প্রবৃদ্ধি হলেও রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। তবে পোশাক খাতের ওপর ভর করে আয়ে কিছুটা প্রবৃদ্ধি এসেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানি থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। আয় হয়েছে তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ৮১ লাখ মার্কিন ডলার। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ২২ শতাংশ কম। অর্থের পরিমাণে দাঁড়ায় আট কোটি ৩১ লাখ ডলার। তবে এ আয় আগের বছরের চেয়ে বেশি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। আজ বুধবার এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সব ধরনের পণ্য রপ্তানিতে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ছিল মোট তিন হাজার ৪৬৫ কোটি ৫৯ লাখ মার্কিন ডলার। সদ্য অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আয়ের তুলনায় ২০ কোটি ১২ লাখ ডলার বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। এ হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ।

পুরো বছরের হিসাবে প্রবৃদ্ধি হলেও একক মাস হিসাবে জুনে রপ্তানি আয়ে ব্যাপকভাবে হোঁচট খেয়েছে। এ মাসে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি, কমেছে প্রবৃদ্ধিও। ইপিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, একক মাস হিসাবে জুনে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছিল ৩৬২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এ সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ২৯৩ কোটি ৯৩ লাখ মার্কিন ডলার; যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ কম। তার আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ কম অর্জিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতের পণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছে তিন হাজার ৬১ কোটি ৪৭ লাখ মার্কিন ডলার। এ খাতের রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় এক দশমিক ৫১ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয় হয়েছিল দুই হাজার ৮১৪ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। এ হিসাবে আয় বেশি হয়েছে ২৪ কোটি ৬৪ লাখ ডলার।

একই সঙ্গে বেড়েছে প্রবৃদ্ধির হারও। অর্থবছরের জুলাই-জুন মেয়াদে পোশাক খাতে আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতের পণ্য রপ্তানিতে এক হাজার ১১৮ কোটি ৮৫ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা বেশি। তবে নিট প্রবৃদ্ধি হয়েছে ডাবল ডিজিট হারে অর্থাৎ ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ।

অন্যদিকে ওভেন গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানিতে এক হাজার ৫৪২ কোটি ৬২ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশকিস ৪৩ শতাংশ বেশি। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন- বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে পোশাক শিল্পকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। আমরা এখন শতভাগ কমপ্লায়েন্স কারখানার দিকে হাঁটছি। ফলে রফতানিতে খুব সন্তোষজনক কিছু অর্জন করা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, ‘রপ্তানি আয়ে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু প্রতিযোগী দেশগুলো আমাদের চেয়েও এগিয়ে গেছে। তাদের প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি।’

সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘ইউরোর দরপতন, ব্রেক্সিট ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের প্রভাবে আমাদের পণ্যের দরপতন হলেও দুই বছরে গ্যাস সংকটসহ নানাবিধ কারণে আমাদের পণ্য উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। এ অবস্থায় সরকারকে আরও সহযোগী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। রফতানির নতুন নতুন বাজার উদ্ভাবন করতে হবে।’

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘রপ্তানি খাতগুলোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি তাই সার্বিক বিবেচনায় সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রণোদনার মাধ্যমে সহযোগিতার দাবি জানাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘ইউরোপের বাজারসহ অন্যান্য দেশের ক্রেতা এবং পণ্যের মূল্য ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান বেড়েছে ৭.৮৪ শতাংশ। মজুরি, জ্বালানি, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। মজুরি বৃদ্ধির ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ১৭.১১ ভাগ বেড়েছে। ফলে পোশাক শিল্প নিদারুণ চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে অস্তিত্ব এবং আমাদের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখা এখন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এছাড়া অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্সের শর্তানুযায়ী এ শিল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।’

‘এ অবস্থায় অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে আমাদের টিকে থাকতে হলে উৎসে কর হ্রাস করা অত্যাবশ্যক’- যোগ করেন তিনি।

ইপিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্যান্য পণ্যের মধ্যে গত অর্থবছর হোম টেক্সটাইল খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এ সময় আয় এসেছে ৮৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। সার্বিক রপ্তানি আয় বাড়লেও তা মূলত পোশাক খাতনির্ভর। পাট ও পাটজাত পণ্যের প্রতি সরকারের বিশেষ নজরদারির কারণে এ খাতে গত বছরের চেয়ে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে অর্জিত হয়নি লক্ষ্যমাত্রা। এ সময়ে এ খাত থেকে আয় এসেছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ কম।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে ধস নেমেছে। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রপ্তানি আয় কম হয়েছে ২১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। প্রবৃদ্ধিও গত বছরের চেয়ে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ কম হয়েছে। আয় হয়েছে ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।

এছাড়া গেল বছর প্লাস্টিক পণ্যে প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ সময়ে আয় হয়েছে নয় কোটি ৮৪ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ কম।

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ২১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ খাত থেকে আয় এসেছে ৬৭ কোটি ৩৭ লাখ ডলার।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বর্তমানে সারাবিশ্বের অর্থনীতিতে একটি শ্লথগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চীনে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেছে। অন্য দেশেও প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের সরে আসার সিদ্ধান্ত (ব্রেক্সিট), পাউন্ড ও ইউরোর দরপতন- সব মিলিয়ে বৈশ্বিক হিসাবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ভালো। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এখনও ভালো অবস্থানে। তবে নন-ট্র্যাডিশনাল মার্কেটে আমাদের রপ্তানি বাড়াতে হবে।’

x

Check Also

দলীয় সরকারের অধীনেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব : টিআইবি

এমএনএ রিপোর্ট : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করে দলীয় সরকারের অধীনেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব। ...

Scroll Up