এমএনএ রিপোর্ট : ইসলামে জঙ্গিবাদ নিষিদ্ধ। ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ কিংবা কাউকে হত্যা বা আত্মঘাতী হওয়া হারাম। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতারা এ ফতোয়া দিয়েছেন। এতে ১ লাখ ১ হাজার ৫২৪ জন মুফতি, আলেম, ওলামা, ইমাম স্বাক্ষর করে সমর্থন জানিয়েছেন।
শীর্ষস্থানীয় মাদ্রাসাগুলোর ফতোয়া বিভাগও একই অভিমত জানিয়েছে। পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ ফতোয়াটিকে সঠিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ফতোয়ায় স্বাক্ষরকারী প্রখ্যাত আলেমদের মধ্যে রয়েছেন- হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, শায়খুল হাদিস আল্লামা আশরাফ আলী, মুফতি আবদুল হালিম বোখারী, মুফতি মনসুরুল হক, আল্লামা সুলান জওক নদভী, আল্লামা আবদুর রহমান হাফেজ্জী, আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ প্রমুখ।
আজ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সংবাদ সম্মেলনে এ ফতোয়া জনসম্মুখে প্রকাশ করেন এক লাখ আলেম, মুফতি ও ইমামদের ফতোয়া ও দস্তখত সংগ্রহ কমিটির আহবায়ক ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ।

তিনি বলেন, কতিপয় দুষ্কৃতকারী নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থের উদ্দেশ্যে মহাগ্রন্থ কুরআন ও হাদীসের অপব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামের নামে বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাস ও আতংক ছড়াচ্ছে। মানুষের চোখে ইসলামকে একটা বর্বর নিষ্ঠুর ও সন্ত্রাসী ধর্মরূপে চিত্রিত করছে। এতে সরলমনা কেউ কেউ বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন।
এ অবস্থায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ইসলাম ও মুসলমানদের কঠিন অবস্থান তুলে ধরার জন্য এক লাখ দেশ বরেণ্য আলেম, মুফতি ও ইমামগণের দস্তখতসহ ফতোয়া সংগ্রহ করে তা প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানান ফরীদ উদ্দীন।
তিনি আরও জানান, মূল ফতোয়ায় সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদকে কোরআন ও হাদিসের আলোকে হারাম বলা হয়েছে। এছাড়া জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দারুল উলুম দেওবন্দ, মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, চরমোনাই জামিয়া রশিদিয়া ইসলামিয়া, শায়খ জাকারিয়া রিসার্চ সেন্টার ও জামিয়াতুল আসআদ মাদরাসার ফতোয়াও এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার উদ্যোগে এক লাখ আলেম-ওলামার স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়। দস্তখত সংগ্রহ কমিটির আহ্বায়ক শোলাকিয়ার ইমাম ফরীদ উদ্দীন মাসউদ জানান, ধর্মের নামে তরুণ শিক্ষার্থীদের দলে ভেড়াচ্ছে জঙ্গিরা। আমাদের উদ্দেশ্য এ তরুণদের সুপথে আনা।
তিনি বলেন, রাসূল (সা.) স্বয়ং সন্ত্রাসকে নিষিদ্ধ করেছেন। তার পরও যারা এমন কাজ করছে তাদের জানাতে চাই, ইসলাম কোনো ধরনের হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে না। ইসলামে সন্ত্রাস হারাম। বিপথগামীদের কারণে যারা মুসলমানদের সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদী মনে করেন তাদেরও জানাতে চাই, ইসলামে সন্ত্রাসের স্থান নেই।

ফতোয়াটির শুরুতেই সূরা মায়েদা (আয়াত ৩২), সূরা আরাফ (আয়াত ৭৭), সূরা কাসাস (আয়াত ৮৫) ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, নিরপরাধ কাউকে হত্যা মানে গোটা মানবজাতিকে হত্যার মতো গর্হিত অপরাধ। সন্ত্রাস ও দুর্যোগ সৃষ্টি ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ সন্ত্রাসীদের পছন্দ করেন না।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে একের পর এক গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটছে। লেখক, ব্লগার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনুসারীরা হত্যার শিকার হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, ইসলাম নামধারী কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন এসব হত্যায় জড়িত। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ (এবিটি) কয়েকটি সংগঠন গুপ্তহত্যায় জড়িত বলে জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের প্রধান কেন্দ্র হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার ফতোয়া বিভাগও অভিমত দিয়েছে, জঙ্গিবাদ হারাম। একই অভিমত দিয়েছে, বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার। চরমোনাইর পীরের মাদ্রাসাও বলেছে, ইসলামের নামে হত্যা হারাম।
ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, কোরআন-হাদিসের আলোকে মুফতি ও ধর্মবেত্তাদের দেওয়া মতামত (ফতোয়া) সবাইকে মানতেই হবে। ফতোয়ার ভূমিকায় বলা হয়েছে, ‘ধর্মের নামে যারা সন্ত্রাস করছে, তারা বেহেশত লাভের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তা করছে। কিন্তু তা বেহেশতের নয়, জাহান্নামের পথ।’ ফতোয়ায় কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, জিহাদ ও সন্ত্রাস এক নয়, বরং ইসলামে বলা হয়েছে, যুদ্ধাবস্থা হলে মীমাংসা করে দাও। ইসলাম যুদ্ধ সমর্থন করে, তবে তা অনেক শর্তযুক্ত। সূরা হজ (আয়াত ৪) উদৃব্দত করে ফতোয়ায় বলা হয়েছে, অন্য ধর্মের উপাসনালয়ে হামলা করা হারাম। আল্লাহতায়ালা নিজেই তা নিষিদ্ধ করেছেন।

আলেম-ওলামাদের কাছে ১০টি প্রশ্ন রেখেছিল জমিয়তুল উলামা। জঙ্গিবাদীরা পবিত্র কোরআনের সূরা তওবার ৫ নম্বর আয়াতকে ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। এ আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম অস্বীকারকারীকে হত্যা করা বৈধতা পেতে পারে কি-না? এ প্রশ্ন রাখা হয়েছিল এক লাখ মুফতির কাছে। তারা সহিহ মুসলিম ২ :২৩৬ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, শুধু মানুষ নয়, কোনো প্রাণীকে হত্যার বৈধতা ইসলাম দেয় না। সূরা বাকারার ২০৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সন্ত্রাস সৃষ্টি করা মুনাফেকের কাজ। মুসনাদে আহমাদের ৭০৭৬ নম্বর হাদিস উদৃব্দত করে বলা হয়েছে, মুসলিম হলো সেই ব্যক্তি যার কাছে সব মানুষ নিরাপদ।
ইসলাম কায়েমে বর্বর ও হিংস্র পথ ব্যবহার করা যাবে না বলে মতামত দিয়েছেন আলেমরা। পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে স্বয়ং হজরত মুহাম্মদকে (সা.) আল্লাহতায়ালা এ নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলাম প্রচার করতে বলা হয়েছে। কাউকে তা গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না। সূরা ইয়াসিনে বলা হয়েছে, ‘স্পষ্টভাবে প্রচার করাই আমাদের দায়িত্ব’ (আয়াত ১৭)। সূরা বাকারায় বলা হয়েছে, ‘দ্বীনের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই। (আয়াত ২৫৬)’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জঙ্গিবাদ বিরোধী ফতোয়ায় ১ লাখ ১ হাজার ৫২৪ জন মুফতি ও আলেম স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে ৮ হাজার ৯৯৪ জন নারী এবং ৯২ হাজার ৫৩০ পুরুষ।
সংবাদ সম্মেলনে এক লাখ আলেম, মুফতি ও ইমামগণের ফতোয়া ও দস্তখত সংগ্রহ কমিটির সদস্য সচিব আবদুর রহিম কাসেমী, যুগ্ম সদস্য সচিব সদরুদ্দীন মাকুনুন, সদস্য আল্লামা আলীম উদ্দীন দুর্লভপুরী, হোসাইন আহমদ প্রমুখ আলেম উপস্থিত ছিলেন।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

