প্রয়াত নায়করাজ রাজ্জাকের আজ ৭৭তম জন্মদিন

এমএনএ বিনোদন ডেস্ক : আজ প্রয়াত অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের জন্মদিন। বেঁচে থাকলে আজ ৭৭ বছরে পা রাখতেন তিনি। গত বছরের ২১ আগস্ট পরপারে পাড়ি জমান তিনি। তার হঠাৎ চলে যাওয়ায় চলচ্চিত্রে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
সেলুলয়েডের ফিতায় অসংখ্য চরিত্রে অমর হয়ে দর্শক হৃদয়ে থাকা এই মানুষটির জন্মদিনের শুভেচ্ছায় ভাসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এছাড়া তাকে ঘিরে এফডিসিসহ নানা সংগঠন ও রেডিও-টিভিতে নেয়া হয়েছে বর্ণিল আয়োজন। সাংস্কৃতিক-চলচ্চিত্র বিষয়ক সংগঠনগুলো ভালোবাসায় আজ স্মরণ করবেন প্রিয় নায়ককে।
জীবনের থলিতে অনেক কিছু নিয়েই গত বছরের ২১ আগস্ট পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন এ মহান অভিনেতা। বেঁচে থাকলে ৭৭ বছরে পা রাখতেন এই কিংবদন্তী। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তবে দেশভাগের সময় তিনি পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় পাড়ি জমান। নায়করাজ খ্যাতি পাওয়াটা রাজ্জাকের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। প্রচণ্ড পরিশ্রম আর অধ্যবসায় তাকে এদেশের চলচ্চিত্রের শীর্ষ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
এ মহান নায়ককে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ভক্ত দর্শক কেউই ভোলেননি। আজকের দিনে তাই তাকে নিয়ে তার পরিবারের সদস্যরা নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। নায়ক রাজের জীবনের শেষ ক’টি বছরে যে সবসময়ই তার পাশে ছিলেন তার ছোট ছেলে খালিদ হোসেন সম্রাট।
তিনি জানান, আজ সকালে রাজধানীর বনানীর কবরস্থানে যেখানে নায়করাজ চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন সেখানে পরিবারের পক্ষ থেকে কোরআন পাঠ ও দোয়া করা হবে। বাদ জোহর গুলশান আজাদ মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, অন্যান্য এতিম, গরিবদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাদ আসর গুলশান আজাদ মসজিদেই নায়করাজের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হবে।
এ প্রসঙ্গে সম্রাট বলেন, ‘আব্বার জন্য শুধু সবার কাছে দোয়া চাই, যেন মহান আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করেন। এমন একজন বাবার সন্তান হয়ে সবসময়ই আমি গর্ববোধ করি। সন্তান হিসেবে বাবার স্মৃতি নিয়ে যেন সারাটা জীবন ভালোভাবে থাকতে পারি এই দোয়া চাই।’ এদিকে শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান জানান, আজ সকালে নায়করাজের কবরস্থানে শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে ফুলের শ্রদ্ধা জানানো হবে।
এরপর এফডিসিতে ফিরে শিল্পী সমিতির সামনে নায়ক রাজের স্মৃতিফলকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হবে। এফডিসিতে বাদ আসর জামে মসজিদে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, নায়করাজ রাজ্জাকের নামে এফডিসির কোনো একটি ফ্লোর যেন নামকরণ করা হয় তা নিয়ে আজ এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা ও নির্মাতা। দুই পরিচয়ে সফল এ গুণী মানুষটি সবশ্রেণির মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় যেমন সিক্ত হয়েছেন তেমনি রাষ্ট্র তাকে একাধিকবার শুধু জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কিংবা জাতীয় পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা দিয়েই তৃপ্ত হতে পারেনি। তার আকাশছোঁয়া সফল কর্মযজ্ঞ ও সাফল্যের জন্য তাকে ভূষিত করেছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পদকে। নায়করাজের জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। মানুষের এই ভালোবাসা সহজভাবে পাননি তিনি।
সিনেমার নায়ক হওয়ার অদম্য স্বপ্ন ও ইচ্ছা নিয়ে এ অভিনেতা ১৯৫৯ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে সিনেমার ওপর পড়াশুনা ও ডিপ্লোমা গ্রহণ করেন। এরপর কলকাতায় ফিরে এসে ‘শিলালিপি’ ও আরও একটি সিনেমায় অভিনয় করেন। তবে ১৯৬৪ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কবলে পড়ে রাজ্জাক তার পরিবার পরিজন নিয়ে ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য হন।
তৎকালীন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় এসেও রাজ্জাক চলচ্চিত্রের নায়ক হওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। তবে প্রথমেই এতে সফলতা না পেয়ে সিনেমার একজন সহকারি পরিচালক হিসেবে ‘উজালা’ ছবিতে পরিচালক কামাল আহমেদের সহকারি হিসেবে কাজ শুরু করেন।
‘৬০-এর দশকে সালাউদ্দিন পরিচালিত হাসির ছবি ‘তেরো নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’-এ একটি পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে রাজ্জাক ঢাকায় তার অভিনয় জীবনের সূচনা করেন। এরপর প্রতিভাবন পরিচালক জহির রায়হান তার লোকজ ছবি ‘বেহুলা’ তে তাকে লখিন্দরের ভূমিকায় অভিনয় করার সুযোগ দেন। ‘বেহুলা’ ছবিতে সুচন্দার বিপরীতে তার অভিনয় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
৬০-এর দশকের শেষ থেকে ‘৭০ ও ‘৮০-এর দশকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠেন রাজ্জাক। ‘কার্তুজ’ তার অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র।
তার অভিনীত জননন্দিত ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘নীল আকাশের নীচে, ময়নামতি, মধু মিলন, পীচ ঢালা পথ, জীবন থেকে নেয়া, কী যে করি, অবুঝ মন, রংবাজ, বেঈমান, লাইলি-মজনু, ঘর সংসার, পাগলা রাজা, মতিমহল, বদনাম, কালো গোলাপ, সংঘর্ষ, বাচা কেন চাকর, জিঞ্জির, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, অনন্ত প্রেম, বাদী থেকে বেগম’ ইত্যাদি।
দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনে রাজ্জাক-সুচন্দা, রাজ্জাক-কবরী, রাজ্জাক-শাবানা ও রাজ্জাক-ববিতার অনেক সিনেমা দর্শক হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে এবং তা রাজ্জাককে ঢালিউডের নায়করাজ উপাধিতে ভূষিত করেছে।
আর ‘রংবাজ’ ছবিটি প্রযোজনার মধ্য দিয়ে প্রযোজক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। নায়ক হিসেবে তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল শফিকুর রহমান পরিচালিত ‘মালামতি’। নায়করাজ সর্বশেষ তার বড় ছেলে নায়ক বাপ্পারাজের নির্দেশনায় ‘কার্তুজ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
নায়করাজ প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৭৭ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন।
তার প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন ‘কি যে করি’ ছবিতে অভিনয় করে। পাঁচবার তিনি জাতীয় সম্মাননা পান। ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনি আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার পেয়েছেন অসংখ্যবার। বাংলাদেশের মানুষের অপরিসীম ভালোবাসা ও বন্ধু সাংবাদিক প্রয়াত আহমদ জামান চৌধুরীর লেখনীর মধ্যদিয়ে নায়করাজ উপাধি অর্জনই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
অভিনয়ের শুরুতে এফডিসিতে যখন টানা কাজ করতেন তখন মেকআপ রুমের ফ্লোরে পড়ে ঘুমাতে হয়েছে তাকে। সপ্তাহে একদিন রবিবার শুধু বাসায় যেতে পারতেন। তাও এফডিসিতে শুটিং থাকলে। না হলে সপ্তাহ এমনকি মাসও কেটে যেত প্রিয় স্ত্রী এবং আদরের সন্তানদের মুখ না দেখে। অক্লান্ত পরিশ্রম করে একসময় হয়ে উঠেন তিনি কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাক।
২০১৭ সালের ২১ আগস্ট তার তিন পুত্র ও দুই কন্যাসহ অসংখ্য ভক্তকে কাঁদিয়ে চিরদিনের মতো পৃথিবী ত্যাগ করেন তিনি। তার দুই পুত্র বাপ্পারাজ ও সম্রাটও চলচ্চিত্র অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত।
x

Check Also

গ্রামের মানুষও শহরের মতো সুযোগ-সুবিধা পাবে : প্রধানমন্ত্রী

এমএনএ রিপোর্ট : রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে গ্রামের মানুষও যাতে শহরের মতো সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে ...

Scroll Up