দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে একাধিক জরুরি পদক্ষেপ নিতে হলেও সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ভয়াবহ চিত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও নানা কারণেই এই রোগ আবারও ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ
হামের সংক্রমণ কমাতে সরকার দেশব্যাপী ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫ এপ্রিল থেকে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে তা বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় টিকা নেওয়ার বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস নির্ধারণ করা হয়েছে।
জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ইপিআই সার্ভিল্যান্সের এক জরিপে হামের প্রকোপ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। হাম সন্দেহে ২,৩১০ শিশুর ওপর চালানো বিশ্লেষণে দেখা যায়—
- ৫৪.৭% শিশু কোনো টিকাই নেয়নি
- ২২% শিশু এক ডোজ নেওয়ার পরও আক্রান্ত
- ২৩.২% শিশু পূর্ণ দুই ডোজ নেওয়ার পরও আক্রান্ত
আবার নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত ৭৫১ শিশুর মধ্যে—
- ৭১.৮% টিকা নেয়নি
- ১৭% এক ডোজ নেওয়ার পর আক্রান্ত
- ১১.২% পূর্ণ টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত
এই তথ্য স্পষ্ট করে যে, টিকা নেওয়া ও না নেওয়া—উভয় শ্রেণির শিশুই সংক্রমিত হচ্ছে।
চলতি বছরের সংক্রমণ চিত্র
চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
- জানুয়ারিতে ৫৫০ আক্রান্তের মধ্যে ১৩০ জন প্রথম ডোজ এবং ১৩৮ জন দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছিল
- ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১,১০০ আক্রান্তের মধ্যে ৯৫ জন প্রথম ডোজ এবং ৯৯ জন দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছিল
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের অনেকেই টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই সংক্রমিত হয়েছে।
বয়সের আগেই আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—টিকা নেওয়ার বয়স (৯ মাস) হওয়ার আগেই শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার দ্রুত বেড়েছে।
- ২০২৩ সালে ৯ মাসের নিচে আক্রান্ত ছিল ৬%
- ২০২৪ সালে ১৫%
- ২০২৫ সালে ১১%
- ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩%
এছাড়া ৯ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যেও আক্রান্তের হার বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু টিকার ঘাটতির কারণে নয়, বরং আরও জটিল কারণ জড়িত থাকতে পারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক বলেন, আগে ধারণা ছিল ৬ মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শিশুকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এখন সেই সুরক্ষা কার্যকর থাকছে না। এ কারণে কিশোরীদের বিয়ের আগে বুস্টার ডোজ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, টিকাদানের কভারেজ সংক্রান্ত তথ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। কোনো কোনো জেলায় ১৫০% কভারেজ দেখানো হচ্ছে, যা বাস্তবসম্মত নয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফুন্নেসা বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং এটি শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ভিটামিন এ-এর ঘাটতি ও হাসপাতালের যথাযথ আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকাও সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ।
আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে—
- গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে
- উপসর্গসহ সন্দেহভাজন মৃত্যু ১৫১
- মোট মৃত্যু ১৭৯
একই সময়ে—
- নিশ্চিত আক্রান্ত: ২,৬৩৯ জন
- সন্দেহভাজন আক্রান্ত: ১০,২২৫ জন
আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় ঢাকা বিভাগ শীর্ষে রয়েছে, এরপর রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু টিকাদান কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন—
- টিকাদানের সঠিক তথ্য যাচাই
- মায়েদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা
- হাসপাতালগুলোতে আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থা
- পুষ্টি ও ভিটামিন এ নিশ্চিত করা
হামের পুনরুত্থান এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

