Don't Miss
Home / জন্মদিন / টেলিভিশন তারকা / কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির জন্মদিন আজ

কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির জন্মদিন আজ

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : আজ প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা ফরীদির শুভ জন্মদিন। ১৯৫২ সালের এমন একটি দিনেই পৃথিবীতে আগমন ঘটেছিলো এই প্রখ্যাত অভিনেতার। তিনি অভিনয়ের সকল ক্ষেত্রে অভাবনীয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলাদেশের নাটক সিনেমার উজ্জলতম নক্ষত্র তিনি। নন্দিত এই অভিনেতার ৬৯তম জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রতিবেদন।

তিনি শুধু অভিনেতাই নন, একটি শক্তিশালী চরিত্রের নাম। যার মধ্যে মেধা এবং বুদ্ধির সমন্বয় রয়েছে। অন্যদের থেকে আলাদা স্বতন্ত্র এক ধারার সৃষ্টি করেছেন যিনি। তিনি হলেন কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি।

মঞ্চ থেকে অভিনয় ক্যারিয়ার শুরু তার। এরপর ছোটপর্দা কিংবা বড়পর্দা সব জায়গায় ছড়িয়েছেন মুঠো মুঠো সোনা। নান্দনিক অভিনয় নৈপুণ্যে হয়ে উঠেছেন ভার্সেটাইল এক অভিনেতা। অভিনয়গুণে কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। এক কথায় অসাধারণ অভিনয়শিল্পী হৃমায়ুন ফরিদী।

Humayun-Faridi-3বরেণ্য অভিনেতার জন্মস্থান ঢাকার নারিন্দায়। তার বাবার নাম এটিএম নূরুল ইসলাম ও মা বেগম ফরিদা ইসলাম। চার ভাই-বোনের মধ্যে তার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ইউনাইটেড ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন তিনি। মাধ্যমিক স্তর উত্তীর্ণের পর চাঁদপুর সরকারী কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

হুমায়ুন ফরীদির অভিনয়ের শুরুটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-বেরুনী হলে থাকতেন এ অভিনেতা। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় নাট্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নাট্যচার্য সেলিম আল দীনের নজরে পড়েন তিনি।

সেখানে প্রথম নাটকের সুবাদে পরিচয় ঘটে ঢাকা থিয়েটারের নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর সঙ্গে। মূলত এখান থেকে হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় যাত্রা শুরু। সেলিম আল দীনের ‘চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টারি’ নাটকের প্রোডাকশনে কাজ করেন প্রথম।

এরপর যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারের নাট্যচর্চার সঙ্গে। একই দলের একই লেখক ও নির্দেশকের ‘সংবাদ কার্টুন’এ ছোট্ট একটি চরিত্রে সুযোগ পান। তারপর ঢাকা থিয়েটারের হয়ে মঞ্চে অভিনয় করেন ‘শকুন্তলা’। শকুন্তলার পর ‘ফণীমনসা’, কিত্তনখোলা, মুনতাসির ফ্যান্টাসি, কেরামত মঙ্গল, ধূর্ত উই প্রভৃতি নাটকে। কেরামত মঙ্গল নাটকে কেরামত চরিত্রে হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় এখনও আলোচিত হয় ঢাকার মঞ্চে। ১৯৯০ সালে ‘ভূত’ দিয়ে শেষ হয় হুমায়ুন ফরীদির ঢাকা থিয়েটার জীবন। আর এই ভূতের নির্দেশক ছিলেন তিনি নিজে।

মূলত বন্ধু-অভিনেতা আফজাল হোসেনের সাহস এবং উৎসাহে হুমায়ুন ফরীদির টেলিভিশন যাত্রা শুরু হয়। আফজাল হোসেন বন্ধুর কথা ভেবে পর পর অনেক নাটক লেখেন। যদিও টেলিভিশনে অভিষেকটা ঘটে আতিকুল হক চৌধুরীর মাধ্যমে।

Humayun-Faridi-2সেটাও অবশ্য আফজাল হোসেন ও রাইসুল ইসলাম আসাদের সুবাদে। সেলিম আল দীনের রচনা এবং নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর নির্দেশনায় ধারাবাহিক নাটক ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’ দিয়ে বেশ আলোচনায় আসেন ফরীদি। হুমায়ুন ফরীদি টিভি নাটকে প্রথম অভিনয় করেন আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘নিখোঁজ সংবাদ’।

টিভি নাটকে হুমায়ুন ফরীদি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে আসেন শহিদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে আবদুল্লাহ আল মামুন নির্মিত ‘সংশপ্তক’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে। নাটকটিতে কানকাটা রমজান চরিত্রে অভিনয় করে দারুণ প্রশংসা অর্জন করেন হুমায়ুন ফরীদি। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি ছোটপর্দায় সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। ২০১২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন।

হুমায়ুন ফরীদি অভিনীত উল্লেখযোগ্য টিভি নাটকের মধ্যে রয়েছে নিখোঁজ সংবাদ, হঠাৎ একদিন, পাথর সময়, সংশপ্তক, সমুদ্রে গাংচিল, কাছের মানুষ, মোহনা, নীলনকশাল সন্ধানে, দূরবীণ দিয়ে দেখুন, ভাঙ্গনের শব্দ শুনি, কোথাও কেউ নেই, সাত আসমানের সিঁড়ি, সেতু কাহিনী, ভবেরহাট, শৃঙ্খল, জহুরা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, প্রতিধ্বনি, গুপ্তধন, সেই চোখ, অক্টোপাস, বকুলপুর কত দূর, মানিক চোর, আমাদের নুরুল হুদা প্রভৃতি।

হুমায়ুন ফরিদী চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন ১৯৯০-এর দশকে। দীর্ঘ সময় সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে তুলে ধরেছেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাস, দহন, লড়াকু, দিনমজুর, বীর পুরুষ, বিশ্বপ্রেমিক, আজকের হিটলার, দুর্জয়, শাসন, আনন্দ অশ্রু, মায়ের অধিকার, আসামী বধূ, একাত্তরের যীশু, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, প্রবেশ নিষেধ, ভণ্ড, অধিকার চাই, মিথ্যার মৃত্যু, ব্যাচেলর, শ্যামল ছায়া ও মেহেরজান প্রভৃতি।

Humayun-Faridi-1১৯৯০ থেকে শুরু করেন চলচ্চিত্রে যাত্রা। শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘সন্ত্রাস’ ছবির মাধ্যমে খলনায়ক চরিত্র শুরু হয় তার। তবে চলচ্চিত্রে অভিনয় ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন ২০০৩ সাল থেকে। অবশ্য পুরোদমে ছাড়া হয়নি।

সৃজনশীল কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘মাতৃত্ব’ ছবির জন্য সেরা অভিনেতা শাখায় ২০০৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন হুমায়ুন ফরীদি। নাট্যাঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাকে সম্মাননা প্রদান করে।

নিয়মিত টিভি অভিনয়ের পাশাপাশি হুমায়ুন ফরীদি তেমন একটা লিখতেন না। তবে কিছু টেলিফিল্ম, ধারাবাহিক ও এক ঘণ্টার নাটক নির্মাণ করেছেন।

হুমায়ুন ফরীদি দুবার বিয়ে করেন। প্রথম বিয়ে করেন ১৯৮০-এর দশকে। ‘দবযানী’ নামের তার এক মেয়ে রয়েছে প্রথম সংসারে। প্রথম স্ত্রী মিনুর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর হুমায়ুন ফরীদি আরেক কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। বেশ ক’বছর সংসার করার পর ২০০৮ সালে সুবর্ণার সঙ্গেও বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে। ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে চলে যান তিনি।

২০১২ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি চলে গেলেও তার চিরত্রটি আমাদের মাঝে চির অমলিন হয়ে আছে। তার দাপুটে অভিনয় তাকে বাঁচিয়ে রাখবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। চারিদিকে যখন চলছিল বসন্ত উৎসব, তখন প্রচণ্ড অভিমান নিয়েই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলাদেশের শক্তিমান অভিনেতা ফরীদি।

Scroll Up