তাজিন আহমেদের দাফন বনানী কবরস্থানে

এমএনএ বিনোদন রিপোর্ট : ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী, সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত তাজিন আহমেদ হঠাৎ করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আর কখনো হাসবেন না চোখ বুজে আসা সেই হাসি। তার চঞ্চলতা মাখা বাক্যালাপে মুগ্ধতাও ছড়াবে না আর। অভিনয় নিয়ে কখনোই আর দর্শকের মনে দোলা দেবেন না তিনি। এ যাত্রা তার, চিরতরে। মাত্র ৪৩ বছর বয়সেই নিভে গেল প্রাণোচ্ছ্বল এই অভিনেত্রীর জীবন প্রদীপ।
গতকাল মঙ্গলবার সকালের দিকে হার্ট অ্যাটাক করলে তাকে দ্রুত রাজধানীর উত্তরার চীন-জাপান মৈত্রী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানকার ডাক্তাররা অপারগ হলে এরপর দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে এ অভিনেত্রীকে নেয়া হয় উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে। এ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে আসে মিডিয়া পাড়ায়। বিশেষ করে নাট্যাঙ্গনের তার সহকর্মীরা শুটিং বন্ধ রেখে তাকে শেষবারের মতো দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান।
এ সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন চিত্রনায়ক রিয়াজ, অভিনেতা রওনক হাসান, নির্মাতা বদরুল আনাম সৌদ, সকাল আহমেদ, অভিনেত্রী জেনীসহ অনেকেই।
সন্ধ্যায় উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের একটি মসজিদে গোসল শেষে তাজিনের মরদেহ উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের রিজেন্ট হাসপাতালে রাখা হয়। সেখান থেকে রাত ১০টায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের হিমঘরে নিয়ে যাওয়া হয় তার মরদেহ।
আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় উত্তরার আনন্দ বাড়ি শুটিং স্পটে রাখা হয় তাজিন আহমেদের মরদেহ। সেখানে তার সহকর্মী ও শোবিজ অঙ্গনের অনেকেই তাকে শেষ বারের মতো দেখতে আসেন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত মরদেহ এখানেই রাখা হবে। এরপর বাদ জোহর গুলশানের আজাদ মসজিদে জানাজার পর রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তার বাবার কবরে তাকে দাফন করা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে অচেতন অবস্থায় তাকে উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থা গুরুতর বলে তখনই তাকে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। বিকেল ৪টা ২০ মিনিট নাগাদ কর্তব্যরত চিকিৎসক নূর হোসেন তাজিন আহমেদকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা জানান, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই নোয়াখালীতে জন্ম নেন ক্ষণজন্মা এই অভিনেত্রী। জন্ম নোয়াখালীতে হলেও তার ছোটবেলায় বাবাকে হারানোয় পাবনায় নানা বাড়িতে বেড়ে ওঠেন তিনি। এরপর কৈশোরে চলে আসেন ঢাকায়। মায়ের পৈতৃক বাড়ি ছিল আদাবরে। সেখানেই মানুষ হতে থাকেন। ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন এ অভিনেত্রী। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর করেছেন তিনি।
পড়ালেখা শেষে শখের বশে শুরু করেন অভিনয়। করেছেন সাংবাদিকতাও। নাটক লিখেছেন টেলিভিশনে। উপস্থাপনাও করেছেন তিনি। একটা সময় নিজেকে সমৃদ্ধ করতে যোগ দিয়েছেন মঞ্চ নাটকে।
১৯৯৬ সালে দিলারা জলি রচিত ও শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত ‘শেষ দেখা শেষ নয়’ নাটকের মধ্য দিয়ে তার অভিনয় জীবনের শুরু। নাটকটি বিটিভিতে প্রচার হয়। এরপর তিনি অসংখ্য নাটক-টেলিছবি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের নাটক ‘নীলচুড়ি’তে অভিনয় করেও বেশ আলোচিত হন। তার সর্বশেষ অভিনীত ধারাবাহিক নাটক ‘বিদেশি পাড়া’। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি মিডিয়া থেকে দূরে ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করেছিলেন এই অভিনেত্রী। সঙ্গীত শিল্পী ও পরিচালক রুমি রহমানের সাথেই সংসার জীবনে আবদ্ধ ছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ জীবনে একাকী জীবন কাটছিল তার।
তাজিন আহমেদ ভোরের কাগজ, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। আনন্দ ভুবন ম্যাগাজিনের কলামিস্টও ছিলেন তিনি। পরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
‘নাট্যজন’ নাটকদলের হয়ে তিনি মঞ্চে কাজ করেছেন। পরে ২০০০ সালে ‘আরণ্যক’ নাট্যদলে যোগ দিয়েছিলেন এই অভিনেত্রী। গত বছরের অক্টোবরে আরণ্যকের ‘পস্প ও মঙ্গল’ নাট্যোৎসবে ‘ময়ূর সিংহাসন’ নাটকে বলাকা চরিত্রে অভিনয় করেন।
তবে টিভি নাটকে অভিনয় করে দর্শকের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। তার সর্বশেষ ধারাবাহিক নাটক ‘বিদেশি পড়ি’।
তাজিন রেডিও এবং টেলিভিশনে উপস্থাপনাও করেছেন। তিনি লেখালেখিও করতেন। তার লেখা ও পরিচালনায় নির্মিত হয়েছিল ‘যাতক’ ও ‘যোগফল’ নামে দুটি নাটক। তার লেখা উলেল্গখযোগ্য নাটকগুলো হচ্ছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’, ‘অনুর একদিন’, ‘এক আকাশের তারা’, ‘হুম’, ‘সম্পর্ক’ প্রভৃতি।
মায়ের হাত ধরেই অভিনয়ে আসেন তাজিন আহমেদ। মা দিলারা জলির প্রোডাকশন হাউজ ছিল। তিনি দীর্ঘদিন থিয়েটারেও অভিনয় করে
অভিনয়ের বাইরে লেখালেখির কাজেও যুক্ত ছিলেন তাজিন। লিখেছেন একাধিক নাটক। আর নিয়মিত মিডিয়ায় সময় দিতে না পারলেও উপস্থাপনায় ছিলেন বেশ দাপুটে। এনটিভিতে প্রচারিত ‘টিফিনের ফাঁকে’ অনুষ্ঠানে টানা ১০ বছর উপস্থাপনা করেন তিনি। একাত্তর টিভিতেও ‘একাত্তরের সকালে’ হাজির হয়েছেন তিনি।
রাজনীতিতেও যোগ দিয়েছিলেন তাজিন। ববি হাজ্জাজের রাজনৈতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে’ (এনডিএম) যোগ দিয়েছিলেন তিনি। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির বিভাগীয় সম্পাদক (সাংস্কৃতিক) পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকায় একা বসবাস করে আসছেন। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তার মেকাপ আর্টিস্টই তাকে দেখাশোনা করতেন। মূলত বিটিভিযুগীয় অভিনেত্রী ছিলেন তাজিন আহমেদ। ওই সময়ে বিটিভির দর্শকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় একটি নাম হয়ে উঠেন তিনি।
কোথায় আছেন তাজিন আহমেদের মা। বিশ্বস্ত একটি সূত্রে জানা গেল, এই অভিনেত্রীর মা বর্তমানে গাজীপুরের একটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। তাজিন আহমেদ মাঝে মধ্যে গিয়ে তাকে দেখে আসতেন। তার খালা-মামারা আদাবরে থাকলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না তাজিনের।
দাম্পত্য জীবনেও খুব একটা সুখী হতে পারেননি তাজিন। প্রথম জীবনে তাজিন আহমেদ ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন নাট্য নির্মাতা এজাজ মুন্নাকে। বেশিদিন টেকেনি সেই সংসার। এরপর তিনি বিয়ে করেন মিউজিশিয়ান রুমি রহমানকে। এই সংসারেও হয়তো ঝামেলা ছিল। জীবন প্রদীপ নিভে যাবার আগে দ্বিতীয় স্বামীকেও পাশে পেলেন না তাজিন।
শেষ জীবনে পরিবার-পরিজন থেকে নিজেকে আড়ালে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অভিনয় জগতের প্রিয় অঙ্গনের সঙ্গেও ছিল দূরত্ব। অল্প কিছু প্রিয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হলেও সেটা মুঠোফোন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ ছিল। বেশ নীরবে নিভৃতেই কেটেছে তার শেষ দিনগুলো। সেগুলো যে বিষাদময়, যাতনাময় ছিল তার প্রমাণ দেয় তাজিনের ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো।
এই তো ফুুরিয়ে গেল স্বাধের জীবন! আর কোনো অনুভূতি জ্বলবে না, জ্বালাবে না! কাউকে প্রয়োজনও পড়বে না আর।
x

Check Also

নির্বাচন করবেন না ড. কামাল হোসেন

এমএনএ রিপোর্ট : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবেন না বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ ...

Scroll Up