দেশের আবাসন শিল্প আবারও চরম সঙ্কটের মুখে

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে আবাসন ব্যবসা যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ঠিক তখনই রড-সিমেন্টের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এতে দেশের আবাসন শিল্প আবারও চরম সঙ্কটের মুখে পতিত হতে পারে বলে আশঙ্কায় রয়েছেন নির্মাণ ব্যবসায়ীরা।
তারা বলছেন, সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসেবে এক মাস আগেও ৬০ গ্রেডের রডের বাজারমূল্য ছিল ৫৯-৬০ হাজার টাকা এবং ৪০ গ্রেডের রডের বাজারমূল্য ছিল ৫০-৫১ হাজার টাকা। অথচ এখন ৬০ গ্রেডের রডের বাজারমূল্য ৬৯-৭২ হাজার আর ৪০ গ্রেডের মূল্য ৫৭-৬০ হাজার টাকা।
বাজার ঘুরে জানা গেছে, শুধু রডের মূল্য নয় নির্মাণ শিল্পের অপরিহার্য পণ্য সিমেন্ট ও ইটের দামও বেড়েছে। কোম্পানি ভেদে সিমেন্টের মূল্য বেড়েছে বস্তাপ্রতি প্রায় ৯০ টাকা থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত এবং ইটের মূল্য বেড়েছে প্রতি হাজারে এক হাজার টাকা। ৩৬০-৩৯০ টাকায় বিক্রি হওয়া সিমেন্টর বস্তা এখন ৪৭০-৫১০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
রড-সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানীতে চলামান বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের ধীর গতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নির্মাণ সংশ্লিষ্টরা। হঠাৎ করেই বেড়েছে নির্মাণ সামগ্রীর দাম। বাজার সংশ্লিটরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে চরম সংকটে পড়বে নির্মাণ-আবাসন খাত।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে চলছে সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন কাজ। আর হঠাৎ করেই নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব উন্নয়নমূলক কাজের ধীর গতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিভিন্ন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানও।
গৃহায়ন শিল্পের নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনও করেছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)।
রিহ্যাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি নুরুন্নবী চৌধুরী বলেন, রড সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধি শুধু আবাসন খাতকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, এর সঙ্গে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যয়ও বাড়াবে, উন্নয়ন কাজকে বাধাগ্রস্ত করবে।
রিহ্যাব সদস্য মোহাম্মদী হোম্স লিঃ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোশাররেফ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আবাসন ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। সেখান থেকে উত্তরণে ২০১৭ সাল ছিল রাইজিং পিরিয়ড। বছরটিতে মোটামুটি ভালো ব্যবসা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেও ব্যবসা ভালো। কিন্তু ব্যাংক সুদের হার আবার বাড়ছে। রড-সিমেন্টের মূল্য হঠাৎ করে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এটি কোনোভাবে ভালো লক্ষণ নয়, বরং নির্মাণ শিল্পের জন্য একটি অশনিসংকেত বটে।
নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকেই ইতোমধ্যে নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে যথাসময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর অনিশ্চয়তায় মধ্যে পড়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট বুঝে না পাওয়ায় দুর্ভোগে পড়বেন চুক্তিবদ্ধ ক্রেতারা।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আবাসন খাত যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, ঠিক তখনই নির্মাণ উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণকাজ গতিহীন হয়ে পড়বে।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানেই সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার রাস্তা, ড্রেন, ফুটপাত, ডিভাইডারসহ নানামুখী নির্মাণ কাজ চলছে আর হঠাৎ করেই নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ঠিকদার প্রতিষ্ঠানগুলো।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একজন ঠিকাদার বলেন, উন্নয়ন কাজে টেন্ডার শিডিউলে যে দাম ধরা হয়েছিল, হঠাৎ করে তার থেকে বেশ কিছু শতাংশ বেড়ে গেছে। এখন নতুন শিডিউল না করলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো।
তিনি বলেন, রড-সিমেন্টের দাম বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের উন্নয়ন কাজেই এর প্রভাব পড়ছে। যে কারণে হয় আমাদেরকে খরচ বেশি দিতে হবে, না হয় এসবের দাম কমে যাওয়া পর্যন্ত কাজ শেষ করতে অপেক্ষা করতে হবে। হঠাৎ করেই এসব নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের কাজে কিছুটা ধীর গতি এসেছে। সবাই দাম কমে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে, সে কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্সট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএসিআই) সভাপতি প্রকৌশলী মুনীর উদ্দীন আহমেদ সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় জানিয়েছেন, অস্বাভাবিকভাবে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারণে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হবে না।
রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিনের মতে, সিমেন্টের ওপর কোনো ধরনের চার্জ বা কর আরোপ করা হয়নি, বাড়েনি কাঁচামালের মূল্য। তাহলে মূল্য বৃদ্ধি কেন? রড, সিমেন্ট, ইট ছাড়াও গত ছয় মাসে পাথরসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর মূল্যও বেড়েছে। আমরা মনে করি এ মূল্য বৃদ্ধি আবাসন শিল্প তথা নির্মাণ খাতের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারণে ফ্ল্যাট হস্তান্তর অনিশ্চয়তায় পড়বে। এতে দুর্ভোগে পড়বেন চুক্তিবদ্ধ ক্রেতারা। ফলে সংকট উত্তরণের পথে থাকা আবাসন খাত আবারও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। এ জন্য দ্রুত সরকারের সহযোগিতা দরকার।
রিহ্যাব সভাপতি বলেন, সরকার সারা দেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যার বেশির ভাগ নির্মাণ-সংক্রান্ত। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ায় রড, সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল এবং পাথর আমদানি বেড়েছে। বর্তমানে রড তৈরির বিভিন্ন উপাদান আমদানিতে নানা ধরনের কর দিতে হচ্ছে।
আবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নাগরিকদের জীবন-মান উন্নয়নের সঙ্গে অবকাঠামোর উন্নয়ন সরাসরি জড়িত। দফায় দফায় এসব নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় আমরা যেমন লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছি তেমনি কাজের ধীরগতির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
x

Check Also

তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনাটা এখন দুঃসাধ্য

এমএনএ রিপোর্ট : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ায় এখন তাঁকে সেখান ...

Scroll Up