Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / ঈদযাত্রায় সড়ক-রেল-নৌপথে ভোগান্তি: গাজীপুরে দীর্ঘ যানজট, নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়ে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ

ঈদযাত্রায় সড়ক-রেল-নৌপথে ভোগান্তি: গাজীপুরে দীর্ঘ যানজট, নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়ে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ

বিশেষ প্রতিবেদন

পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের ঢলে দেশের বিভিন্ন সড়ক, রেল ও নৌপথে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার (১৮ মার্চ) গাজীপুরের মহাসড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজটের পাশাপাশি বগুড়ার সান্তাহারের কাছে আন্তনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলার সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে পাটুরিয়া লঞ্চঘাটেও যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।

ঈদের ছুটি পেয়ে শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের কয়েকশ পোশাক কারখানার শ্রমিক বাড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়ায় ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও চন্দ্রা–নবীনগর সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। সকাল থেকে যানবাহন থেমে থেমে চললেও বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চন্দ্রা বাস টার্মিনাল, খাড়াজোড়া থেকে কোনাবাড়ী উড়ালসড়ক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং চন্দ্রা–নবীনগর সড়কে প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকায় যানবাহন দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে আছে অথবা ধীরগতিতে চলছে। কিছু স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন স্থির হয়ে থাকতে দেখা গেছে।

বৃষ্টি উপেক্ষা করেই হাজার হাজার যাত্রী চন্দ্রা বাস টার্মিনাল এলাকায় সড়কে নেমে পড়েছেন। উত্তরাঞ্চলের ২৬ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চন্দ্রা এলাকায় যাত্রী ও যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় টার্মিনালে যানবাহন প্রবেশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

দূরপাল্লার বাসের যাত্রী আল মাহাদী বলেন, “বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাড়তি ভাড়া দিয়ে গাড়িতে উঠেছি। এক ঘণ্টায় গাড়ি মাত্র এক কিলোমিটার এগিয়েছে। ৬ ঘণ্টার পথ ১২ ঘণ্টায় শেষ হবে কি না বুঝতে পারছি না।”

সোহান ট্রাভেলসের চালক মাহতাবুর রহমান বলেন, “বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে যানজট বেড়ে গেছে। পুলিশ ঠিকমতো কাজ করছে না। এভাবে চলতে থাকলে যানজট ৫০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে।”

চন্দ্রা টার্মিনালে অপেক্ষমাণ যাত্রী আতাউর রহমান বলেন, “বৃষ্টিতে ভিজে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি। যানজটের কারণে গাড়িই আসছে না। এই সুযোগে পরিবহন মালিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশাসনের কোনো তৎপরতাও চোখে পড়ছে না।”

সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, চন্দ্রা পুলিশ কন্ট্রোল রুমের পাশে পুলিশ সদস্যরা থাকলেও সড়কে যানজট নিরসনে তাদের দৃশ্যমান তৎপরতা ছিল না। কয়েকজন হাইওয়ে পুলিশ সদস্য জানান, ওই এলাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব অন্য ইউনিটের।

ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কে বড় ধরনের যানজট না থাকলেও টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় ২১ কিলোমিটার বিআরটি লেনে তীব্র যানজট দেখা গেছে। তবে বিআরটি লেন ছাড়া অন্য দুই লেনে যান চলাচল তুলনামূলক স্বাভাবিক রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, সড়কের সংকীর্ণতা, নির্ধারিত স্থানের বাইরে গাড়ি দাঁড় করানো এবং কারখানা শ্রমিকদের জন্য রিজার্ভ করা অসংখ্য পরিবহন মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে যানজট আরও তীব্র হয়েছে।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে প্রায় পাঁচ হাজার ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার প্রায় ২৫ শতাংশ কারখানা ছুটি দিয়েছে এবং বুধবার তৃতীয় ধাপে অধিকাংশ কারখানা বন্ধ হয়েছে। বৃহস্পতিবার আরও ৮৩৩টি কারখানা ছুটি দেবে বলে জানা গেছে। ফলে আগামী দুই দিন যাত্রীচাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চন্দ্রা এলাকার পোশাকশ্রমিক লিটন মিয়া বলেন, “গতকাল কারখানা ছুটি হয়েছে। আজ সকালে রওনা দিয়েছি। যানজট থাকলেও গাড়ির খুব একটা সংকট নেই। দরদাম করে কোনোভাবে বাড়ি চলে যাব।”

কোনাবাড়ী নাওজোর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সওগাতুল আলম বলেন, “গতকাল থেকেই যাত্রীচাপ বাড়তে শুরু করেছে। আজ দুপুরের পর তা আরও কয়েকগুণ বেড়েছে। শ্রমিকদের জন্য ভাড়া করা অনেক গাড়ি মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকায় যানজট বাড়ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কাজ করছে।”

এদিকে বুধবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে ঢাকা থেকে চিলাহাটিগামী আন্তনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি বগুড়ার সান্তাহার জংশন ছাড়ার কিছুক্ষণ পর আদমদীঘি উপজেলার বাগবাড়ি এলাকায় লাইনচ্যুত হয়। এতে ট্রেনটির ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে।

দুর্ঘটনায় অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আহতদের নওগাঁ জেলা হাসপাতাল ও আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

সান্তাহার রেলস্টেশন মাস্টার খাদিজা খাতুন বলেন, “রেললাইনে আগে থেকেই ত্রুটি ছিল। বেলা আড়াইটার দিকে সান্তাহার প্ল্যাটফর্মের অদূরে ট্রেনটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। উদ্ধারকারী ট্রেন কখন পৌঁছাবে তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।”

সান্তাহার রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক মাহফুজুর রহমান জানান, “ঢাকা থেকে আসা নীলসাগর এক্সপ্রেস দুপুর ২টার দিকে সান্তাহার স্টেশনে বিরতি দেয়। স্টেশন ছাড়ার কিছুক্ষণ পর ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। ট্রেনের ছাদে অনেক যাত্রী থাকায় পড়ে গিয়ে অনেকে আহত হয়েছেন।”

আদমদীঘি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, “ট্রেনটি আদমদীঘি ও সান্তাহারের মাঝামাঝি এলাকায় লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে কয়েকজন যাত্রী হতাহত হয়েছেন বলে খবর পেয়েছি। সঠিক সংখ্যা পরে জানানো হবে।”

দুর্ঘটনার পর নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাট জেলার সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ওই রুটের সব ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে। এতে হাজারো যাত্রী স্টেশন ও পথে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

এ ঘটনার পর ওই রুটে চলাচলকারী সকল ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। এতে ওই ট্রেনে থাকা হাজারো যাত্রীর পাশাপাশি ওই অভিমুখী হাজারো যাত্রীর যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে স্টেশনে গিয়েও যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের যাত্রীরাও চরম অনিশ্চয়তায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ওইসব যাত্রীদের বিকল্প ব্যবস্থা গন্তব্যে পৌঁছাতে রেল কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করেছেন।

অন্যদিকে ঈদযাত্রার দ্বিতীয় দিনেও ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। যদিও যানবাহনের চাপ কিছুটা বেড়েছে, তবু কোথাও বড় ধরনের যানজট দেখা যায়নি।

স্টারলাইন পরিবহনের চালক মুনতাছিম বিল্লাহ বলেন, “গত পাঁচ বছরের তুলনায় এবার মহাসড়কে ঈদযাত্রা অনেক স্বস্তিদায়ক। আগে ঢাকা থেকে ফেনী যেতে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা লাগত। এবার সময় কম লাগছে।”

যাত্রী নাঈমা সুলতান বলেন, “তিশা পরিবহনে ঢাকা থেকে কুমিল্লায় কোনো ভোগান্তি ছাড়াই এসেছি। মাত্র আড়াই ঘণ্টা লেগেছে।”

কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার শাহীনুর আলম বলেন, “ঈদযাত্রায় যাত্রীদের বিড়ম্বনা কমাতে আমরা সার্বক্ষণিক সতর্ক আছি। আশা করছি মানুষ নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারবেন।”

এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ পাটুরিয়া–দৌলতদিয়া নৌরুট ব্যবহার করে বাড়ি ফিরতে শুরু করায় পাটুরিয়া লঞ্চঘাটে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।

মাগুরাগামী যাত্রী বাবু খান বলেন, “দুপুরের পর কারখানা ছুটি হয়েছে। ভেবেছিলাম সহজে যেতে পারব। কিন্তু ঘাটে এসে দেখি যাত্রী অনেক, লঞ্চ খুব কম।”

পরিবারসহ বাড়ি ফিরছিলেন হাবিব। তিনি বলেন, “নবীনগর থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত আসতে সমস্যা হয়নি। কিন্তু ঘাটে এসে বিপদে পড়েছি। একটি লঞ্চ এলেই যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে উঠে যাচ্ছে।”

পাটুরিয়া লঞ্চঘাটের সুপারভাইজার মনির খান জানান, “ঈদ উপলক্ষে বর্তমানে এ রুটে ১৮টি লঞ্চ চলাচল করছে। বিকেলে হঠাৎ যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে।”

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান পাটুরিয়া ঘাট পরিদর্শনে এসে বলেন, “নৌপথ, সড়কপথ ও রেলপথ—তিন পথেই বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি ভালো। আগামীকালও যদি ভালোভাবে পার হয়, তাহলে এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে।”

তিনি আরও জানান, ঈদের পর ফিরতি যাত্রাতেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

x

Check Also

লাভজনক হয়েও ১০১ কোটি টাকা পরিশোধে বিএসসির গড়িমসি, বিপাকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) এখনো ১০১ কোটি টাকার ...