যে কোনো মাটিতে গ্লাডিওলাসের লাভজনক চাষ

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : গ্লাডিওলাস ফুলের চাষ একদিকে যেমন লাভজনক, অন্যদিকে তেমন নান্দনিক। বাজারে এ ফুলের চাহিদাও প্রচুর। বাড়ির আঙিনা, ছাদসহ যে কোনো ধরনের মাটিতে চাষ করতে পারেন এ ফুল। সে জন্য জেনে নিন নিয়ম-কানুন। এ বিশেষ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন মোসাম্মৎ সেলিনা হোসেন

বাজার সম্ভাবনা

গ্লাডিওলাস ফুল বিভিন্ন রঙ- এর হয়ে থাকে। বিয়ে, গায়ে হলুদ, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে অনুষ্ঠানের স্থান সাজানোর জন্য এই ফুলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কাঁটা ফুল হিসেবে ফুলদানিতে রাখলে বেশ কিছুদিন ধরে এ ফুল ফুটতে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন রঙ-এর গ্লাডিওলাস ফুলের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা দিন দিন আমাদের দেশে বাড়ছে। আমাদের দেশের প্রায় সব জেলা শহরে ফুলের দোকান দেখা যায়। এসব ফুলের দোকানে ফুল সরবরাহ করে আয় করা সম্ভব। এছাড়া গ্লাডিওলাস ফুল চাষ করে দেশীয় বাজারে বিক্রয়ের পাশাপাশি, ফুল বিদেশেও রপ্তানী করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সহায়তা দিয়ে থাকে। গ্লাডিওলাস ফুল বিদেশে রপ্তানি করার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

আবহাওয়া
সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য আর্দ্র ও ঠান্ডা আবহাওয়া দরকার। ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গাছ ভালোভাবে বাড়ে। উপযুক্ত আর্দ্রতা থাকলে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা গ্লাডিওলাস সহ্য করতে পারে। চাষের জন্য পূর্ণ সূর্যোলোক দরকার। কারণ ছায়ার এ ফুল ভালো হয় না।

উচ্চ তাপমাত্রায় গাছের পানি ধরে রাখার ক্ষমতায় সমস্যা দেখা দেয়, তাছাড়া প্রথম বীজ বপন থেকে প্রথম পাতা বের হওয়া পর্যন্ত যদি উচ্চ তাপমাত্রা থাকে তবে গাছ সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রসত্ম হয়। ছোট দিন এবং আলোর তীব্রতা কম হলে ফুল উৎপাদন কমে যায়। পূর্ণ সূর্যালোক এই ফুল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী, ছায়ায় এই ফুল ভাল হয় না। গাছের বৃদ্ধির প্রতিটি ধাপে বিশেষ করে কর্ম (বড় গুঁড়িকন্দ) রোপণ এবং স্পাইক (যে দন্ডটি ফুল ও পাতা ধরে রাখে) বের হওয়ার আগ মুহুর্তে মাটিতে আর্দ্রতার ঘাটতি হলে ফলন কমে যাবে। কর্ম (বড় গুঁড়িকন্দ) ও কর্মেল (ছোট গুঁড়িকন্দ)

মাটির প্রকৃতি
দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি গ্লাডিওলাস চাষের জন্য উপযোগী। এ গাছ স্যাঁতস্যাঁতে জমিতে জন্মাতে পারে না। মাটির পি এইচ ৬.৫ থেকে ৭.৫ এর মধ্যে থাকলে চাষের জন্য ভালো।

জাত

গ্লাডিওলাসের বহু জাত রয়েছে। এইগুলিকে সাধারণভাবে বৃহদাকার, বড় ফুল, ক্ষুদ্র ফুল এবং প্রজাপতি ইত্যাদি নামে শ্রেণীবিন্যাস করা হয়। এই জাতগুলি আগাম, মাঝারি ও নাবী জাতে ভাগ করা যায়। আবার এগুলোর মধ্যে সিঙ্গেল ও ডাবল জাতও রয়েছে। গ্লাডিওলাস ফুল বিভিন্ন রংয়ের হতে পারে, যেমন-সাদা, হলুদ, গোলাপী, ফিকে লাল, লাল, গাঢ় লাল, কমলা, বেগুনী ইত্যাদি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট গ্লাডিওলাসের কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে। এগুলো হলো-

বারি গ্লাডিওলাস-১ : ফুলের বোঁটা লম্বা ও বেশি ফ্লোরেটযুক্ত। লাল রঙের দুটি পাঁপড়িতে হলুদ ছোঁপ থাকে। সাধারণত পানিতে ফুলের স্থায়িত্বকাল ৮-৯ দিন।

বারি গ্লাডিওলাস-২ : লম্বা বোঁটাসম্পন্ন ফুলে গাঢ় মেজেন্টা রঙের অনেকগুলো ফ্লোরেট থাকে। প্রতি ফ্লোরেটের দুটি পাঁপড়িতে ক্রিম রঙের ছোপ দেখা যায় এবং অন্যান্য পাঁপড়িতে সাদা স্ট্রাইপ থাকে। সাধারণত পানিতে ৯ থেকে ১০ দিন তাজা থাকে।

বারি গ্লাডিওলাস-৩ : সারা বছর চাষ করা যায়। বাজারে চাহিদা আছে। এ জাতের গাছের পাতা তরবারির মতো। কন্দ রোপণের উপযুক্ত সময় মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর। ফুলের রঙ সাদা। প্রতি হেক্টরে (২৪৭ শতকে) ১.৭৫ থেকে ২.০০ লক্ষ ফুলের স্টিক পাওয়া যায়। ফুলের সজীবতা ৮-৯ দিন থাকে।

ভাল জাতের বৈশিষ্ট্য

১। দেশীয় মাটি ও আবহাওয়ায় চাষ উপযোগী।

২। রোগ বালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন।

৩। সহজে গাছ হেলে পড়ে না।

৪। উন্নত মানের কর্ম ও কর্মেল ব্যবহার।

৫। স্টিকে ফুলের সংখ্যা বেশি থাকা।

৬। ফুলের রং অধিকতর উজ্জ্বল হওয়া।

৭। বেশি সময় ফুলদানীতে সতেজ থাকা।

সময়
কার্তিক (মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেম্বর) মাসে এ ফুল চাষের উত্তম সময়।

জমি নির্বাচন

জৈব সার সমৃদ্ধ, বেলে দো-আঁশ অথবা দো-আঁশ মাটি। উঁচু জমি, যে জমিতে বৃষ্টি অথবা সেচের পানি জমে থাকে না। জমির পিএইচ মান ৬.৫ থেকে ৭.৫ হওয়া দরকার, তবে এর চাইতে কম পিএইচ সমৃদ্ধ মাটিতেও এই ফুল চাষ করা যেতে পারে। অধিক কাদাযুক্ত এবং কালো মাটির জমিতে চাষ না করাই ভাল। হালকা মাটির ক্ষেত্রে জৈবসার মিশিয়ে মাটির গুণাগুন ভাল করতে হবে। একই জমিতে বারবার গ্লাডিওলাস চাষ করলে মাটি বাহিত রোগের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ফসলও চাষ করতে হবে।

জমি তৈরি

গ্লাডিওলাস ফুলের জন্য জমিকে খুব ভালোভাবে চাষ করতে হয়, এর মূল বেশি গভীরে প্রবেশ করে না, তাই মাটি খুব গভীরভাবে চাষ করার প্রয়োজন নেই। ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি গভীরতায় জমি চাষ করতে হবে, তবে মাটির নীচে শক্ত কাদা মাটির সত্মর থাকলে মাটি আরো গভীরভাবে চাষ করতে হবে। পোকামাকড় মুক্ত রাখতে জমি চাষের সময় ক্লোরডেন এবং মাটি বাহিত রোগ থেকে মুক্ত রাখার জন্য মিথাইল ব্রোমাইড-ক্লোরোপিকরিন (১৬২কেজি/একর) প্রয়োগ করে মাটি শোধন করতে হবে। এ সময়ে প্রতি একরে প্রায় ১০০০০ কেজি গোবর, ২০ থেকে ২৫ কেজি টিএসপি এবং ১৫ থেকে ২০ কেজি এমওপি সার জমিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

জমি ভালোভাবে কয়েকবার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝরঝরে করে নিতে হবে। চাষের পর গোবর ও সার ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে নিতে হবে। গোবর ও সার জমিতে ছিটানোর পর জমি আবার ভালোভাবে চাষ দিতে হবে। জমিতে সমান দূরত্ব বজায় রেখে সারি করতে হবে। এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব ৩০-৪৫ সে.মি. রাখলে চাষের সময় সুবিধা হবে।

কন্দ রোপণ
রোগমুক্ত বড় (৩০+/-০.৫গ্রাম) মাঝারি (২০+/-০.৫ গ্রাম) ওজনের ৩.৫-৪.৫ সেমি ব্যাসযুক্ত কন্দ ৬-৯ সেমি গভীরতার রোপণ করতে হবে। কন্দ অবশ্যই সুপ্তাবস্থা মুক্ত হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেমি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ২৫ সেমি হবে। তবে বাণিজ্যক উৎপাদনের ক্ষেত্রে ১৫*২০ সেমি দূরত্বে রোপণ করা যেতে পারে।

বংশবিস্তার

১. বীজ, গুঁড়ি কন্দ ও গুঁড়ি কন্দের গায়ে জন্মানো ছোট ছোট কন্দ থেকে গ্লাডিওলাসের বংশবিস্তার করা যায়।

২. বীজ থেকে তৈরি চারাতে ফুল আসতে অনেক সময় লাগে এবং জাতিগত বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে না। তাই বীজ দিয়ে সাধারণত বংশবিস্তার করা হয় না।

৩. ফুল দেয়া শেষ হলে গাছ শুকিয়ে যায়। এ সময় মাটি খুঁড়ে গ্লাডিওলাসের কন্দ তুলে নিয়ে এর গায়ে জন্মানো ছোট কন্দগুলো আলাদা করে নিতে হবে।

৪. এর কন্দগুলোর গায়ে লেগে থাকা মাটি পরিষ্কার করে নিয়ে কন্দগুলো ছায়াযুক্ত জায়গায় রেখে শুকিয়ে নিতে হবে।

৫. শুকানোর পর কন্দগুলো কিছুটা অন্ধকার শুকানো জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে।

৬. এগুলো সুপ্ত অবস্থা অতিক্রম করে গজানো শুরু করলে নতুন ফুল গাছের জন্য মাটিতে রোপণ করতে হবে।

সার

কৃষকদের মতে গুণগত মানসম্পন্ন ভালো ফলন পেতে হলে গ্লাডিওলাস ফুল চাষের জমিতে যতটুকু সম্ভব জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে মাটির ধরণ অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে জৈব সার ব্যবহার করলে মাটির গুণাগুণ ও পরিবেশ উভয়ই ভালো থাকবে। বাড়িতে গবাদি পশু থাকলে সেখান থেকে গোবর সংগ্রহ করা যাবে। নিজের গবাদি পশু না থাকলে পাড়া-প্রতিবেশি যারা গবাদি পশু পালন করে তাদের কাছ থেকে গোবর সংগ্রহ করা যেতে পারে। এছাড়া ভালো ফলন পেতে হলে জমিতে আবর্জনা পচা সার ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়ির আশেপাশে গর্ত করে সেখানে আবর্জনা, ঝরা পাতা ইত্যাদি স্তুপ করে রেখে আবর্জনা পচা সার তৈরি করা সম্ভব।

সারের পরিমান

হেক্টরপ্রতি ১০ টন পচা গোবর, ২০০ কেজি ইউরিয়া, ২২৫ কেজি টিএসপি এবং ১৯০ কেজি এমপি দিতে হবে। গোবর, টিএসপি ও এমপি জমি তৈরির সময় ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া সারকে সমান দুই ভাগে ভাগ করে ৪ পাতা বের হওয়ার পর অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক ৭ পাতা বের হওয়ার পর অর্থাৎ স্পাইক বের হওয়ার সময় সারির দু’পাশে ৫ সেমি গভীরে পার্শ্ব প্রয়োগ করতে হবে।

সেচ ও পানি নিষ্কাশন

মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রস থাকতে হবে। তাই প্রয়োজনমতো সেচ দিতে হবে। সাধারণভাবে কন্দ মাটিতে লাগানোর পর হালকা সেচ দিতে হবে। যার ফলে কন্দগুলো মাটিতে লেগে যায়। পরবর্তীতে আবহাওয়ার অবস্থা বুঝে ১০-১৫ দিন অন্তর অন্তর হালকা সেচ দিতে হবে। মাটিতে রসের অভাব হলে নিয়মিত প্রয়োজনমত গ্লাডিওলাস চাষের জমিতে সেচ দিতে হবে। কন্দের গোড়ায় যেন বৃষ্টি বা সেচের পানি না জমে সেজন্য দুই সারির মাঝে নালা তৈরি করে নিতে হবে। মাটিতে পানির পরিমাণ কম থাকলে গাছের বৃদ্ধি কমে যাবে। জমিতে পানির পরিমাণ বেশি হলে কর্ম বা কন্দ পচে যেতে পারে।

আগাছা দমন 

গ্লাডিওলাস ফুলের উৎপাদনে নিয়মিতভাবে গভীর শিকড় যুক্ত আগাছা দমন খুবই জরুরী। আগাছানাশক হিসাবে অনুমোদিত আগাছানাশক ১.৮ কেজি/একর স্প্রে করতে হবে। আগাছানাশক ব্যবহারের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কর্ম ও কর্মেল ক্ষতিগ্রস্থ না হয়।

মালচিং ও মাটি ওঠানো

গ্লাডিওলাসের প্রয়োজনীয় পরিচর্যা হচ্ছে মাটি উঠানো। গাছের ৩-৫ পাতা পর্যায়ে একবার এবং প্রয়োজনবোধে ৭ পাতা বের হওয়ার পর অর্থাৎ স্পাইক বের হওয়ার সময় গাছের গোড়ার দু’পাশ থেকে মাটি তুলে দিতে হবে। মাটি তুলে দিলে জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকে এবং বাতাসে গাছ পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। সেচ দেওয়ার পর করম মাটির উপরে উঠে এলে পাশ থেকে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

স্টেকিং (কাঠি দিয়ে কান্ডকে দাঁড় করিয়ে রাখা) :

প্রতি সারিতে ৬.৫ ফুট দূরে দূরে বাঁশের/কাঠের কাঠি পুঁতে ৬ ইঞ্চি উপরে একটি এবং স্পাইক বের হওয়ার স্থানে একটি তার বা নাইলনের রশি টানাতে হবে। প্রতি গাছে আলাদা করে ছোট ছোট খুঁটি লাগানো যেতে পারে। গাছ ঘন করে লাগালে স্টেকিং না করলেও চলে। স্টেকিং দেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কান্ডে বা মাটির নীচে কর্ম বা কর্মেলে আঘাত না লাগে।

চাষের সময় পরিচর্যা

১. জমিতে আগাছা থাকলে পোকামাকড়, রোগ জীবাণু ও ইঁদুরের আক্রমণ বেশি হয়। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

২. গাছ বড় হলে ফুলগুলোকে সোজা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ঠেস দিতে হবে।

৩. মাটির ঢেলা ভেঙ্গে দিতে হবে এবং মাটি ঝরঝরে রাখতে হবে।

৪. আগাছামুক্ত করার সময় খেয়াল রাখতে হবে, যাতে অঙ্কুরোদগমে কোনো ক্ষতি না হয়।

রোগ বালাই, পোকা-মাকড় এবং দমন পদ্ধতি

শোষক পোকা (থ্রিপস্) : এটি অতি ক্ষুদ্র ছাই রঙের পোকা যা খালি চোখে দেখা যায় না। এই পোকা পাতা, স্পাইক ও ফুলের রস শোষণ করে ফলে আক্রান্ত পাতায় রুপালী ও বাদামী রঙের লম্বা দাগ দেখা যায় এবং পাতা ও ফুল শুকিয়ে যায় এবং আক্রমণ বেশী হলে গাছও শুকিয়ে যায়। সংরক্ষিত অবস্থায় কর্মও আক্রান্ত হতে পারে।

ব্যবস্থাপনা : এই পোকা দমন করার জন্য ২০ থেকে ৩০ মিলি ম্যালাথিয়ন ১৮ লিটার পানিতে মিশিয়ে ২ থেকে ৩ বার গাছে স্প্রে করতে হবে। নোভাক্রন (০.১ থেকে ০.১৫%) স্প্রে করেও ভাল ফল পাওয়া যায়।

জাব পোকা (এফিড) : এফিড কচি পাতা, নতুন স্পাইক ও ফুলের রস খায়।

ব্যবস্থাপনা : স্টার্টার/টাফগর ৪০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে স্প্রে করে এই পোকা দমন করা যায়।

নেমাটোডস/কৃমি : বহু ধরণের নেমাটোড গ্লাডিওলাসে আক্রমণ করতে পারে। এদের মধ্যে ‘রুট নট নেমাটোড’ উলেস্নখযোগ্য।

ব্যবস্থাপনা : মাটি শোধন করে এবং নেমাটোড নাশক নিউফরান/ফুরাকার্ব ৩ থেকে ৪ কেজি /একরে ব্যবহার করে নেমাটোডের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

বট্রাইটিস ব্লাইট : ছত্রাক দ্বারা এই রোগ হয়ে থাকে। এই রোগে পাতা ও ফুল আক্রান্ত হয়। প্রাথমিকভাবে পাতার এক পাশে ছোট বাদামী বা ধূসর দাগ দেখা দেয়। তবে আক্রমণ বেশি হলে অন্য পাশেও দাগ দেখা দেয়। পাঁপড়ির উপর ছোট থেকে বড় পানির মত ভিজা দাগ দেখা দেয় যা পরবর্তীতে ধূসর দাগে পরিণত হয়। ঠান্ডা ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই রোগ বেশি হয়।

ব্যবস্থাপনা : পরিস্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ এই রোগকে অনেকটা নিয়ন্ত্রনে রাখে। ডাইথেন এম-৪৫ ১৫ দিন পর পর প্রতি লিটার পানিতে ১ থেকে ২ গ্রাম অথবা বেনডাজিম/মেটাজেব/মেনকোজেব প্রতি লিটার পানিতে ১ থেকে ২ গ্রাম হারে স্প্রে করে এই রোগ দমন করা যায়।

ফিউজেরিয়াম রট : ছত্রাক দ্বারা এই রোগের সৃষ্টি হয়। এই রোগে গাছের বৃদ্ধি ধীর হয়ে কান্ড ও পাঁপড়ি বিকৃত আকার ধারণ করে এবং স্পাইক খুব কম বের হয়। কর্ম ও করমেল সংরক্ষনের পূর্বে অথবা সংরক্ষণের সময় পচে যায়।

ব্যবস্থাপনা : এই রোগের আক্রমণ রোধ করা খুব কঠিন। তবে প্রতিরোধী ও সহনক্ষম জাত ব্যবহার করে এই রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সুস্থ কর্ম ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ এবং কর্ম ও কর্মেল শোধন করেও এই রোগ প্রতিহত করা যায়। এটি একটি বীজ ও মাটি বাহিত রোগ। যে সমসত্ম মাটিতে বায়ু চলাচল কম এবং মাটিতে পানি জমে থাকে সেখানে এই রোগ বেশি হয়। প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম ব্যাভিস্টিন/বেনডাজিম/কার্বেন্ডাজিম এবং ২ গ্রাম মেনকোজেব/মেটাজেব একত্রে মিশিয়ে কর্ম শোধন করে এবং একই ওষধ দিয়ে মাটি ভিজিয়ে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়।

ভাইরাস : গ্লাডিওলাস অনেক কর্ম ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়, পাতা, ফুল ও স্পাইক বিকৃত হয় এবং রঙিন ফুলের উপর লম্বা দাগ পড়ে।

ব্যবস্থাপনা : একবার আক্রান্ত হলে কর্মসহ গাছ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কর্মেল-এ ভাইরাস প্রবেশ করার আগেই সংগ্রহ করা হলে রোগমুক্ত কর্মেল পাওয়া যেতে পারে। কিছু কিছু ভাইরাস পোকা দ্বারা ছড়ায় বলে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি স্টার্টার/টাফগর/পারফেকথিয়ন কীটনাশক স্প্রে করে এ রোগকে দমন করা যায়।

ফুল কাটা 

কর্ম লাগানোর ৭৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে গাছে ফুল আসে। স্পাইক এর নিচের দিকে ১ থেকে ২ টি ফুলে (ফ্লোরেট) রং দেখা দিলে স্পাইক (যে দন্ডটি ফুল ও পাতা ধরে রাখে) কাটতে হবে। স্পাইক কাটার পর গাছে ৪ থেকে ৫ টি পাতা এবং স্পাইকে ১ থেকে ২টি ফুটন্ত ফুল থাকতে হবে। ফুল কাটার সাথে সাথে সেগুলো ছায়ায় কিছু সময় রাখতে হবে।

কর্ম বা কন্দ তোলা ও সংরক্ষণ

ক) কর্ম তোলা : ফুল কাটার ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে কর্ম উঠাতে হবে। (গাছের পাতা যখন হলুদ ও বাদামী রং এর হয় )। ফুল কাটার ৯০ থেকে ১০৫ দিনের মধ্যে কর্ম উঠালে খুবই ভালো মানের কর্ম পাওয়া যায়, যা থেকে পরে ভাল ফুল পাওয়া যায়। তোলার সময় কর্ম এর গায়ে যেন কোন আঘাত না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

খ) সংরক্ষণ : কর্ম ও কর্মেলকে ব্যাভিষ্টিন ১% দ্রবনে ৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর আলো-বাতাসযুক্ত স্থানে ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। কর্মকে ২.৫ থেকে ৫ সে. তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। দেশীয় পদ্ধতিতে কর্ম ও কর্মেল আলো-বাতাসযুক্ত স্থানে বাঁশের মাচা অথবা কাঠের ট্রেতে এক সত্মর করে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। বালতিতেও কর্ম সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন এক জাত অন্য জাতের সাথে মিশ্রিত না হয়। সংরক্ষণের সময় কর্মের উপরের খোসা ছাড়ানো উচিত নয়। অল্প পরিমাণ কর্মের ক্ষেত্রে রেফ্রিজারেটরের সাধারণ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কর্মেল সংখ্যায় বেশি এবং আকারে ছোট থাকে বলে ছিদ্রযুক্ত নাইলনের ব্যাগে ভরে বাঁশের আড়ার সাথে ঝুলিয়ে রেখেও সংরক্ষণ করা যায়। কর্ম ও কর্মেল সংরক্ষণ করার পরে সংরক্ষিত স্থান মাঝে মাঝে পরিদর্শন করে খেয়াল রাখতে হবে যেন পোকামাকড়ের আক্রমণ বা রোগাক্রান্ত না হয়।

ফলন 

একর প্রতি ১ লক্ষ ৩৫ হাজার কর্ম থেকে ১ লক্ষ ৫ হাজার থেকে এক লক্ষ ২০ হাজার পর্যন্ত স্টিক পাওয়া যায়। একর প্রতি ৪ হাজার কেজি কর্ম ও প্রায় ৫ হাজার কেজি কর্মেল পাওয়া যায়। প্রতিটি কর্মের ওজন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ গ্রাম এবং প্রতিটি কর্মেলের ওজন প্রায় ২০ থেকে ৫০ গ্রাম। প্রতিটি কর্ম থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৫টি কর্মেল প্রায় যায়।

প্রক্রিয়াজাতকরণ 

কাটা ফুল বেশি দিন তাজা রাখতে দ্রবণে ৬০০ পিপিএম ৮-হাইড্রক্সি কুইনোলাইন সাইট্রেট এর সাথে ৪% চিনির দ্রবণ মিশিয়ে দিতে হবে। স্পাইককে পলিথিনে মুড়ে কার্টুনে রাখতে হবে। কার্টুনটি ৪ থেকে ১০ সে. তাপমাত্রায় তিন দিন পর্যন্ত রাখতে হবে।

প্যাকিং 

৫ ফুট লম্বা, ২৪ ইঞ্চি চওড়া এবং ১২ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট ছিদ্র কাগজের বা যুক্ত কাঠের বাক্সে স্পাইক গুলি রাখতে হবে। বাক্সের চারিদিকে স্পাইক এবং বান্ডেলের ফাঁকে ফাঁকে শোষক তুলা রাখতে হবে।

মূলধন

এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে গ্লাডিওলাস ফুল চাষের জন্য প্রায় ২০০০০ টাকার প্রয়োজন হবে। মূলধন সংগ্রহের জন্য ঋণের প্রয়োজন হলে নিকট আত্মীয়স্বজন, সরকারি ও বেসরকারি ঋণদানকারী ব্যাংক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও)-এর সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এসব সরকারি ও বেসরকারি ঋণদানকারী ব্যাংক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) শর্ত সাপেক্ষে ঋণ দিয়ে থাকে।

প্রশিক্ষণ

গ্লাডিওলাস ফুল চাষের আগে অভিজ্ঞ কারও কাছ থেকে চাষের বিস্তারিত জেনে নিতে হবে। এছাড়া চাষ সংক্রান্ত কোন তথ্য জানতে হলে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা অথবা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্ধারিত ফি এর বিনিময়ে কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

অনুষ্ঠানের স্থান ও ঘর সাজানোর জন্য গ্লাডিওলাস ফুলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে । তাই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গ্লাডিওলাস ফুল চাষ করে বাড়তি আয় করা সম্ভব।

x

Check Also

জেনে নিন সারা বছর বেগুন চাষের নিয়ম

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : বেগুন সবজি হিসেবে সুস্বাদু। এর পুষ্টিগুণও মন্দ নয়। প্রায় সারা বছরই ...

Scroll Up