বাংলাদেশে শিক্ষাঙ্গনের উন্নয়ন এবং ছাত্র আন্দোলন

এমএনএ রিপোর্ট : শিক্ষাঙ্গনের ভিতের ওপর নির্মিত হয় যে কোনো দেশের উন্নয়ন। প্রকৃতপক্ষে এ দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। এ কথা বলার অর্থ এ নয় যে, বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে না। তবে যে উন্নয়ন হচ্ছে তা অবকাঠামোগত উন্নয়ন। ওই অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আবার ব্যাপক দুর্নীতির চর্চা রয়েছে। কেবল দালানকোঠা আর রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হলে দেশে প্রকৃত উন্নয়ন হয় না।

উন্নয়ন ঘটাতে হয় মানুষের সংস্কৃতিতেও। তার মানবিক মূল্যবোধ ও মননে। সমাজের নিরাপত্তা ও মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা ও সেবামুখী রাজনীতিতে। আর এসব উন্নয়ন ঘটাতে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা হল শিক্ষা। কারণ, মানুষকে সুশিক্ষা দিতে পারলে সে কল্যাণকামী হয়। পরোপকারী হয়। অন্যের বিপদাপদে সহায়তা করে।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশ শিক্ষাক্ষেত্রে যথেষ্ট পিছিয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে আমরা ইতিবাচক অগ্রগতি দেখছি না। শিক্ষা নিয়ে সরকারের প্রায় প্রতিটি এক্সপেরিমেন্ট ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় এক্সপেরিমেন্ট চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ফেল করেছে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি। একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করা যায়নি। নিম্ন পর্যায়ের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায়, দেশে বিরাজিত রয়েছে বহু রকম শিক্ষা ব্যবস্থা।

এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল, কিন্ডারগার্টেন স্কুল, বাংলা মিডিয়াম স্কুল, ইংরেজি মিডিয়াম ন্যাশনাল কারিকুলাম পড়ানো স্কুল, সেনাবাহিনী পরিচালিত ক্যাডেট কলেজ, এনজিও পরিচালিত স্কুল, বিদেশি মিশনারি পরিচালিত স্কুল, নানা রকম মাদ্রাসা (আলিয়া, কওমি, ফোরকানিয়া, হাফিজিয়া, ক্যাডেট প্রভৃতি), ইউকের এডেক্সেল ও ক্যামব্রিজ বোর্ড পরিচালিত ‘ও’ লেভেল ‘এ’ লেভেল কারিকুলাম পড়ানো ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন পরিচালিত স্কুল। এই হরেক রকম স্কুল থেকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন রকম কারিকুলাম পড়ে নানাভাবে সামাজিকীকৃত হয়।

প্রাইমারি শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশের অগ্রগতি অর্জিত হয় উচ্চশিক্ষার পথ ধরে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান বাড়ছে না। দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও এগুলোর মধ্যে মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা খুবই কম। তবে দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি এ দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এবং মুনাফার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন ও একাডেমিক চরিত্রকে ভিন্ন বৈচিত্র্য প্রদান করেছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোটি কোটি টাকা মুনাফা করলেও আজ পর্যন্ত মেয়েদের জন্য একটি আবাসিক ছাত্রীনিবাস তৈরি করেনি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ১৯৭৩ সালের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ/আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা হলেও ভিসি নিয়োগ থেকে প্রতি পদে এ অধ্যাদেশের স্খলন ঘটছে।

প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নির্বাচন হলেও ছাত্র সংসদের নির্বাচন হচ্ছে না। ২৮ বছর পর এ বছর ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচন হলেও তা হয়েছে দুর্নীতি ও কারচুপিযুক্তভাবে। এ নির্বাচন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত করেছে। সরকারি দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ব্যতীত নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বাকি পাঁচটি প্যানেল এ নির্বাচনকে ‘কলঙ্কিত নির্বাচন’ আখ্যা দিয়ে নির্বাচনী ফলাফল বাতিল করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলনরত রয়েছে।

দেশের অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও ভালো নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় একাডেমিক মান ক্রমান্বয়ে নিচে নামছে। শিক্ষক নিয়োগ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে পেশাদারিত্ব সৃষ্টি করা যায়নি। কেবল একটি নামকাওয়াস্তের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক না লাগলেও ভোটার বৃদ্ধির জন্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। দু’জন বা তিনজন প্রভাষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়ে ৭ জন বা ১০ জন শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার নমুনাও রয়েছে।

এসব নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের জোরালো অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ব্যাপক দুর্নীতি ও কারচুপি করেও মেয়েদের কিছু হল সংসদে এবং কেন্দ্রীয় সংসদে ডাকসু ভিপিসহ আরেকটি পদে সরকারদলীয় সমর্থক ছাত্র সংগঠন জয়ী হতে পারেনি। ফলে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন এখন ডাকসুতে বাধাহীনভাবে যা খুশি তা করতে পারছে না।

একটি উদাহরণ দেয়া যাক। সম্প্রতি এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে এসএম হল সংসদ নির্বাচনে জিএস প্রার্থী হওয়া ফরিদ হাসানের ওপর সরকারি দল সমর্থক ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা হামলা করে তাকে এমন গুরুতরভাবে আহত করে যে তার শরীরের ক্ষতস্থানে ৩২টি সেলাই দিতে হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদ করে বিচার চাইতে গিয়ে ওই হলে হামলা ও লাঞ্ছনার শিকার হন ডাকসু ভিপিসহ বিভিন্ন প্যানেল থেকে ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ও হল সংসদের নির্বাচিত কতিপয় প্রতিনিধি।

এ সময় তাদের ওপর ‘ডিম হামলা’ করা হয়। এতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কয়েকজনসহ ১০ জন আহত হন বলে দাবি করা হয়। এ সময় ডাকসু ভিপিকেও অবরুদ্ধ করে রেখে তাকে গালিগালাজ করা হয় বলে পত্রিকার খবরে জানা যায়। এ ঘটনার বিচারের দাবিতে ভিপি নূরসহ প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান করে হামলাকারীদের বহিষ্কারের দাবি করেন। সোমবার বিকাল ৫টা থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান করেন। তবে রাতে প্রক্টর এসে তাদেরকে ঘটনার তদন্তের আশ্বাস দিলেও শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন না করে সারা রাত সেখানে অবস্থান করেন। পরদিন সকাল ৯টায় ভিসি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তার সঙ্গে নিয়ে যান এবং তাদের দাবি নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি তদন্তসাপেক্ষে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। তবে তারা আগামী মঙ্গলবার (০৯.০৪.২০১৯) পর্যন্ত প্রশাসনকে এ ঘটনার বিচার করার জন্য সময় দেন। এর মধ্যে বিচার করা না হলে তারা আবারও কর্মসূচি দেয়ার ঘোষণা দেন। কাজেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন এখন ঢাবি ক্যাম্পাসে যা খুশি তা করে পার পেতে পারছেন না। ‘ডিম হামলা’ করে যে ন্যায্য আন্দোলন দমন করা যাবে না তা এ ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে। ‘ডিম হামলা’ আন্দোলন ভণ্ডুল করার কৌশলে এক নতুন বৈচিত্র্য সংযোজন করেছে।

এছাড়াও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিতে ইদানীং যুক্ত হচ্ছে নানারকম বৈচিত্র্য। মাত্র মাস দুই আগে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে আড়াই মাস ধরে ক্লাস ও পরীক্ষা না হওয়ায় সেশনজটে পড়ায় তাদের একাডেমিক জীবনে অনিশ্চয়তা নেমে আসে। এর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা এক অভিনব আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন। তারা ক্যাম্পাসে লাইন ধরে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাতে কান ধরে আন্দোলন করেন। তারা বলেন, ‘জীবনে হয়তো কোনো পাপ করেছি যার প্রায়শ্চিত্ত করতে এসেছি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষক-প্রশাসন দ্বন্দ্বের কারণে গত আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে আমাদের ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না। এমনিতেই আমরা সেশনজটের মধ্যে পড়েছি। তার ওপর ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ায় আমাদের শিক্ষাজীবন অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে’।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আন্দোলনের সংস্কৃতিতে অতি সম্প্রতি অভিনব বৈচিত্র্য যোগ করেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিবিরোধী আন্দোলন। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের না জানানোর কারণে ওই দিন থেকে শিক্ষার্থীরা ভিসিবিরোধী আন্দোলন করছিলেন। পরবর্তীকালে ভিসি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দিলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত থাকে। ভিসি ২৮ মার্চ রাতে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করলে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস না ছেড়ে ভিসির পদত্যাগ দাবির আন্দোলন জোরদার করে এবং তাদের দাবি মেনে নিতে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেয়। এ আলটিমেটাম শেষ হলে ভিসি পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নবম দিনে নিজেদের রক্ত দিয়ে পোস্টার লিখে ক্যাম্পাসে পোস্টারিং করে ভিসির পদত্যাগ দাবি করে।

৪ এপ্রিল আন্দোলনের ১০ম দিন শিক্ষার্থীরা মাথায় লালফিতা বেঁধে রক্তে লেখা ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করে। পরে পুলিশ কমিশনারের অনুরোধ ও যাত্রীদের অসুবিধার কথা ভেবে তারা অবরোধ তুলে নেন। তবে তাদের দাবি মানা না হলে তারা আবারও সড়ক অবরোধের ঘোষণা দেন। এ রকম রক্তে লেখা পোস্টার, ব্যানারের কথা কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইতিপূর্বে ঘটেছে বলে শোনা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন সংস্কৃতিতে বিষয়টি নতুন মাত্রা হিসেবে দেখছেন ছাত্র আন্দোলন বিষয়ক লেখক ও গবেষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হল পঠন-পাঠন ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পবিত্র জায়গা। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে ক্রমান্বয়ে সে পরিবেশ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রের ওপর হামলার বিচার চাইতে গিয়ে ডিম হামলার শিকার হতে হবে কেন? কেন হাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের হাঁটু গেড়ে কানে ধরে মাফ চেয়ে শিক্ষক-প্রশাসনের দ্বন্দ্ব-সৃষ্ট ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেশনজটের কবল থেকে রেহাই পেতে অভিনব আন্দোলন করতে হবে? আর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কেনই বা শিক্ষার্থীদের নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে পোস্টার লিখে প্রতিবাদ করতে হবে? ছাত্র আন্দোলনের এ কেমন গতিধারা? এ কেমন নেতিবাচক নতুনত্ব? শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এমন হলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লেখাপড়ার পরিবেশ বজায় থাকে না। সম্ভব হয় না জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সুস্থ ও অনুকূল একাডেমিক পরিবেশ সৃষ্টি করা।

x

Check Also

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির বাংলাদেশে

এমএনএ রিপোর্ট : কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবির এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির। এর আগে ১ ...

Scroll Up