এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তথ্য বিকৃতির অভিযোগ তুলে অবশেষে মুখ খুললেন দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অং সান সুচি। সু চির দাবি, রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে প্রচুর বিকৃত-তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এই বিকৃত তথ্য সন্ত্রাসীদের স্বার্থ রক্ষা করছে। বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড়, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্দশা নিয়ে ‘ভুয়া সংবাদ’ ছড়ানোকেই দায়ী করেছেন।
আজ বুধবার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবারের ফোনালাপে সু চি ওই দাবি করেন।
দুই নেতার ফোনালাপের বিষয়ে আজ সু চির দপ্তর থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যের সবাইকেই তার সরকার সুরক্ষা দিচ্ছে। একইসঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতিকে নিয়ে প্রচুর ভুয়া ছবি ছড়ানো হচ্ছে। এতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সন্ত্রাসীদের স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দেশ্যে এসব বিকৃত-তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভয়াবহ মানবিক সঙ্কটের মধ্যেও এতটুকু বিচলিত নন সু চি। আগের মতোই উল্টো সুরে তিনি দায়ী করেছেন ‘বিদ্রোহীদেরকে’, সেনাবাহিনীকে নয়।
তার দাবি, বিভ্রান্তিকর তথ্য বিপুল পরিমাণে ছড়িয়ে ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
তুরস্কের উপপ্রধানমন্ত্রীর টুইটারে পোস্ট করা হত্যাযজ্ঞের ছবির প্রসঙ্গ টেনে সু চি দাবি করেন, ওই ছবি মিয়ানমারের নয়। পরে অবশ্য ছবিগুলো সরিয়ে নিয়েছেন তুরস্কের উপপ্রধানমন্ত্রী। আর বিকৃত-তথ্য ছড়ানোর জন্য সন্ত্রাসীদের দায়ী করেন সু চি।
প্রকাশিত সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সু চি এরদোয়ানকে বলেছেন, তার সরকার ইতোমধ্যেই যতটা সম্ভব রাখাইনের সব মানুষকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এরদোয়ানকে সু চি বলেছেন, মানবাধিকার-বঞ্চনা ও গণতান্ত্রিক সুরক্ষার অর্থ তারা খুব ভালো করেই জানেন। তাই তারা দেশের সব মানুষের অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করছেন। এটা শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানবিক অধিকারও বটে।
বিবৃতিতে সু চি আরও বলেন, রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে প্রচুর অপ-তথ্য এবং ছবি ছড়ানো হচ্ছে। এগুলো সন্ত্রাসীদের স্বার্থ রক্ষা করছে। ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য।
গত ২৪ অগাস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে একসঙ্গে ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এ পর্যন্ত ৪শ’ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। রাখাইনে বেশ কয়েকটি তল্লাশিচৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা-নির্যাতন শুরু হয়। নির্বিচারে হত্যা ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ায় প্রাণে বাঁচতে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে ঢুকছে।
এ পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে কত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও সংখ্যাটি ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার বলছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সূত্র। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জেনেভায় গতকাল মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে, গত মাস থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১ লাখ ২৩ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। সু চি পালিয়ে আসা এ রোহিঙ্গাদের নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।
রোহিঙ্গাদের ঢলের মধ্যেই বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে মিয়ানমারের অংশে বিস্ফোরণ ও গুলির ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের সাথে সীমান্তের একাংশ জুড়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভূমিমাইন বসানোরও খবর এসেছে। সেনাবাহিনীর সহিংসতা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে পালানো রোহিঙ্গারা যেন আর মিয়ানমারে ফিরতে না পারে সেজন্যই মাইন পাতা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী সু চির নীরব ভূমিকার নিন্দায় সরব হয়েছে বিশ্ব। কেউ কেউ তার নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতন এবং গণহত্যার ঘটনায় সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন সু চি।
পশ্চিমা দেশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে অং সান সু চি একবিংশ শতাব্দীর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সু চিকে তারা এমন একটি আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন, যেখানে খুব কম মানুষই স্থান পায়।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে তিনি সম্মানীয় এবং পূজনীয় একজন ব্যক্তিত্ব। অনেকেই ভেবেছিলেন, সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে তার দল ক্ষমতায় আসলে দেশের পরিস্থিতি আমূল বদলে যাবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র জাতি ও ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে।
কিন্তু সু চি ক্ষমতায় আসার পরে রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে আরো খারাপ পরিণতি ঘটেছে। আর এসব দেখেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন এই নোবেল বিজয়ী নেত্রী। তার এমন নীরব অবস্থানকে মেনে নিতে পারছে না বিশ্ব।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চির ইতিবাচক অবস্থান আশা করছিল বিশ্ব। কিন্তু তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে বার বার তার সরকার এবং সেনা বাহিনীর পক্ষেই সাফাই গাইলেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চির এমন নীরব অবস্থানকে তার রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবেই দেখছেন কূটনীতিকরা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক







