সেচ ও নিড়ানি দিতে সুবিধা হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার রাখতে হবে। বপনের সময় জমিতে বীজের অঙ্কুরোদগমের উপযোগী থাকতে হবে।

সময়
বিভিন্ন অঞ্চলের তারতম্য এবং জমির জো অবস্থা অনুসারে টরি-৭, কল্যাণীয়া, সোনালি সরিষা, বারি সরিষা-৬, বারি সরিষা-৭ ও বারি সরিষা-৮ এর বীজ মধ্য আশ্বিন থেকে মধ্য-কার্তিক মাস (অক্টোবর) পর্যন্ত বোনা যায়। রাই-৫ এবং দৌলত কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণ (মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেম্বর) মাস পর্যন্ত বপন করা যেতে পারে। বিভিন্ন অঞ্চলের তারতম্য এবং জমির জো অনুসারে ‘বারি সরিষা-১৩’ জাতের বীজ কার্তিক মাসের ১ম সপ্তাহ থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত (মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেম্বর) বপনের উপযুক্ত সময়।

সার
জাত, মাটি ও মাটিতে রসের তারতম্য অনুসারে সার দিতে হয়। সারের পরিমাণ (কেজি/হেক্টর) নিম্নরূপ-

ইউরিয়া সার অর্থেক ও অন্যান্য সমুদয় সার বপনের আগে এবং বাকি অর্ধেক ইউরিয়া গাছে ফুল আসার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হয়। সার উপরি প্রয়োগের সময় মাটিতে রস থাকা দরকার।

বীজ
সরিষার জাত টরি-৭, কল্যাণীয়া, সোনালি সরিষা, ধলি, বারি সরিষা-৭ ও বারি সরিষা-৮ এর জন্য প্রতি হেক্টরে ৮-১০ কেজি বীজ লাগে। রাই ও দৌলত সরিষার জন্য প্রতি হেক্টরে ৭-৯ কেজি বীজের প্রয়োজন। বারি সরিষা-১৩ চাষের জন্য প্রতি হেক্টর জমিতে ৮ থেকে ১০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়।

নিড়ানি
বীজ বপনের ১৫-২০ দিন পর একবার এবং ফুল আসার সময় দ্বিতীয়বার নিড়ানি দিতে হয়।

সেচ
সোনালি সরিষা, বারি সরিষা-৬, বারি সরিষা-৭, বারি সরিষা-৮ ও উফশী জাতসমূহে পানি সেচ দিলে ফলন বেশি হয়। বীজ বপনের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে (গাছে ফুল আসার আগে) প্রথম সেচ এবং ৫০-৫৫ দিনের মধ্যে (ফল ধরার সময়) দ্বিতীয় সেচ দিতে হবে। বপনের সময় মাটিতে রস কম থাকলে চারা গজানোর ১০-১৫ দিনের মধ্যে একটি হালকা সেচ দিতে হয়।

ফসল
টরি জাতীয় সরিষা ৭০-৯০ দিন এবং রাই জাতীয় সরিষা ৯০-১০০ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়।

সংরক্ষণ
মাড়াই করার পর রোদে শুকানো বীজ গরম অবস্থায় সংরক্ষণ করলে বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই বীজ ঠান্ডা করে প্লাস্টিকের পাত্রে, টিনে বা ড্রামে রেখে মুখ এমনভাবে বন্ধ করতে হবে যেন পাত্রের ভেতরে বায়ু প্রবেশ করতে না পারে। সংরক্ষণের জন্য বীজভর্তি পাত্র মাটির সংস্পর্শে রাখা বাঞ্ছনীয়। বীজসহ পাত্র আর্দ্রতা কম এমন ঘরের শীতল স্থানে রাখলে একবছর এমনকি দু’বছর পর্যন্ত বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা বজায় থাকে।

জাব পোকা
পূর্ণবয়স্ক ও বাচ্চা পোকা সরিষার পাতা, কাণ্ড, ফুল ও ফল থেকে রস শোষণ করে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে ফুল ও ফলের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং পাতা কুঁকড়ে যায়। জাব পোকা এক ধরনের রস নিঃসরণ করে, ফলে তাতে সুটিমোল্ড ছত্রাক জন্মে এবং আক্রান্ত অংশ কালো দেখায়। এজন্য ফল ঠিকমতো বাড়তে পারে না, বীজ আকারে ছোট হয়। বীজে তেলের পরিমাণ কমে যায়। ফল ধারণ অবস্থায় বা তার আগে আক্রমণ হলে এবং প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রতিকার
আগাম চাষ আশ্বিনের শেষ ভাগ ও মধ্য-কার্তিক (অক্টোবর) অর্থাৎ আগাম সরিষা বপন করলে জাব পোকার আক্রমণের আশঙ্কা কম থাকে। প্রতিগাছে ৫০টির বেশি পোকা থাকলে ম্যালাথিয়ন-৫৭ ইসি বা সুমিয়িথন-৬০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে বিকেলে স্প্রে করতে হবে।

পাতা ঝলসানো
অল্টারনারিয়া ব্রাসিসি নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক অবস্থায় সরিষা গাছের নিচে বয়স্ক পাতায় এ রোগের লক্ষণ দেখা যায়। পরে এর আক্রমণে গাছের পাতা, কাণ্ড ও ফলে চক্রাকার কালচে দাগের সৃষ্টি হয়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে পাতা ঝলসে যায়। ফলে সরিষার ফলন খুব কমে যায়।

প্রতিকার
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন জাতের সরিষা চাষ করতে হবে। ধলি, দৌলত, বারি সরিষা-৭, বারি সরিষা-৮ ইত্যাদি জাত কিছুটা পাতা ঝলসানো রোগ সহনশীল। রোগমুক্ত বীজ বপন করতে হবে। বীজ বপনের আগে ভিটাভেক্স-২০০ বা ক্যাপ্টান দিয়ে (২-৩ গ্রাম ছত্রাকনাশক/কেজি বীজ) বীজ শোধন করে বপন করতে হবে। এ রোগ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোভরাল-৫০ ডব্লিউপি বা ডাইথেন এম-৪৫, ০.২% হারে ৯ গ্রাম (প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ২ গ্রাম) পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে।

পরজীবী
সরিষার পরজীবী উদ্ভিদের মধ্যে অরোবাংকিই প্রধান। সরিষা গাছের শেকড়ের সঙ্গে এ পরজীবী উদ্ভিদ সংযোগ স্থাপন করে খাদ্য সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। ফলে পরজীবী আক্রান্ত সরিষার গাছ দুর্বল হয়, বৃদ্ধি কমে যায় এবং ফলন হ্রাস পায়। কারণ অরোবাংকির বংশবৃদ্ধি সরিষা গাছের ওপর নির্ভরশীল। এর বীজ মাটিতেই অবস্থান করে। মাটি, ফসলের পরিত্যক্ত অংশ, সেচের পানি প্রভৃতির মাধ্যমে অরোবাংকির উৎপত্তি ও বিস্তার ঘটে। বারবার একই জমিতে সরিষা পরিবারের ফসল চাষ করলে এ পরজীবীর বিস্তার ঘটে।

প্রতিকার
ফুল আসার আগে পরজীবী উদ্ভিদ জমি থেকে তুলে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। পরিমিত হারে টিএসপি সার ব্যবহার করতে হবে। আগে এ রোগাক্রান্ত জমি গভীরভাবে চাষ করতে হবে। আগাছানাশক যেমন ২.৪-ডি ছিটিয়ে পরজীবী উদ্ভিদ দমন করতে হবে।

x

Check Also

আজ বৃহস্পতিবারের দিনটি আপনার কেমন যাবে?

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : আজ ১৮ অক্টোবর ২০১৮, বৃহস্পতিবার। নতুন সূর্যালোকে আজ বৃহস্পতিবারের দিনটি আপনার ...

Scroll Up