এমএনএ প্রতিবেদক
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব হামলা, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ৩৬ জন নিহত এবং ৪ হাজার ৭৮ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটির ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিক (জানুয়ারি–মার্চ) মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির এই চিত্র উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘর্ষ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন মাসে ৬১০টি সহিংসতার ঘটনায় ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন, জামায়াতের ৪ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন এবং অন্যান্য দলের ৩ জন রয়েছেন।
মোট সহিংসতার ৯৪ শতাংশই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অন্যান্য দলের সঙ্গে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে।
এ সময়ে— বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ২৪ জন নিহত, আহত ১,৫৮৫ জন; বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে নিহত ৭, আহত ১,৬৫৪ জন; ও বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ২১৯ জন। এছাড়া দুষ্কৃতকারীদের হামলায় আরও ২২ জন নিহত হয়েছেন।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ৩৯৫টি সহিংসতার ঘটনায় ১২ জন নিহত ও ২,৫৭৩ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ৬০০টির বেশি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
গ্রেফতার ও মামলা
রাজনৈতিক ও বিশেষ আইনে দায়ের হওয়া অন্তত ৭৬টি মামলায় ১,৮৫০ জনের নাম উল্লেখ এবং ২১ হাজারের বেশি অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ সময়ে রাজনৈতিক মামলায় অন্তত ৮৫৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি যৌথবাহিনীর অভিযানে ৬ হাজারের বেশি ব্যক্তি আটক হয়েছেন।
মতপ্রকাশ ও সাংবাদিক নির্যাতন
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে ১৭টি সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়া হয়, এতে আহত হন ২০৪ জন।
সাংবাদিকদের ওপর ৮২টি হামলায় ১৮৩ জন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন—এর মধ্যে আহত ১২২, লাঞ্ছিত ২০ এবং হুমকির মুখে পড়েন ২১ জন।
মব সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন
গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৮৮টি ঘটনায় ৪৯ জন নিহত ও ৮০ জন আহত হয়েছেন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ২৭টি হামলায় ৩১ জন আহত হয়েছেন; মন্দির, প্রতিমা ও বসতবাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
সীমান্ত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ১৩টি ঘটনায় ১ জন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। মিয়ানমার সীমান্তে ১১টি ঘটনায় ১ জন নিহত, ৫ জন আহত এবং ৩২ জন আটক হয়েছেন।
হেফাজত, কারাগার ও শ্রমখাত
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত ও অভিযানে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। কারাগারে ৩৯ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
শ্রমিক নির্যাতনের ১৩৯টি ঘটনায় ৩০ জন নিহত এবং ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন; কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন আরও ৭২ জন শ্রমিক।
নারী ও শিশু নির্যাতন
তিন মাসে ৬৭০ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার ১৪৭ জন (এর মধ্যে ৭৬ জন শিশু); গণধর্ষণের শিকার ৩৯ জন ও ধর্ষণের পর হত্যা ৯ জন। এছাড়া ৩২৮ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩৮ জন নিহত।
এইচআরএসএসের উদ্বেগ
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব হামলা, হেফাজতে মৃত্যু ও মতপ্রকাশে বাধা অব্যাহত থাকলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।
এইচআরএসএস সরকারের প্রতি জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

