এবার মূলধনও খেয়ে ফেলেছে ৯টি ব্যাংক

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ৯টি ব্যাংক তাদের মূলধনও খেয়ে ফেলেছে। ব্যাংকগুলো হচ্ছে- রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, বেসিক, রূপালী, কৃষি, রাকাব ও আইসিবি ইসলামিক। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি আরও তিনটি ব্যাংক রয়েছে।
ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ১৯ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। এদিকে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আমানত ফেরত দিতে পারছে না ফারমার্স ব্যাংক। ভুক্তভোগী কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টাকা ফেরত চেয়েও পাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্ব শেষ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি খাতের আরও কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তির দুর্বলতা ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করেছে। এসব ব্যাংক ঋণের মান অনুযায়ী নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পুরো হোঁচট খেয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুশাসনের অভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, মাত্রাতিরিক্ত ঋণ বিতরণ এবং খেলাপি ঋণের কারণে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। তার মতে, বিচারহীনতা সংস্কৃতি এ জন্য দায়ী। আর যতদিন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিচার না হবে, ততদিন খেলাপি ঋণ ও অবলোপন কমবে না।
জানা গেছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারি বিশেষায়িত খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা।
এছাড়া সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি ৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৬৩৮ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ৮১৩ কোটি টাকা।
এর বাইরে বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা।
এদিকে সমস্যাগ্রস্ত ফারমার্স ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮৩ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকটির আসলে কিছুই নেই। সবমিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি ৯ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৯ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ গণমাধ্যমকে বলেন, এসব ব্যাংকে পচন ধরেছে বহুদিন আগে। তখন উদ্যোগ নিলে এমন হতো না। তখনকার সমালোচনা সরকার আমলে নেয়নি। সরকার চাইলে এখনও ব্যবস্থা নিতে পারে, কিন্তু নিচ্ছে না।
মূলত বিচারহীনতার কারণেই ব্যাংকগুলোর এ দুরবস্থা। ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ বেড়ে গেছে। এছাড়া খেলাপি ঋণের কারণে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি ব্যাংকগুলোকে ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেট থেকে ৩৪১ কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৪১ কোটি, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫ হাজার কোটি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫ হাজার ৬৮ কোটি টাকার মূলধন জোগান দেয় সরকার।
এছাড়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মূলধন জোগান দিয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। তবে ব্যাংকগুলো চেয়েছিল সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতের করুণ পরিণতি শুরু হয় ২০০৯ সালে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংক এবং একই পন্থায় সরকারি ব্যাংকের এমডি-চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার পর থেকে এমন দশা। এর আগে ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি এতটা প্রকট ছিল না।
তবে এ ধারা অব্যাহত থাকলে সংকট আরও বাড়বে। এমনটাই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যবসার পরিবর্তে এসব ব্যাংক এখন মূলধন জোগান নিয়েই চিন্তিত। গত বছরের শুরু থেকেই মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকারের কাছে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৫ ব্যাংক। কারণ ঘাটতিতে থাকায় এসব ব্যাংক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে।
x

Check Also

নজিরবিহীন পুঁজিসংকটে বেসরকারি ব্যাংকখাত

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : বেশ কিছুদিন থেকে বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংকে নজিরবিহীন অর্থসংকট চলছে। বর্তমানে ...

Scroll Up