লাগামহীনভাবে বাড়ছে রড ও সিমেন্টের দাম

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : লাগামহীনভাবে বাড়ছে নির্মাণসামগ্রীর প্রধান উপকরণ রড ও সিমেন্টের দাম। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রতি টন রডের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা। অন্যদিকে প্রতি বস্তা সিমেন্টে বেড়েছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা। ফলে আবাসন ও নির্মাণ খাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রডের মূল কাঁচামাল স্ক্র্যাপ লোহা আমদানির খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল ক্লিংকারের দাম এখন ঊর্ধ্বমুখী। এছাড়াও অস্বাভাবিকভাবে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে রড ও সিমেন্টের দামে। কারণ এর কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। রাজধানীতে এখন প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে ৭১ হাজার ৫০০ টাকায়। ঢাকার বাইরে আরও বেশি। অথচ ৮ মাস আগে প্রতি টন রড ৫২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ ৮ মাসে বেড়েছে ১৯ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ৬ মাসে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) সিমেন্টের দাম বেড়েছে ১০০ টাকা। এর ফলে আবাসন ও নির্মাণ খাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া শুধু রড-সিমেন্ট নয়, ডলারের দাম ৪ টাকা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি আমদানি পণ্যে সরাসরি এর প্রভাব পড়ছে। গুনতে হচ্ছে বাড়তি শুল্কহার। সাধারণ মানুষসহ যার প্রভাব পড়ছে সর্বত্র।
অর্থবছরের শেষার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়। এ সময়ে নির্মাণসামগ্রীর ব্যয় বেড়ে গেলে সরকারি উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হবে। অথচ উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এ সময় হঠাৎ নির্মাণসামগ্রীর ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়ন কাজে স্থবিরতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রড ও সিমেন্টের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে আবাসন খাতের কোম্পানিগুলো। তারা বলছে, এতে নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে। ফলে ফ্ল্যাটের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এদিকে রড-সিমেন্টের মূল্য বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলছে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের নেতারা বলেন, হঠাৎ করে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক আবাসন ব্যবসায়ী নির্মাণকাজ সাময়িক বন্ধ করে দিতে চাইছেন। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। দুর্ভোগে পড়বেন ক্রেতারা। বড় ক্ষতির মুখে পড়বে আবাসন খাত।
তারা বলেন, বর্তমানে সিমেন্টের ওপর কোনো ধরনের কর আরোপ করা হয়নি। তাহলে এই মূল্যবৃদ্ধি কেন? রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, রড-সিমেন্টের দাম আগের অবস্থায় না ফিরলে ফ্ল্যাটের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
রিহ্যাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার তানভির হক প্রবাল গণমাধ্যমকে বলেন, রডের দাম বেড়ে গেলে আবাসন খাতে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। রড ও সিমেন্টর দাম বাড়লে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় বেড়ে যায়। এ ছাড়া একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দাম বাড়ায় অনেক ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। ক্রেতাদের কাছে বেশি দাম চাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে খুব বিপদের মধ্যে আছি। তাই দাম কমানোর জন্য অবশ্যই রিহ্যাবকেই আন্দোলন করতে হবে।
এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এখন পর্যন্ত ইন্ডিভিজুয়াল হোম বিল্ডার্স (আইএইচবি) অর্থাৎ যারা নিজেরা বাড়ি নির্মাণ করেন তারাই সিমেন্টের সবচেয়ে বড় গ্রাহক। প্রায় ৬০ শতাংশ সিমেন্ট যায় এই খাতে। ফলে দাম বাড়ার কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর তাঁতীবাজার ও কাওরান বাজারের রড ও সিমেন্ট ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে বর্তমানে কোম্পানিভেদে ৬০ গ্রেডের প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে ৬৮ হাজার ৫শ’ থেকে ৭২ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৪০ গ্রেডের রড প্রতি টন ৬০ হাজার থেকে ৬২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। অন্যদিকে প্রতি বস্তা সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৯০ টাকা। ঢাকার বাইরে দাম আরো বেশি। অথচ মাত্র এক মাস আগে ৬০ গ্রেডের প্রতি টন রডের দাম ছিল ৫৮ থেকে ৬০ হাজার টাকা। অন্যদিকে প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম ছিল ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকা।

 

মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে রড-সিমেন্টের দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মানোয়ার হোসেন বলেন, কোনো সিন্ডিকেট নয়, রডের মূল কাঁচামাল স্ক্র্যাপ লোহা আমদানির খরচ টনপ্রতি ৩০০ ডলার থেকে বেড়ে ৪৩৫ ডলার হয়েছে। এর একটা প্রধান কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দেরি হওয়ায় জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে কাঁচামাল কারখানায় আনা এবং তৈরি পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে টনপ্রতি আট হাজার টাকা পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। যার কারণে রডের দাম বাড়ছে।
সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশও (টিসিবি) রডের দাম বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে। অবশ্য সংস্থাটির হিসেবে গত এক মাসে ৬০ গ্রেডের এম এস রডের দাম বেড়েছে ১০ শতাংশ, আর ৪০ গ্রেডের রডের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। যা গত এক বছরে বেড়েছে যথাক্রমে ২৫ দশমিক ৭১ শতাংশ ও ২০ দশমিক ৬৯ শতাংশ। তবে বাস্তবে দাম বেড়েছে আরো বেশি।
এ প্রসঙ্গে একজন আমদানিকারক গণমাধ্যমকে বলেন, শুধু রডের কাঁচামাল কেন যে কোনো পণ্য আমদানিতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ৭৯-৮০ টাকার ডলার এখন হয়ে গেছে ৮৪ টাকা। এছাড়া ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি শুল্কও বেড়ে যাচ্ছে। প্রতি ডলারে অতিরিক্ত ২ টাকা করে শুল্ক গুনতে হচ্ছে। ফলে ডলার প্রতি আমদানি খরচ বেড়েছে কমপক্ষে ৬ টাকা। তিনি মনে করেন, ডলারের দাম বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব না হলে আমদানি পণ্যে ব্যয় বাড়তেই থাকবে। এতে করে উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকবে। যার প্রভাব পড়বে সব ক্ষেত্রে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন রড-সিমেন্ট বিক্রির ভরা মৌসুম। তাই যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়াই দাম বাড়াচ্ছেন মিল মালিকরা। তারা সিন্ডিকেট করে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর সাধারণ ক্রেতাদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের পরিকল্পিত কারসাজি। তবে ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামালের মূল্য ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দেরি হচ্ছে। ব্যাংক ঋণে সুদের হার বেড়েছে। এসবের কারণেই রড ও সিমেন্টের দাম বাড়ছে।
জানতে চাইলে ক্যাবের সভাপতি ড. গোলাম রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে রডের দাম বাড়ানো হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া বেসরকারিভাবে যারা অবকাঠামো নির্মাণ করছে তাদের ওপর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। যারা বাড়িঘর তৈরি করছে তাদেরও ব্যয় বাড়ছে। আর ভাড়াটিয়াদের এর ভার বহন করতে হবে। তাই সরকারের উচিত দাম বৃদ্ধির বিষয়টি এখনই খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া। যাতে করে রড ও সিমেন্টের দামে লাগাম টানা যায়।
দাম বাড়ার বিষয়ে একই স্থানের স্কাই আয়রন স্টোরের মালিক এসএম সাগীর (রকি) গণমাধ্যমকে বলেন, গত বছর থেকে রডের দাম বেড়েই চলেছে। ৮ মাসের ব্যবধানে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা বেড়েছে। তিনি বলেন, মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে।
সিমেন্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৬ মাসে বিভিন্ন কোম্পানির সিমেন্টের বস্তা (৫০ কেজি) দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। ৬ মাস আগে বিভিন্ন কোম্পানির সিমেন্ট প্রতি বস্তা বিক্রি হতো ৩৬০ থেকে ৩৯০ টাকা। বর্তমান বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৪৬০ থেকে ৪৭০ টাকা।
এ বিষয়ে এমআই সিমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ খান বলেন, কিছু দিন আগেও প্রতি টন ক্লিংকারের দাম ছিল ৪০ ডলার, তা এখন ৪৮-৫০ ডলার। একইভাবে জিপসামসহ অন্যান্য কাঁচামালের দরও বাড়তি। জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়া কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ। পরিবহন খরচের বিষয়ে মাসুদ খান বলেন, চট্টগ্রাম থেকে একটি ট্রাকে আগে ৪০০ ব্যাগ সিমেন্ট আনা যেত, এখন সেখানে ২৪০ ব্যাগের বেশি আনতে দিচ্ছে না সরকার। এতে খরচ বেড়েছে। যার কারণে দাম বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্সট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএসিআই) এর সভাপতি প্রকৌশলী মুনীর উদ্দীন আহমেদ গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, অস্বাভাবিকভাবে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এ অবস্থায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হবে না।
x

Check Also

সংসদ নির্বাচনে চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্র ৪০ হাজার ১৯৯টি

এমএনএ রিপোর্ট : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪০ হাজার ১৯৯টি ভোটকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন ...

Scroll Up