চ্যাম্পিয়ন রংপুরকে হারিয়ে শুভসূচনা করল চিটাগাং ভাইকিংস

এমএনএ স্পোর্টস ডেস্ক : বিপিএলের ষষ্ঠ আসরের উদ্বোধনী ম্যাচটি রান খরায় বর্ণিল হয়ে উঠেনি। বরং ব্যাটিং হয়েছে বর্ণহীন। টি-টোয়েন্টি ম্যাচের স্বাদ পায়নি দর্শকরা। তবে ছোটো রানের ম্যাচে অবশ্য লড়াই মন্দ হয়নি। জয়ের জন্য টার্গেটটা বেশি ছিল না, মাত্র ৯৯। সেই রান তুলতে ৬২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল চিটাগং ভাইকিংস। ফলে জমে উঠেছিল খেলা। উত্তেজনা ছিল শেষ পর্যন্ত। অবশেষে টানটান রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে গতবারের চ্যাম্পিয়ন রংপুরকে হারিয়ে শুভসূচনা করে শেষ হাসি হেসেছে চিটাগং ভাইকিংস।

বিপিএলের ষষ্ঠ আসরের প্রথম ম্যাচে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রংপুর রাইডার্সকে ৩ উইকেটে হারিয়েছে চিটাগং ভাইকিংস। মিরপুরে আজ শনিবার ২০ ওভারে ৯৮ রানে গুটিয়ে গিয়েচিল রংপুর, চিটাগং জিতেছে শেষ ওভারের প্রথম বলে।

ফেভারিটদের হারিয়ে চিটাগংয়ের এই জয়ের নায়ক রবি ফ্রাইলিঙ্ক। নতুন বলে তিন উইকেট নিয়ে তিনিই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন রংপুরের টপ অর্ডার। পরে ফিরে উইকেট নেন আরও একটি। ব্যাটিংয়েও শেষ দিকে ঠাণ্ডা মাথায় দলকে নিয়ে গেছেন জয়ের ঠিকানায়।

ইনিংসের প্রথম বলেই উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে ছক্কা হাঁকানোর চেষ্টা করেন চিটাগাং ভাইকিংসের ওপেনার মোহাম্মদ শাহজাদ।

তা বুঝতে পেরে লেন্থ খাটো করে দেন রংপুর রাইডার্স অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাথে হালকা ইনসুইং করায় পুরোপুরি পরাস্ত হন শাহজাদ। মাঝ ব্যাটের বদলে ব্যাটের উপরের কানায় লেগে বল উঠে যায় আকাশে। কিন্তু সৌভাগ্যবশত খালি জায়গায় পড়ায় বেঁচে যান শাহজাদ, পেয়ে যান এক রান।

চিটাগং ভাইকিংসের ইনিংসের এই প্রথম বলটিই যেনো হয়ে থাকলো উদ্বোধনী ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসের প্রতিকী চিত্র। যেখানে পুরো ইনিংসজুড়েই সম্ভাবনা জাগিয়েছেন মাশরাফি, নাজমুল অপুরা। কিন্তু বারবারই অল্পের জন্য বেঁচেছেন ভাইকিংস ব্যাটসম্যানরা। শেষপর্যন্ত পাঁচ বল হাতে রেখে ৭ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় চিটাগং ভাইকিংস।

রান তাড়া করতে নেমে একপ্রান্ত থেকে আফগান শাহজাদ মারমুখী ব্যাটিং করলেও অপরপ্রান্তে সঙ্গ দিতে পারেননি কেউই। ইনিংসের তৃতীয় ওভারে ক্যামেরন ডেলপোর্ট এবং পরের ওভারেই সাজঘরে ফিরে যান মোহাম্মদ আশরাফুল।

ইনিংসের প্রথম ছক্কা হাঁকালেও মাত্র ৮ রানই করতে পেরেছেন ডেলপোর্ট। রংপুর অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার বোলিংয়ে অ্যালেক্স হেলসের হাতে ধরা পড়েন তিনি। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর পরে বিপিএল খেলতে নেমে সুবিধা করতে পারেননি মোহাম্মদ আশরাফুলও।

শুরুটা দেখেশুনে সিঙ্গেল নিয়েই করেছিলেন আশরাফুল। কিন্তু মুখোমুখি পঞ্চম বলে বড় শট খেলতে গিয়েই ধরা পড়েন থার্ডম্যান ফিল্ডারের হাতে। নামের পাশে যোগ করতে পেরেছেন মাত্র ৩ রান। মাত্র ১৯ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে শুরুতেই চাপে পড়ে যায় চিটাগং।

তৃতীয় উইকেট জুটিতে প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেন অধিনায়ক মুশফিকুর রহীম ও শাহজাদ। দুজন মিলে যোগ করেন ৩২ রান। অষ্টম ওভারেই দলীয় পঞ্চাশ পূরণ করে সহজ জয়ের দিকেই এগুচ্ছিলো চিটাগং। কিন্তু তখনই শাহজাদকে লেগ বিফোর উইকেটে পরিণত করে ম্যাচ জমিয়ে তোলেন বেনি হাওয়েল।

আউট হওয়ার আগে ৪ চারের মারের ২৩ বলে ২৭ রান করে শাহজাদ। তখনো টিকে ছিলেন মুশফিক। একপ্রান্ত আগলে রেখে তিনি দলকে জয়ের কাছে নিতে থাকলেও অপর প্রান্তে কেউই সঙ্গ দেননি তেমনভাবে। সিকান্দার রাজা ৩ ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত ২ রান করে আউট হলে চাপে পড়ে যায় চিটাগং।

তবে তরুণ অফস্পিনার নাঈম হাসান ১০ রানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলে মুশফিকের কাজ সহজ হয়ে যায়। তাকে বোল্ড করে রংপুরের আশা জাগিয়ে তোলেন মাশরাফি। পরের ওভারেই মুশফিকও ফিরে গেলে ম্যাচ জমে ওঠে।

তবে শেষদিকে চিটাগংয়ের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন বল হাতে ৪ উইকেট নেয়া রবি ফ্রাইলিংক। সানজামুল ইসলামের সাথে অবিচ্ছিন্ন ১৬ রানের অষ্টম উইকেট জুটি গড়ে ম্যাচ জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন তিনি। ফ্রাইলিংক ১২ এবং সানজামুল ৭ রানে অপরাজিত থাকেন।

রংপুরের পক্ষে বল হাতে ২ উইকেট নেন মাশরাফি। এছাড়া ১টি করে উইকেট দখল করেন শফিউল, হাওয়েল, ফরহাদ রেজা এবং নাজমুল অপু। ব্যাটে-বলে সমান অবদান রেখে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন চিটাগংয়ের ফ্রাইলিংক।

টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ওভারটা দেখেশুনেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন রংপুর ওপেনার মেহেদি মারুফ। দ্বিতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলে স্ট্রাইক পান হেলস। রবি ফ্রাইলিংকের ভেতরে ঢোকা ডেলিভারী সময়মতো ব্যাট চালাতে ব্যর্থ হলে আঘাত হানে প্যাডে।

জোরালো আবেদনে আঙুল তুলে দেন আম্পায়ার। রিভিউ থাকলেও তা নেননি হেলস। রিপ্লেতে দেখা যায় আম্পায়ার্স কলে আউটই থাকতেন হেলস। ষষ্ঠ আসরে প্রথম উইকেট নেন ফ্রাইলিংক।

দ্বিতীয় উইকেটটাও যায় ফ্রাইলিংকের নামেই। একই ওভারের চতুর্থ বলে সরাসরি বোল্ড করে দেন মোহাম্মদ মিঠুনকে। হেলসের মতো তিনিও ব্যর্থ হন রানের খাতা খুলতে।

বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রংপুরের বিপদ আরও বেড়ে যায় তৃতীয় ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকান মারকুটে ব্যাটসম্যান রিলে রুশো উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরলে। মাত্র ১০ রানেই তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় রংপুর।

সেই চাপ সামাল দেয়ার বদলে আরও বাড়িয়ে দেন উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান মেহেদি মারুফ। রবি ফ্রাইলিংকের তৃতীয় শিকার হওয়ার পথে তিনি ধরা পড়েন সানজামুল ইসলামের হাতে। তারপর নাঈমের বলে আবু জায়েদের হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন বেনি হাওয়েল। তখনো পর্যন্ত দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৮ রান করেন তিনি।

ব্যর্থতার ধারা বজায় রেখে দলীয় ৩২ রানের মাথায় ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন ফরহাদ রেজা। তরুণ অফস্পিনার নাঈম হাসানের বোলিংয়ে লেগ বিফোরের ফাঁদে ধরা পোড়ার আগে তিনি করেন মাত্র ৩ রান।

ষষ্ঠ উইকেটের পতনে উইকেটে আসেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। চাপের মুখে রয়েসয়ে ব্যাটিং শুরু করেন তিনি। সানজামুলের ইসলামের এক ওভার পুরো মেইডেনই দিয়ে দেন। কিন্তু এক ওভারের পরেই খালেদ আহমেদ বোলিংয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে নিজের উইকেট হারান মাশরাফি।

আউট হওয়ার আগে ২ রান করতে ১১টি বল খেলেন মাশরাফি। পরে রংপুরের আশার প্রদীপ জালিয়ে রেখে অষ্টম উইকেটে সোহাগ গাজীকে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যান ইংলিশ অলরাউন্ডার রবি বোপারা।

মাত্র ৩৫ রানে ৭ উইকেট হারানোর পর শঙ্কা জেগেছিল পঞ্চাশের নিচেই অলআউট হয়ে যাওয়ার। তবে অষ্টম উইকেট জুটিতে দলের মান রক্ষা করেছেন ইংলিশ অলরাউন্ডার রবি বোপারা এবং দেশি অফস্পিনার সোহাগ গাজী। দুজন মিলে ৪৯ রানের জুটি গড়ে দলীয় সংগ্রহটা ভদ্রস্থ করতে পেরেছেন।

তবে বোপারা-গাজীর চেষ্টার পরেও শতরান করতে পারেনি বিপিএলের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দল রংপুর রাইডার্স। নির্ধারিত ২০ ওভারে সবকয়টি উইকেট হারিয়ে ৯৮ রানের সংগ্রহ দাঁড় করিয়েছে তারা। ম্যাচ জিততে চিটাগংস ভাইকিংসকে করতে হবে মাত্র ৯৯ রান।

রংপুরের পক্ষে সর্বোচ্চ ৪৪ রান করেছেন বোপারা। ৪৭ বলে ৩ চার ও ২ ছক্কার মারে এ রান করেন তিনি। এছাড়া দুই অঙ্ক ছুঁতে পেরেছেন কেবল গাজী। ৩ চারের মারে ১৭ বলে ২১ রান এসেছে তার ব্যাট থেকে। আর কেউই ন্যূনতম ১০ রানও করতে পারেননি।

চিটাগাং ভাইকিংসের পক্ষে বল হাতে বাজিমাত করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডান হাতি মিডিয়াম ফাস্ট বোলার রবি ফ্রাইলিংক। ৪ ওভারের স্পেলে মাত্র মাত্র ১৪ রান খরচায় ৪ উইকেট নিয়েছেন তিনি। এছাড়া আবু জায়েদ রাহী ও নাঈম হাসান নিয়েছেন ২টি করে উইকেট।

সংক্ষিপ্ত স্কোর :

রংপুর রাইডার্স : ২০ ওভারে ৯৮ (মারুফ ১, হেলস ০, মিঠুন ০, রুশো ৭, বোপারা ৪৪, হাওয়েল ৮, ফরহাদ ৩, মাশরাফি ২, সোহাগ ২১, নাজমুল ৪, শফিউল ১*; আবু জায়েদ ৪-০-৩০-২, ফ্রাইলিঙ্ক ৪-০-১৪-৪, খালেদ ৪-০-১৫-১, নাঈম ৪-০-১০-২, সানজামুল ৪-১-২৭-০)।

চিটাগং ভাইকিংস : ১৯.১ ওভারে ১০১/৭ (শাহজাদ ২৭, দেলপোর্ত ৮, আশরাফুল ৩, মুশফিক ২৫, রাজা ৩, মোসাদ্দেক ২, নাঈম ১০, ফ্রাইলিঙ্ক ১২*, সানজামুল ৭*; মাশরাফি ৪-০-২৪-২, সোহাগ ৩-০-১৮-০, শফিউল ২.১-০-১৯-১, নাজমুল ৪-০-১৭-১, হাওয়েল ৪-০-১৩-১, ফরহাদ ২-০-১০-১)।

ফল : চিটাগং ভাইকিংস ৩ উইকেটে জয়ী

ম্যান অব দা ম্যাচ : রবি ফ্রাইলিঙ্ক

x

Check Also

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

এমএনএ রিপোর্ট : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ধর্মীয় উস্কানি ও জাতিগত বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগের ...

Scroll Up