আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির জামিন আবেদন নামঞ্জুর

এমএনএ রিপোর্ট : বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় কারাবন্দি তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. সিরাজুল ইসলাম গাজী জামিন আবেদন নাকচ করেন।

তার আদালতেই গত শুক্রবার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি দেন নিহত রিফাতের স্ত্রী।

অবশ্য মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের অভিযোগ, ‘নির্যাতন ও জোরজবরদস্তি করে’ তার মেয়েকে ওই জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

আজ রবিবার সকালে মিন্নির জামিন আবেদন করে আদালতের কার্যতালিকায় তোলা হয় মামলাটি। পরে বেলা ১১টার দিকে মিন্নির জামিনের জন্য শুনানি শুরু হয়।

মিন্নিকে গ্রেপ্তারের পর গত ১৭ জুলাই আদালতে হাজির করার দিন কোনো আইনজীবী তার পক্ষে না দাঁড়ালেও আজ রবিবার মিন্নির জামিনের জন্য আদালতে শুনানিতে তার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বরগুনা জেলা আইনজবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মাহবুবুল বারী আসলাম, অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদের, অ্যাডভোকেট দীপক চন্দ্র হালদার, অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল নোমান, অ্যাডভোকেট সাহিদা বেগম, অ্যাডভোকেট আবদুর রশীদ ও অ্যাডভোকেট মো. মিজানুর রহমানসহ ৩০ জনেরও বেশি আইনজীবী। এ সময় মিন্নিকে আইনি সহায়তা দিতে ঢাকা থেকে আইন ও শালিশ কেন্দ্রের দুইজন এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সাতজনসহ মোট ৩০ জন আইজীবী শুনানিতে অংশ নেন।

অ্যাডভোকেট মো. মাহবুবুল বারী আসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আদালতে বলেছে, মিন্নি যেহেতু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে এবং মামলার তিন আসামি মিন্নির সংশ্লিষ্টতা আছে বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে; সেহেতু তার জামিন দেওয়া যাচ্ছে না। এখন আমরা জজকোর্টে জামিন আবেদন করবো।’

রিফাত হত্যা মামলায় নাটকীয়ভাবে মিন্নিকে ১৬ জুলাই গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১৭ জুলাই বরগুনা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই ১৯ জুলাই মিন্নি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে পরিবারের সদস্যরা জেলগেটে দেখা করতে গেলে মিন্নি তাদের বলেন, আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে পুলিশ তাকে যা বলতে বলেছে তিনি তাই বলেছেন। না বললে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়েছিল মিন্নিকে। তবে পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

গত ২৬ জুন রিফাতকে প্রকাশ্য সড়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সে সময় স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির চেষ্টার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে আলোচনার সৃষ্টি হয়।

পরদিন ২৭ জুলাই রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় একটি মামলা করেন; তাতে প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল মিন্নিকে।

সম্প্রতি মিন্নির শ্বশুর তার ছেলের হত্যাকাণ্ডে পত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করলে আলোচনা নতুন দিকে মোড় নেয়।

তবে শ্বশুর অভিযোগ তোলার পর মিন্নি তা অস্বীকার করে পাল্টা বলেছিলেন, দুলাল শরীফ ‘ষড়যন্ত্রকারীদের প্ররোচনায়’ পড়ে তাকে জড়িয়ে ‘বানোয়াট’ কথা বলছেন।

এরপর গত ১৬ জুলাই মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে। দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

পরদিন আদালতে হাজির করা হলে বিচারক মিন্নিকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সেদিন সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছেন, তিনি তিন জন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তাদের দাঁড়ানোর কথাও ছিল, কিন্তু তারা শুনানিতে অংশ নেননি।

ওই তিন আইনজীবী শুনানিতে না দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে ওকালতনামায় সই না হওয়ার কথা বললেও মিন্নির বাবা বলেন, ‘প্রতিপক্ষের ভয়েই’ আইনজীবীরা তার মেয়ের পক্ষে দাঁড়াননি।

আইনজীবী না থাকায় সেদিন মিন্নিকেই কথা বলার সুযোগ দেন বিচারক। মিন্নি তখন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “আমার স্বামী রিফাত শরীফ। আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার চাই। হত্যাকাণ্ডে আমি জড়িত নই। এ মামলায় আমাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে।”

রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নিকে পুলিশ যেভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে, তা নিয়ে রাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতেও আলোচনা হয়। এর পেছনে প্রভাবশালী কারও প্ররোচনা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন একজন সংসদ সদস্য।

এ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই রিমান্ডের তৃতীয় দিন শেষে শুক্রবার বিকালে মিন্নিকে আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে মিন্নি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানায়।

এ সময় মিন্নির বাবা মোজ্জাম্মেল হোসেন আদালত প্রাঙ্গণে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘জোর জবরদস্তি ও নির্যাতন করে’ তার মেয়ের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “মেয়ে আমার জীবন বাজি রেখে তার স্বামীকে রক্ষা করতে গেছে। এটাই তার অপরাধ? এসব কিছুই শম্ভু বাবুর (সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু) খেলা। তার ছেলে সুনাম দেবনাথকে সেইভ করার জন্য আমাদের বলি দেওয়া হচ্ছে।”

এ বিষয়ে বরগুনা-১ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বা তা ছেলের বক্তব্য জানা যায়নি। তবে তিনি শনিবার রাতে মিন্নির আইনজীবী মাহাবুবুল বারী আসলামকে তার চেম্বারে ডেকে নেন বলে আইনজীবীরা জানান।

মাহাবুবুল বারী আসলামকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে রোববার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এমপি শম্ভু একজন সিনিয়র আইনজীবী। তার সাথে দেখা করেছি। তবে রিফাত হত্যা মামলা নিয়ে কোন কথা হয়নি।”

এদিকে রিফাত হত্যার আসামিদের ফাঁসির দাবিতে আজ রবিবার দুপুরে বরগুনা প্রেসক্লাবের সামনে ‘সর্বস্তরের জনগণের’ ব্যানারে মানববন্ধন হয়।

রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ, রিফাতের মা ডেইজি বেগম, রিফাতের বোন ইসরাত জাহান মৌ, রিফাতের চাচা আবদুল আজিজ শরীফ, আবদুস সালাম শরীফ, রিফাতের চাচী কামরুন নাহার ও চাচাত বোন অনন্যা সেখানে বক্তব্য দেন।

পরে রিফাতের পরিবারের সদস্যরা বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মিন্নিকেই এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য আসামিদেরও ফাঁসির দাবি জানান তারা।

এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১৫ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে এবং মামলার এক নম্বর আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে মিন্নিসহ ১৪ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এবং মামলার তিন নম্বর আসামি রিশান ফরাজীকে রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

x

Check Also

গরুর মাংসের চাপ আর পরোটা

এমএনএ ফিচার ডেস্ক  : রাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে যখন ক্ষুধা লেগেছে অনেকদিনই হয়তো ছুটে ...

Scroll Up