Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / কম দামের সিগারেটের ফাঁদে বাংলাদেশ: রাজস্বের চেয়ে দ্বিগুণ ক্ষতি, বাড়ছে তরুণ ধূমপায়ী

কম দামের সিগারেটের ফাঁদে বাংলাদেশ: রাজস্বের চেয়ে দ্বিগুণ ক্ষতি, বাড়ছে তরুণ ধূমপায়ী

বিশেষ প্রতিবেদক

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি ছোট দোকানে ১০ টাকার সিগারেট কিনছিলেন এক কলেজপড়ুয়া তরুণ। ঠিক পাশেই বাজার করতে আসা এক দিনমজুর কিনলেন বিড়ির প্যাকেট। দোকানি জাহিদুলের ভাষায়, “সবচেয়ে বেশি চলে কম দামি সিগারেট।”

এই বাস্তবতাই এখন বাংলাদেশের তামাক পরিস্থিতির বড় চিত্র তুলে ধরে। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সিগারেট এখনো এতটাই সহজলভ্য যে নিম্ন আয়ের মানুষ ও তরুণদের মধ্যেও ধূমপান বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ, তামাক কর কাঠামোর দুর্বলতা। কাগজে করহার বেশি দেখালেও বাস্তবে সিগারেটের দাম তুলনামূলক কম থাকছে, যার সুযোগ নিচ্ছে তামাক কোম্পানিগুলো।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে—৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ভারতে এ হার ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য টোবাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে বাংলাদেশে বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়, যা দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশ। এছাড়া ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের তথ্য বলছে, তামাকজনিত মৃত্যুর প্রায় ৭৯ শতাংশ ঘটে প্রত্যক্ষ ধূমপানের কারণে।

তামাক খাতকে সরকার বড় রাজস্ব উৎস হিসেবে তুলে ধরলেও অর্থনীতিবিদ ও গবেষকেরা বলছেন, বাস্তব চিত্র অনেক বেশি ভয়াবহ।

‘ইকোনমিক কস্টস অব টোব্যাকো ইন বাংলাদেশ: অ্যান আপডেটেড এস্টিমেট ইনক্লুডিং হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ড্যামেজেস’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি।

বাংলাদেশে তামাক কোম্পানিগুলোর অন্যতম যুক্তি হলো, সিগারেটের ওপর ইতিমধ্যেই অনেক বেশি কর আরোপ করা হয়েছে। তবে গবেষকেরা বলছেন, সমস্যা করের হারে নয়, বরং কর কাঠামোয়।

বর্তমানে দেশে সিগারেটের চারটি মূল্যস্তর রয়েছে—নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম। প্রতিটি স্তরে আলাদা দাম ও করহার নির্ধারিত। এই বহুস্তর কর কাঠামোর কারণে ভোক্তারা সহজেই এক স্তর থেকে আরেক স্তরে চলে যেতে পারেন। ফলে দাম বাড়লেও ধূমপান পুরোপুরি কমে না।

জনস্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের তামাক করব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং এটি অনেক ক্ষেত্রে তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার বদলে কোম্পানিগুলোকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বের ১৬২টি দেশের মধ্যে কম দামি সিগারেটের সহজলভ্যতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। অর্থাৎ বাংলাদেশে সিগারেট এখনো তুলনামূলকভাবে সস্তা।

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান–ও এই বাস্তবতা স্বীকার করেছেন। গত ২৭ এপ্রিল এক প্রাক্‌–বাজেট আলোচনায় তিনি বলেন, “এত কম দামে আমাদের আশপাশের কোনো দেশে সিগারেট পাওয়া যায় না।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট–এর পরিচালক অধ্যাপক শাফিউন এন শিমুল তাঁর এক উপস্থাপনায় দেখিয়েছেন, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে পরিবারপ্রতি আয় বেড়েছে ১০৩ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে বিশেষ করে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম সেই হারে বাড়েনি।

গবেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির তুলনায় সিগারেটের দাম কম বাড়ায় বাস্তবে এটি আরও “সস্তা” হয়ে গেছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে খোলা চিনির দাম বেড়েছে ৮৯ শতাংশ, আলু ৮৭ শতাংশ, আটা ৭৫ শতাংশ, ডিম ৪৩ শতাংশ এবং সয়াবিন তেল ৩৪ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৬ থেকে ১৫ শতাংশ।

এর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ ও তরুণদের জন্য সিগারেট কিনে খাওয়া আরও সহজ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

বাংলাদেশের সিগারেট বাজারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নিম্নস্তরের সিগারেটের বিস্তারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬–০৭ অর্থবছরে নিম্নস্তরের সিগারেটের বাজার অংশীদারত্ব ছিল ২৫ শতাংশ। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ শতাংশে।

গবেষকদের মতে, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের দামের ব্যবধান কম থাকায় কোম্পানিগুলো নতুন নতুন কম দামের ব্র্যান্ড বাজারে এনে এই খাত সম্প্রসারণ করেছে।

তামাক কোম্পানিগুলো প্রায়ই নিজেদের দেশের অন্যতম বড় করদাতা হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর মতে, এই দাবির বড় অংশই বিভ্রান্তিকর।

তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তামাক কোম্পানিগুলো মূলত ভোক্তার কাছ থেকে কর সংগ্রহ করে সরকারের কাছে জমা দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) ২০২৪ সালে ৩৪ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা কর দিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ ছিল প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশই ছিল ভোক্তাদের দেওয়া পরোক্ষ কর।

অর্থাৎ সিগারেট কিনছেন যে মানুষ, প্রকৃতপক্ষে করের বড় অংশ তিনিই দিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, তামাকে খরচ হওয়া অর্থ যদি শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা বা অন্য ভোগ্যপণ্যে ব্যয় হতো, তাহলে সেই খাতগুলো থেকেও সরকার রাজস্ব পেত এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ত।

তামাক কোম্পানিগুলোর আরেকটি বড় যুক্তি—কর বাড়ালে চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্য বাড়বে।

তবে বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে সিগারেটের অবৈধ বাণিজ্যের হার সবচেয়ে কম—মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। তুলনায় ভারতে এ হার ১৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩৮ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৩৬ শতাংশ।

গবেষকদের মতে, অবৈধ বাণিজ্য মূলত প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয়; কর বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই।

তামাকবিরোধী সংগঠন ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন।

তাঁদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে— নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একত্র করা; ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা নির্ধারণ; উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের দাম ২০০ টাকা করা; প্রতি প্যাকেটে নির্দিষ্ট ৪ টাকা কর আরোপ; ও সব স্তরে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা।

গবেষকদের দাবি, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে প্রায় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবেন। পাশাপাশি ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে বলেও তাঁদের ধারণা।

তামাক কর বাড়ালে রাজস্ব কমে যাবে—এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকলেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা।

ফিলিপাইনে ২০১২ সালে তামাক কর সংস্কারের পর কয়েক বছরের মধ্যে সিগারেট ব্যবহার কমেছে, একই সঙ্গে রাজস্বও কয়েক গুণ বেড়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা দেখা গেছে।

অধ্যাপক শাফিউন এন শিমুল বলেন, কার্যকর তামাক কর একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য রক্ষা, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, কর বাড়ানোর ফলে রাজস্ব আয় কমতে কমতে অন্তত ৮ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে দেশের বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি হয়ে যাবে। কিন্তু তরুণেরা ধূমপান থেকে নিরুৎসাহিত হলে দেশ বড় একটি মানবসম্পদ রক্ষা করতে পারবে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল–এর রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, “তরুণ জনগোষ্ঠীকে ধূমপায়ী করে তোলার নানা আয়োজন আছে। কিন্তু সরকার তো ব্যবসা করার জন্য নয়, মানুষের সেবা করার জন্য। রাজস্বের অজুহাতে মানুষের এমন স্বাস্থ্যগত ক্ষতি মেনে নেওয়া কাম্য নয়।”

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, তামাক কর নিয়ে কোম্পানি ও তামাকবিরোধীদের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যেও একটি ভারসাম্য প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, তামাক করের প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতির নয়; এর সঙ্গে নৈতিকতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ এখন এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে যে পণ্য বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু ডেকে আনে, সেটিই এখনো এত সহজলভ্য যে অনেক তরুণের কাছে তা মোবাইল ডেটার চেয়েও সস্তা মনে হয়। প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র কি তামাককে এখনো শুধু রাজস্বের উৎস হিসেবেই দেখবে, নাকি এটিকে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে বিবেচনা করবে?

x

Check Also

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিএনপি অঙ্গীকারবদ্ধ: কুমিল্লার পথসভায় তারেক

কুমিল্লা প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, ...