Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / নারী ও পুরুষ ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন ইন্ডিজ

নারী ও পুরুষ ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন ইন্ডিজ

এমএনএ স্পোর্টস ডেস্ক : টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ! তাও আবার একই দিনে একই মাঠে টি-টুয়েন্টির নারী ও পুরুষ দু’ফর‍ম্যাটেই। কী অবিশ্বাস্য এক ফাইনালই না হলো রাতের ইডেনে! জগতের সকল ঐশ্বর্য, সকল মায়া যেন এদিন অলঙ্কৃত করল ইডেনকে! আর ড্যারেন ব্রাভো’র গাওয়া ‘উই আর দ্য চ্যাম্পিয়ন্স’ গানে উন্মাতাল ক্যারিবীয়দের উদযাপনে মহিমান্বিত হলো বহু ইতিহাসের সাক্ষী ইডেন গার্ডেন্স!

ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা নাচতে-গাইতে ভালোবাসে। গতকাল রবিবারের ইডেন গার্ডেন্স সেই বিনোদনপ্রিয় ক্যারিবিয়ানদের দেখল। যারা বিকেলে বিশ্বজয় করল। রাতে সেই বিশ্বজয়কে দ্বিগুণ করল!

during the ICC World Twenty20 India 2016 Final between England a

বৈকালিক ইডেনে অস্ট্রেলিয়াকে ৮ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নারী টি২০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হলো ক্যারিবিয়ানরা। রাতের ইডেনে অস্ট্রেলিয়ার জায়গাটা নিল ইংল্যান্ড। অবিশ্বাস্য শেষের পরশে ড্যারেন স্যামির ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতল ৪ উইকেটে।

জেতার জন্য শেষ ওভারে ১৯ রান দরকার ছিল ক্যারিবীয়দের। কত আশা করে ইংলিশ অধিনায়ক ইয়ান মরগান বেন স্টোকসের হাতে বল তুলে দিলেন। মরগান তো তখন একটা হাত দিয়েই দিয়েছেন ট্রফিতে। অথচ ক্ষণিকের ঝড়ে, শেষ রাতের অবিশ্বাস্য এক ঝড়ে সব তছনছ করে দিলেন কার্লোস ব্রাফেট। স্টোকসের প্রথম চার বলে টানা চারটি ছয় মেরে বিশ্বজয়ের বরমাল্য পরালেন ক্যারিবীয়দের!

জীবনে হয়তো আরও অনেক বড় বড় ইনিংস খেলবেন ব্রাফেট। তবে এই ১০ বলে ৩৪ রানের ইনিংসটির গল্প তিনি নাতি-নাতনিদেরও করবেন। যতদিন ক্রিকেট থাকবে, তার ওই চারটি ছক্কা রূপকথার মতো, কিংবদন্তির মতো গল্পগাথা হয়ে ঘুরে ফিরবে ইতিহাসের স্বর্ণপাতায়। এটা একটা বিশ্বকাপের ফাইনাল। সেই ফাইনালের শেষ ওভারে ম্যাচটা পেন্ডুলামের

মতো দুলছে। পাত্তাই দিলেন না ব্রাফেট। কিসের চাপ! ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের ঐতিহ্য মেনে, ভয়ডরহীন চারটি শট খেলে সব চাপ গঙ্গার উথালপাতাল স্রোতের সঙ্গে মিশিয়ে যেন পাঠিয়ে দিলেন টেমস নদীর তীরে!

Women's ICC World Twenty20 India 2016: Final - Australia v West Indies

ক্যারিবীয়রা যখন নিজেদের মতো করে ক্রিকেটটা খেলে, তখন জগতের কোনো কিছুকেই কৃত্রিম মনে হয় না। ক্যারিবীয় ক্রিকেটে কৃত্রিম বলে কিছু নেই। সবই তো প্রাকৃতিক। এই রাতেও একটা প্রাকৃতিক ঝড় হলো বৈকি!

সেই ঝড়ের সুবাদে এত দিনে স্টুয়ার্ট ব্রড একজন সঙ্গী পেলেন! ২০০৭ বিশ্বকাপ যুবরাজ সিংয়ের কাছে ছয় বলেই ছক্কা খেয়ে তখন প্রায় প্রতিদিনই দুঃস্বপ্ন দেখতেন ব্রড। এখনও মনে পড়লে নাকি ঘুমোতে কষ্ট হয়। বেন স্টোকসের কী হবে? একটা বিশ্বকাপ ফাইনালের ট্রফি-নির্ধারণী শেষ ওভারের প্রথম তিন বলে তিনটি ছয় খেয়েই তো কাঁদতে শুরু করে দিলেন উইকেটে। ম্যাচ ততক্ষণে ড্র হয়ে গেছে। চতুর্থটা খেয়ে লুটিয়েই পড়লেন তিনি! পরিস্থিতি ও মঞ্চ বিবেচনায় ব্রডের চেয়েও বড় ভূত এখন থেকে তাড়া করে ফিরবে স্টোকসকে। সেই ভূতের নাম কার্লোস ব্রাফেট!

একটা ম্যাচ রিপোর্টের এতদূর এসেও জয়ের নায়কের কথা বলা হলো না। মাঝে মাঝে এমন হয়। শেষের মঞ্চটা পার্শ্বচরিত্র দ্বারা এমনভাবে সম্মোহিত হয় যে, নায়কের কথা কারও মনে থাকে না। তিনি মারলন স্যামুয়েলস। প্রকৃতি যেন তাকে সেই মায়াবী শক্তি দিয়েছে যে, স্যামুয়েলসই বিশ্বকাপের ফাইনালে ত্রাতা হয়ে উঠবেন। খেলে দেবেন!

during the ICC World Twenty20 India 2016 Final between England a

২০১২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ক্যারিবীয়রা যখন ধুঁকছে তখন ৫৬ বলে ৭৮ রানের ইনিংস খেলে এনে দিয়েছিলেন লড়াকু পুঁজি। এদিন ক্যারিবীয়রা ইংলিশদের ১৫৫ রান তাড়া করতে গিয়ে ধুঁকল। ১১ রানে নেই ৩ উইকেট। চার্লস-গেইল-সিমন্স ফিরে গেছেন। আবারও তিনে নেমে, আবারও ক্যারিবীয় ক্রিকেটের বিশ্বজয়ী নায়ক তিনি! ৬৬ বলে ৯ চার ও ২ ছয়ে ৮৫ রানের কালজয়ী এক ইনিংস খেলে আবারও তার হাত ধরেই ওই পরশপাথর ছুঁয়ে দেখলেন অসামান্য ক্যারিবীয়রা।

ব্রাফেটকে স্টোকস ভুলবেন না কখনোই। স্টোকস কি ভুলতে পারবেন ব্রাভোকে? ২০ বলে ২৭ রান করার সময় উইকেটের পেছনে ক্যাচ তুলেছিলেন ব্রাভো। জশ বাটলার ক্যাচটা নিলেনও। স্যামুয়েলস চলেও যাচ্ছিলেন। আম্পায়াররা থামালেন। বাটলারের গ্লাভসে ভসে বলটা জমার আগেই বল টোকা দিয়ে গেছে ঘাস। বেঁচে গেলেন স্যামুয়েলস।

নায়কোচিত এক ইনিংস খেলার পথে তিনি আর কোনো সুযোগ দেননি ইংলিশদের। স্টোকস ভুলবেন না নিশ্চিত। স্যামুয়েলস সপ্তম ওভারের ওই প্রথম বলে আউট হয়ে গেলে হয়তো স্টোকসকে ওই দুঃস্বপ্নের শেষ ওভার দেখতেই হয় না!

during the ICC World Twenty20 India 2016 Final between England a

স্টোকস নিশ্চয়ই সবচেয়ে বেশি দুঃখ প্রকাশ করবেন জো রুটের কাছে। টুর্নামেন্টে এর আগে মাত্র ১ ওভার বল করে দিয়েছেন ১৩ রান। সেই রুট অধিনায়কের ফাটকা চালে ফাটিয়ে দিলেন পুরোপুরি। ব্যাট হাতে দল ২৩ রানে ৩ উইকেট হারানোর পরও হাল ধরে ৩৬ বলে মহামূল্যবান ৫৪ রান করে গেছেন। তার হাতে বল তুলে দিয়ে ইংলিশ অধিনায়ক সবাইকে চমকে দিলেন। সেই চমক আরও বিস্ময়জাগানিয়া হয়ে গেল একটু পরে। ইনিংসের দ্বিতীয় ও নিজের একমাত্র ওভারে মাত্র ৯ রান খরচায় দুটি উইকেট, তাও আবার গেইল আর চার্লসের উইকেট, এটাকে তো তখন শামুকের খোঁজে মুক্তো-অর্জন মনে হচ্ছিল!

আরেকজন ডেভিড উইলি। মরগান যখনই তাকে এনেছেন, তখনই হাসি ফুটিয়েছেন এই বাঁহাতি মিডিয়াম পেসার। ইডেনের ক্রমাগত মন্থর হয়ে আসা উইকেটে দুর্দান্ত বোলিং করলেন। প্রথম ওভারে দিলেন মাত্র ১ রান। সেমিফাইনালে স্বাগতিক ভারতকে হারানোর নায়ক লেন্ডল সিমন্সকে দ্বিতীয় ওভারের তৃতীয় বলেই ফিরিয়ে দিলেন। ১৬তম ওভারে নিজের তৃতীয়টা করতে এসে পুরো স্টেডিয়ামকেই রীতিমতো নিথর বানিয়ে দিলেন। প্রথম বলে আন্দ্রে রাসেল ও তৃতীয় বলে ড্যারেন স্যামিকে ক্যাচ বানিয়ে তিনি তখন ‘চ্যাম্পিয়ন ড্যান্স’ দিচ্ছেন!

T 20 Final winner-1

১৫.৩ ওভারে ৬ উইকেটে ১০৭ রান নিয়ে ক্যারিবীয়রা তখন কাঁপছে রীতিমতো। এর পরই তিনি দৃপ্ত পায়ে মাঠে নামবেন। প্রতিপক্ষের ‘চ্যাম্পিয়ন্স ড্যান্সে’র উল্লাস নাশ করে দেবেন। নিজেদের সম্পদ নিজেদের করে নেবেন। তিনি কার্লোস ব্রাফেট!

ব্রাফেটের ঝড় যখন খেলার জয়-পরাজয়ের নিষ্পত্তি করে ফেলেছে, তখন নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তে থাকা স্যামুয়েলস দেখালেন তার ঝড়। ক্ষোভে-রাগে-ক্রোধে নাকি আনন্দে-হর্ষে তিনি জার্সি খুলে ফেললেন। তাকে কোনো সতীর্থই জড়িয়ে ধরতে পারছেন না। কী প্রবল শক্তি দিয়ে স্যামুয়েলস সবাইকে ছিটকে দিচ্ছেন। স্যামুয়েলস কি ক্যারিবীয় ক্রিকেটারদের প্রতি সবার অবজ্ঞার, খোদ ক্যারিবীয় বোর্ডের অবজ্ঞার জবাব দিয়ে দিলেন? হয়তো!

এই বিশ্বকাপে ক্যারিবিয়ানদের ট্রেডমার্ক উদযাপন হয়ে গেছে ডোয়াইন ব্রাভোর ‘চ্যাম্পিয়ন্স’ গানের সুরে নাচটি। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নারীরাও সে নাচেই উন্মাতাল হলো বৈকালিক বাতাসে। সেই উদযাপনে দলবল নিয়ে যোগ দিলেন ড্যারেন স্যামিও। নাচলেন আর গাইলেন- ‘উই আর দ্য চ্যাম্পিয়ন্স’! তখনও স্যামিরা চ্যাম্পিয়ন হননি। তবে মনে হলো, বিজয়ী নারীদের সঙ্গে নেচে ড্রেস রিহার্সেলটা সেরে নিলেন ক্যারিবীয় পুরুষরা!

Women's ICC World Twenty20 India 2016: Australia v West Indies

কিছু কি ভুল বলা হলো? যেখানে আনন্দটা শেষ করেছিলেন, ম্যাচ শুরু হতে সেখান থেকেই তো উদযাপন শুরু করলেন ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটাররা। টানা দশম ম্যাচে টস জিতলেন অধিনায়ক স্যামি। বলা বাহুল্য, বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছয় ম্যাচেই প্রতিপক্ষ কী করবে, সে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন স্যামি। ফাইনালটাকে কালজয়ী বানিয়ে স্যামি এখন অবিসংবাদিত বিশ্বজয়ী! প্রথম অধিনায়ক হিসেবে জিতে নিলেন দুটি টি২০ বিশ্বকাপ!

শেষ পর্যন্ত সাহসী ইংল্যান্ডের পরাজয় হলো ততোধিক দুঃসাহসিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাতে। এ সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ক্লাইভ লয়েডের হাত ধরে যারা প্রথম দল হিসেবে জিতেছিল দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ক্যারিবীয় লোকগাথায় এখন আর শুধু লয়েডের দল নয়, স্যামির দলও থাকবে।

ক্রিকেট ইতিহাসে বিস্ময়কর সমাপনী অনেক আছে। তবে এমন সমাপনী কোটি টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না। দুঃসাহসিক ক্যারিবীয়দের কুর্নিশ!

x

Check Also

ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ দুর্নীতি সহায়ক, লুটেরাদের পুনর্বাসন আত্মঘাতী: টিআইবি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক সদ্য পাস হওয়া ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনার ...