Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / তেজস্ক্রিয়া ছড়াচ্ছে সেই বিষাক্ত বর্জ্যবাহী স্ক্র্যাপ জাহাজ

তেজস্ক্রিয়া ছড়াচ্ছে সেই বিষাক্ত বর্জ্যবাহী স্ক্র্যাপ জাহাজ

এমএনএ রিপোর্ট : বিষাক্ত বর্জ্যবাহী স্ক্র্যাপ জাহাজ এমটি প্রডিউসার (নর্থ সি প্রডিউসার) ১৪ মাস ধরে চট্টগ্রাম উপকূলে পরিবেশ দূষণ করছে। ছড়াচ্ছে তেজস্ক্রিয়া। এ আশঙ্কায় জাহাজটিকে কোনো দেশ স্থান না দিলেও অভিযোগ রয়েছে ‘ভুয়া কাগজে’ গত বছরের আগস্টে তা বাংলাদেশে আনে জনতা স্টিল করপোরেশন নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। জাহাজটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি রেডিয়াম ও থোরিয়ামের মতো ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে তদন্তে। উচ্চতর তদন্তের সুপারিশ থাকলেও তা এক বছরে হয়নি।
এমটি প্রডিউসার নামের জাহাজটি এর আগে তেল ও গ্যাস পরিবহনে ব্যবহূত হতো। পরিত্যক্ত এ বিশালাকার জাহাজটিতে ১৬টি ট্যাঙ্কার রয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, দীর্ঘ দিন তেল ও গ্যাস পরিবহন করায় এতে বিষাক্ত বর্জ্য তলানি হিসেবে জমা পড়েছে। রয়েছে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়াও। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশের সংস্থাগুলোর তদন্তে এর সত্যতা মিলেছে।
মেগাপোর্ট ইনিশিয়েটিভ ১৬টি ট্যাঙ্কারের মাত্র দুটি পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে- মাত্রাতিরিক্ত, ৩৩০ মাইক্রো সিভার্ট (গামা রেডিয়েশন ডোজ) পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও তেজস্ক্রিয় পদার্থের মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম ২৩৫, রেডিয়াম-১১৬, থোরিয়াম-২২৮, কপার ৬৪, সোডিয়াম-২২, ইরিডিয়াম-১৯৪, কোবাল্ট-৬০ এবং রোবিডয়াম-৮২।
তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়, বিশাল জাহাজটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেতে উচ্চতর তদন্ত প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তিতে তদন্তের সুপারিশ করে মেগা পোর্ট। গত জানুয়ারিতে এ প্রতিবেদন জমার পর ১০ মাসেও সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।
তদন্ত কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন, এমটি প্রডিউসারে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য রয়েছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান তেজস্ক্রিয়ার প্রমাণ ‘সরাতে’ ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সাগরে ফেলে দিয়েছে। তার পরও ট্যাঙ্কার ও পাইপ পরীক্ষা করে ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে জানতে জনতা স্টিল করপোরেশনের মালিক আমান উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজটির প্রধান
ডেকের কেটে ফেলা তিনটি পাইপ থেকে সর্বোচ্চ দশমিক ৩৩০ মাইক্রো সিভার্ট (গামা রেডিয়েশন ডোজ) পাওয়া গেছে। যার স্বাভাবিক মাত্রা হচ্ছে দশমিক ১৬ থেকে দশমিক ২১ পর্যন্ত। আটটি নমুনার মধ্যে তিনটিতে অব্যাহতি মাত্রার চেয়ে বেশি থোরিয়াম পাওয়া যায়। আবার আটটি নমুনার মধ্যে ছয়টিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি রেডিয়াম পাওয়া যায়।
ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান ‘এনজিও শিপিং ব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম’ এ অভিযোগ তুলে গত বছরের ২৫ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের পরিবেশমন্ত্রীকে চিঠি দেয়। এতে বলা হয়, ইউরোপীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘন করে এমটি প্রডিউসার নামের পরিত্যক্ত জাহাজটি বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য অপসারণ না করে বাংলাদেশে জাহাজটিকে পাঠানোর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয় চিঠিতে। যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, পরিবেশগত হুমকি থাকায় জাহাজটিকে নাইজেরিয়া গ্রহণ করেনি।
জাহাজটির আমদানিকারক জনতা স্টিল সীতাকুণ্ড মাদাম বিবিরহাট জাহাজভাঙা কারখানায় নোঙরের পর পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) জাহাজটি কাটা বন্ধে হাইকোর্টে রিট করে। জাহাজে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপস্থিতি পরীক্ষা করতে আদালত গত ৮ জুন নির্দেশ দেন। ১০ সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ কাস্টমসের মেগাপোর্ট ইনিশিয়েটিভকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
বেলার প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, জাহাজটি জালিয়াতিপূর্ণ কাগজপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশে আনা হয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে এর তেজস্ক্রিয়াবাহী পাইপ কেটে বর্জ্য সাগরে ফেলা হচ্ছে।
এর আগে ২০১৬ সালের ৫ নভম্বের পরিবেশ অধিদপ্তর নির্দেশ দেয় জাহাজ ভাঙার কাজ বন্ধ রাখতে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাহাজ ভাঙার কাজ করার অভিযোগ রয়েছে জনতা স্টিল করপোরেশনের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগে গত ২৯ আগস্ট আবারও আদালতে যায় বেলা। গত ৯ অক্টোবর হাইকোর্ট নির্দেশ দেন, রিট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জাহাজ ভাঙার কাজ স্থগিত থাকবে।
বেলার অভিযোগ, জাহাজটিতে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, পরিবেশ দূষণ ও দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। অ্যাসবেসটস, পিসিবি, ওডিএস, টিবিটি, পিএফও, ক্যাডমিয়াম, লেড, মার্কারি, ক্রোমিয়াম, জিঙ্ক, রেডিও অ্যাকটিভ উপাদান, তেল ও তেল জাতীয় পদার্থ ও বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান থাকার নিশ্চিত আশঙ্কা রয়েছে।
জাহাজ ভাঙা শিল্পের দূষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এম মারুফ হোসাইন বলেন, ‘ কোনো জাহাজে তেজস্ক্রিয়া পাওয়ার পরও যদি সিলগালা করা না হয়, তাহলে তাতে অবশ্যই দূষণ ছড়াবে। এ ছাড়াও জাহাজ ভাঙায় অবশ্যই রেডিও অ্যাকটিভ পদার্থ থাকে। এর কারণে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি যারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগের আশঙ্কা রয়েছে।’
তবে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের গঠিত কমিটি জাহাজটিতে তেজস্ক্রিয়ার উৎস, পারমাণবিক বর্জ্য, পারমাণবিক পদার্থ অথবা বিশেষায়িত পারমাণবিক পদার্থ পরিবহনের কোনো নিদর্শন পায়নি। বেলার অভিযোগ- যোগসাজশ করে এ প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
‘এনজিও প্ল্যাটফর্ম অব বাংলাদেশের’ সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলী শাহিন বলেন, আনার আগে থেকে জাহাজটিতে থাকা তেজস্ক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তারপরও ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে এটা আনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে উপকূলে পড়ে থাকায় পরিবেশের ক্ষতিও হচ্ছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন তৈরি করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
x

Check Also

ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ দুর্নীতি সহায়ক, লুটেরাদের পুনর্বাসন আত্মঘাতী: টিআইবি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক সদ্য পাস হওয়া ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনার ...