সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
সাতক্ষীরা জেলার পূর্বঘোষিত ‘আম ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী শুক্রবার (১৫ মে) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে উঠেছে বিশ্বখ্যাত হিমসাগর আম। তবে মৌসুমের প্রথম দিনেই অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মণপ্রতি দাম কমেছে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
জেলার সবচেয়ে বড় আমের মোকাম সুলতানপুর বড় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই শত শত ভ্যানভর্তি আম বাজারে আসতে শুরু করে। জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী একযোগে বাগান থেকে হিমসাগর আম সংগ্রহ করে বাজারে আনায় সরবরাহ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে সকালে প্রতি মণ হিমসাগর ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও দুপুরের পর তা নেমে আসে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। কোথাও কোথাও ১ হাজার ৬০০ টাকাতেও আম বিক্রি হয়েছে।
প্রথম দিনেই দামের এমন পতনে হতাশ প্রান্তিক আমচাষিরা। সদর উপজেলার কুখরালী এলাকার চাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, “সকাল পর্যন্ত বাজার ভালো ছিল। কিন্তু দুপুরের পর সবাই একসঙ্গে আম নিয়ে আসায় দাম ভেঙে পড়ে। ধাপে ধাপে আম বাজারে এলে এমন পরিস্থিতি হতো না।”
আরেক চাষি সোনা মিয়া জানান, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের বাড়তি খরচের পর শুরুতেই দামের পতন কৃষকদের জন্য বড় ধাক্কা।
চাষিদের অভিযোগ, আগাম বাজার ধরার প্রতিযোগিতা, ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা এবং অনলাইন ব্যবসায়ীদের বাড়তি প্রভাবের কারণে স্থানীয় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
সদরের চাঁদপুর এলাকার চাষি আলতাফ হোসেন বলেন, “এবার গাছে আম প্রচুর হলেও আকারে ছোট। কয়েকদিন ধরে আকাশে মেঘ-বৃষ্টির কারণে ঝড়ের ভয় রয়েছে। তাই অনেকেই কম দামে হলেও দ্রুত আম বিক্রি করছেন।”
বাগান মালিক কামরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, বাজারে আড়তগুলোতে নানা অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা কেটে রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি বাজার সিন্ডিকেটের কারণেও দাম কমে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষায়, “আম তো আর বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়ে লোকসানেই বিক্রি করতে হয়েছে।”
সুলতানপুর বড় বাজারের আড়তদার ঈদ্রিস আলী বলেন, বড় বড় পাইকাররা এবার অনেক হিসাব করে আম কিনছেন। কারণ হিসেবে তিনি জানান, ফেসবুক ও অনলাইনভিত্তিক ছোট ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগান থেকে আম কিনে কুরিয়ারে পাঠাচ্ছেন। এতে পাইকারি বাজারে আগের মতো চাপ নেই।
তবে আরেক আড়তদার কবির হোসেনের মতে, দামের পতনের মূল কারণ অতিরিক্ত সরবরাহ। তিনি বলেন, “প্রথম দিনেই বিপুল পরিমাণ আম বাজারে এসেছে। কয়েকদিনের মধ্যে বাজার আবার স্বাভাবিক হবে।”
টাঙ্গাইল থেকে আসা অনলাইন ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, সাতক্ষীরার হিমসাগর স্বাদ ও ঘ্রাণে অনন্য। তবে ভালো সাইজের আমের জন্য আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে।
বাজারের শ্রমিক সাকিল হোসেন জানান, শ্রমিক মজুরি, ট্রাক ও ভ্যান ভাড়া, ক্যারেট এবং কুরিয়ার খরচ—সবকিছুর দামই এবার বেড়েছে। ফলে আমের দাম কমলেও খরচ কমেনি।
কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মিরাজ হোসেন বলেন, “প্রথম দিনের চড়া বাজার ধরতে গিয়ে সবাই একসঙ্গে আম নামিয়েছে। এতে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।”
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, প্রথম দিনের অতিরিক্ত সরবরাহের কারণেই দামে ওঠানামা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সাতক্ষীরার বিষমুক্ত আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
তিনি জানান, মৌসুমের প্রথম দিনেই ২ মেট্রিক টন আম দুবাইয়ে রপ্তানি করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে মোট ১০০ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে সাতক্ষীরার আমের ভালো চাহিদা রয়েছে। রপ্তানি কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হলে বাজার স্থিতিশীল হবে বলে আশা করছি।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৪৫ হাজার ৭৫০ জন কৃষক আম চাষ করেছেন। এ বছর ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যার বড় অংশই হিমসাগর। পাশাপাশি প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার আম বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
