এমএনএ প্রতিবেদক
দীর্ঘদিনের আলোচনা ও একাধিক দফা পেছানোর পর অবশেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিয়েছে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও পরিবেশ রক্ষায় এটিকে সরকারের অন্যতম বৃহৎ ও কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হলেও পদ্মা ব্যারাজ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও একাধিকবার পুনর্মূল্যায়নের পর শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি অনুমোদনের পর্যায়ে আসে।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। মোট প্রাক্কলিত ব্যয় (সম্পূর্ণ প্রকল্প) প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এতে বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩। বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এই প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়ন করবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পুরো প্রকল্প একসাথে বাস্তবায়ন করলে অর্থায়ন, তদারকি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হবে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ।
এর প্রধান অবকাঠামোতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট (প্রতিটি ১৮ মিটার প্রশস্ত); ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট; নেভিগেশন লক; দুইটি ফিশ পাস; ব্যারাজের ওপর রেলওয়ে সেতু ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।
এছাড়া গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী সিস্টেম পুনর্খনন ও পুনরুজ্জীবনের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় মোট প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরমধ্যে পদ্মা ব্যারাজ মূল প্ল্যান্ট থেকে ৭৬.৪ মেগাওয়াট ও গড়াই অফটেক প্ল্যান্ট থেকে ৬.৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। নদী ব্যবস্থার অন্যান্য অংশ থেকে অতিরিক্ত উৎপাদন সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া ব্যারাজ করিডোরকে ভবিষ্যতে সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের বহুমুখী অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির আওতায় দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকা প্রভাবিত হবে। ৪টি বিভাগ – খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা ও বরিশাল, ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা (প্রথম পর্যায়) উপকৃত হবে। বিশেষভাবে উপকৃত জেলা: কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা, নওগাঁসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা।
প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২,৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করে নদীগুলোতে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা।
এতে সম্ভাব্য সুফল হিসেবে লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস; মৃতপ্রায় নদীগুলোর পুনরুজ্জীবন; সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ; প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা ও কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
সরকারি প্রক্ষেপ অনুযায়ী, প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক রিটার্ন আসতে পারে।
১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী শুকিয়ে যায় এবং লবণাক্ততা বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের কার্যকারিতা আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও নির্ভর করবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, “পদ্মা ব্যারাজ দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখা গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
তিনি আরও বলেন, “তবে ব্যারাজের কারণে উজানে ক্ষয় এবং ভাটিতে পলি জমার মতো ঝুঁকি রয়েছে। তাই উন্নত প্রযুক্তি ও ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া প্রকল্পটি টেকসই হবে না।”
মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, “প্রকল্পটি একাধিকবার একনেকে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বিভিন্ন কারিগরি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের পর অবশেষে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।”
স্থানীয় উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে— দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জলাবদ্ধতা কমবে; নৌপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত হবে; ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, পরিবেশগত ভারসাম্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি প্রধান নদী সিস্টেম পুনরুদ্ধার করা হবে— হিসনা-মাথাভাঙ্গা; গড়াই-মধুমতি; চন্দনা-বারাশিয়া; বড়াল ও ইছামতি।
এগুলোকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত নদী নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাবে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে সরকার বলছে একটি “পরিবর্তনকারী অবকাঠামো প্রকল্প”, যা দেশের কৃষি, পরিবেশ, বিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একইসঙ্গে একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পও—যার সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক পানি কূটনীতির ওপর।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অনুমোদন পাওয়া পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এখন বাস্তবায়নের পথে। এটি যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীভিত্তিক অর্থনীতি ও পরিবেশ ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

