বর্ণিল আয়োজনে পাহাড়ে বর্ষবরণ ও বৈসাবি উৎসব

এমএনএ রিপোর্ট : বর্ণিল আয়োজনে পাহাড়ে শুরু হয়েছে বর্ষবরণ ও বিদায়ের উৎসব বৈসাবি। আজ বৃহস্পতিবার সকালে কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসিয়ে চাকমা জনগোষ্ঠীর মানুষ পালন করেছে এ উৎসবের প্রথম দিনের ‘ফুলবিজু’। আর ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষ একই রীতিতে পালন করেছে ‘হারি বৈসুক’।
পাহাড়ে বসবাসরত ১১টি জনগোষ্ঠীর ১০ ভাষা-ভাষীর মধ্যে চাকমারা বিজু, মারমা-রাখাইনরা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসুক, তংচঙ্গ্যারা বিষু এবং অহমিয়ারা (আসাম) বলে বিহু। আর এসবগুলোর সংমিশ্রণে বৈশাখী উৎসবকে বলা হয় বৈসাবি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পহেলা বৈশাখ এক নিয়মে উদযাপন করা হলেও পাহাড়ে উদযাপন করা হয় ভিন্নভাবে। চার দিনব্যাপী ব্যাপক উৎসবে পাহাড় তখন আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। দেশের কোথাও পহেলা বৈশাখে এমন বৈচিত্র্য দেখা যায় না। আর এমন বৈচিত্র্য এ অঞ্চলকে আলাদা সত্তার সৌন্দর্য দান করে। এজন্য পাহাড়ের এমন বৈচিত্র্যের সুখ্যাতিতে মুগ্ধ হয়ে অনেক পর্যটক এ উৎসবে যোগ দিতে আগেই চলে আসেন।
কলাপাতার ভেলায় চেপে জলে ভেসে যাচ্ছে বিজু, মধু মালতী, জবা আর নয়নতারা; সঙ্গে যাচ্ছে পুরনো বছর। এই বিদায়ে বিচ্ছেদের বেদনা নেই, আছে নতুন প্রাণের আশ্বাস, পাহাড়ে নতুন ভোরের আনন্দ।
সকাল ৭টায় রাঙামাটি শহরের রাজবাড়ী ঘাটে চাকমাদের ফুলবিজুতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্যাঞ্চল কমিটির সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা।
বিপুল সংখ্যক চাকমা তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী মানুষ অংশ নেয় এই আয়োজনে।
সকাল ৮টায় রাঙামাটি শহরের গর্জনতলি এলাকায় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা অংশ নেন ‘হারি বৈসুক’-এ। তারাও একইভাবে পানিতে ফুল ভাসিয়ে, ঐতিহ্যবাহী গড়াইয়া নাচ নেচে, বয়স্কদের বস্ত্র দান করে এ উৎসব শুরু করেছে।
আগামীকাল শুক্রবার চাকমাদের ‘মূল বিজু’, ত্রিপুরাদের ‘বুইসুকমা’ পালিত হবে। আগামী ১৮ এপ্রিল মারমা জনগোষ্ঠীর ‘সাংগ্রাই’ এর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বৈসাবি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাসিন্দারা ভিন্ন ভিন্ন নামে বর্ষবরণ উৎসব পালন করলেও উদযাপনের ধরন আর রীতি প্রায় একই রকম। ১৯৮৫ সাল থেকে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান আর রাঙামাটির বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে ‘বৈসাবি’ নামে এ উৎসব উদযাপন করে আসছে।
বৈসাবি শব্দটি এসেছে ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ আর চাকমাদের ‘বিজু’ উৎসবের নাম মিলিয়ে। এ উৎসব এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের ঐক্য আর বন্ধনের প্রতীক।
বৈসুক:
ত্রিপুরাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসবের মধ্যে প্রধানতম উৎসব বুইসুক, বৈসুক বা বৈসু। চৈত্র মাসের শেষের দুইদিন ও নববর্ষের দিন পালন করা হয় এই উৎসব। চৈত্রমাসের শেষ দুইদিনের প্রথম দিনকে ‘হারি বুইসুক’ এবং শেষ দিনকে ‘বুইসুকমা’ বলে। আর নববর্ষের প্রথম দিনটিকে বলা হয় ‘বিসিকাতাল’।
উৎসবের প্রথমদিন ত্রিপুরা ছেলেমেয়েরা গাছ থেকে ফুল তুলে ঘর সাজায়। ঝুঁড়িতে ধান নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মোরগ-মুরগিকে ছিটিয়ে দেয় তারা। এ দিন গৃহপালিত সব প্রাণিকে খুব ভোরে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরিচ্ছন্ন কাপড় পড়ে ছেলেমেয়েরা গ্রামে ঘুরে বেড়ায়; খবারের আয়োজনে থাকে হরেক পিঠা।
বৈসুক শুরুর দিন থেকে ‘গরাইয়া’ নামে একটি নাচের দল গ্রামের বড়ি বাড়ি গিয়ে নাচ দেখায়। ২২টি অসাধারণ মুদ্রা সৃষ্টি করা এই এই নাচের দলের শিল্পীদের একজনের কাঁধে একটি শূল থাকে, যাতে বাঁধা থাকে একটি খাদি। যদি কোন ঘরের উঠোনে এই শূলটি বসানো হয় তবে ঘরের মালিককে গরাইয়া দেবতার পূজা দিতে হয়।
প্রত্যেক বাড়ির উঠোনে নাচ শেষে গৃহস্থরা শিল্পীদের মুরগির বাচ্চা, চালসহ অন্যান্য জিনিস দান করেন। বিনিময়ে শিল্পীরা সেই গৃহস্থকে সুর করে আশীর্বাদ করে। শিল্পীরা উপঢৌকন হিসেবে পাওয়া সামগ্রী দিয়ে গরাইয়া দেবতার পূজা করে। কোন শিল্পী যদি একবার এই গড়াইয়া নাচে অংশ নেয় তবে তাকে তিনবছর পর পর এই নৃত্যে অংশ নিতে হয়। নতুবা তার অমঙ্গল এমনকি মৃত্যু হয় বলে ‘ত্রিপুরা মিথ’ আছে।
এই লোকনৃত্যটিতে ১৬ জন থেকে ৫০০ জন পর্যন্ত অংশ নিতে পারে। বৈসুক উৎসবের জনপ্রিয় এ নাচ দেখতে সারাদেশ থেকে শত শত সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পী পার্বত্য চট্টগ্রামে যান।

 

বিজু :
পাহাড়ে বসবাসরত উল্লেখযোগ্য এসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী চৈত্রের (বাংলা) ২৯ তারিখ (খ্রিস্টাব্দ ১২এপ্রিল) ভোরে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু এবং বিহুর সূচনা করবে।
চাকমারা তিন ভাগে ভাগ করে বিজু উৎসব পালন করে। চৈত্র মাসের ২৯ তারিখে ‘ফুলবিজু’, ৩০ তারিখে ‘মূলবিজু’ এবং বৈশাখের প্রথম দিনে ‘গজ্যাপজ্যা’ বিজু পালন করা হয়।
ফুল বিজু :
ফুলবিজুর দিন চাকমারা বাড়ি-ঘর পরিচ্ছন্ন, বিজুর ফুল তুলে বাড়ির আঙিনা সাজায়, ঘর সাজায়। পরে সে ফুল নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বিজুর সময় ছোট ছেলেমেয়েরা পরিচ্ছন্ন কাপড় পরে দলবেঁধে বাড়ি বাড়ি বেড়াতে যায়। তারা সবাই বড়দের সালাম করে এবং ঘরের হাঁস মুরগিকে ধান চাল ছিটিয়ে দিয়ে খাওয়ায়। এছাড়া বাড়ির বয়োঃজ্যেষ্ঠদের গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরানো এবং তাদের ভালো খাবার খাওয়ানো হয়।
এ সময় হরেক রকম সবজি আর তরকারি দিয়ে ‘পাঁজন’ নামের একটি খাবার তৈরি করা হয়। এছাড়া অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য বাহারি রকমের ফলমূল সংগ্রহ, নানা ধরনের পিঠা-পুলি, পায়েস তৈরি, এবং মাছ-মাংসও রান্না করা হয়। থাকে বিন্নি ধানের খই, নাড়ু, সেমাই পাহাড়ি মদ সংগ্রহ এবং বিহারে গিয়ে ধর্মীয় উপাসনা করার মধ্যে ওইদিন ব্যস্ত সময় পার করে।
এদিন চাকমারা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে র‌্যালিতে যোগ দেয়, শিশুরা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় এবং শিশু কিশোর ও তরুণ তরুণীরা খেলাধুলায় মেতে ওঠে। সন্ধ্যায় বাড়ির উঠান ও গোশালায় প্রদীপ জ্বালিয়ে সবার মঙ্গল কামনা এবং মন্দিরে গিয়ে মোম জ্বালিয়ে পূজা করা হয়।
বিজু উৎসবের সময় মাছ- মাংসের আয়োজন না থাকলেও নববর্ষের দিন মজার সব খাবারের আয়োজন করা হয। নতুন বছরে ভালো কিছু খেলে সারা বছর ধরে ভালো খাবার খেতে পারবে বলে চাকমারা বিশ্বাস করে।

মূল বিজু :

চৈত্র মাসের ৩০ তারিখে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায় ভোরে উঠে অতিথিদের আপ্যায়নের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ওইদিন সারাদিন অতিথিদের খাওয়া-দাওয়া করানো, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে দেখা করাসহ আনন্দে উল্লাসে দিন কাটায় ওইসব জনগোষ্ঠী। ওইদিন অতিথিদের মধ্যে বিশেষ খাবার পাজন (বিভিন্ন সবজি মিশ্রিত তৈরি খাবার) পরিবেশন করা হয়।
এছাড়া বাড়িতে তৈরি পিঠা-পুলি, ফলমূল, অন্য খাবারসহ পাহাড়ি ঐতিহ্য মদ খেতে দেওয়া হয়।
গোজ্যাপোজ্যা :
পহেলা বৈশাখের দিনটিকে চাকমা ভাষায় বলা হয় গোজ্যাপোজ্যা অর্থ্যাৎ বিশ্রামের দিন। ওইদিন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা সকালে উঠে মন্দিরে গিয়ে উপাসনা, নতুন কাপড়-চোপড় পরে ঘোরাঘুরি এবং দিন শেষে বিশ্রাম নেয়। এছাড়া ওইদিনও বাড়িতে বাড়িতে ভালো খাবার পরিবেশন এবং স্ব-স্ব গোষ্ঠীরা তাদের স্ব-স্ব নিয়ম-ভাষায় বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা, নাচ-গানে দিন কাটায়।
জলকেলি :
নববর্ষের পরের দিন তথা মগ বা রাখাইন সম্প্রদায়ের মতে মারমা-রাখাইন জনগোষ্ঠী ওইদিন সকালে গৌতম বুদ্ধের মূর্তিকে স্নান করিয়ে মানুষের মধ্যে পবিত্রতার ছোঁয়া ছড়িয়ে দেয়।
এরপর ওইসব জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা গ্রামে গ্রামে জলকেলির আয়োজন করে। জলকেলির (‘মিঠারী’ মারমা ভাষা) মূল কারণ হলো পুরাতন বছরের সব গ্লানি, দুঃখ-কষ্ট এবং সব অশুভ শক্তিকে বিদায় জানিয়ে মৈত্রীজালে বন্ধন সৃষ্টি এবং নতুন বছরে মঙ্গল কামনা করাই হলো এই জলকেলির উদ্দেশ্য।
তবে জলকেলি কোনো ধর্মীয় উৎসব নয় এটি সামাজিক উৎসব। এ উৎসব বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন স্থানে করে থাকে।
সাংগ্রাই
পুরানো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করার উৎসবকে সাংগ্রাই উৎসব বলে। মারমারা সাধারণত চন্দ্রমাস অনুসারে এই দিনটি পালন করে। বছরের শেষ দুইদিন এবং নববর্ষের প্রথমদিনে এ উৎসব হয়। চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে এ উৎসব পালন করা হয় বলে ‘সংক্রান্তি’ শব্দ থেকেই সাংগ্রাই শব্দ এসেছে।
এদিন পাঁচন, পিঠা এবং নানা মুখরোচক খাবারের আয়োজন করে মারমা জনগোষ্ঠী। সবাই নতুন পোশাক পরে, একে অপরের বাড়ি যায় এবং কুশল বিনিময় করে। সববয়সী নারীপুরুষ নেচে গেয়ে আনন্দে মেতে ওঠে; বৃদ্ধরা অষ্টশীল পালনের জন্য মন্দিরে যায়। এছাড়া মারমারা ‘ঘিলাখেলা’ নামে একটি খেলা খেলে।
এ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ জলঅনুষ্ঠান বা ‘পানিখেলা’। বাড়ির আঙিনায় আগে থেকে পানি খেলার জন্য প্যান্ডেল তৈরি করা থাকে। মারমা যুবকরা বাদ্য আর গানের তালে তালে এসে উপস্থিত হয় অনুষ্ঠানস্থলে।
সেখানে ফুলে ফুলে সাজানো প্যান্ডেলের ভেতর পানি নিয়ে অপেক্ষায় থাকে মারমা তরুণীরা। পরে তারা এক অপরকে জল ছিটায়। পানিকে পবিত্রতার প্রতীক ধরে মারমা তরুণ তরুণীরা পানি ছিটিয়ে নিজেদের শুদ্ধ করে নেয়।
মারমা সংস্কৃতি সংসদ প্রতি বছর মারমা অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে এই পানি উৎসব করে। এ বছর এই পানি খেলা ১৮ এপ্রিল রাঙামাটির আসামি বস্তির নারকেল বাগানে অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া বান্দরবানে চাকমা-তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিজু উৎসব শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার সকালে সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসিয়ে নতুন স্বাগত জানায় তারা।
x

Check Also

খন্দকার মোশাররফের গাড়িবহরে বাসের ধাক্কা, নিহত ১

এমএনএ জেলা প্রতিনিধি : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা আমিরাবাদ এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে ...

Scroll Up