এমএনএ সাইটেক ডেস্ক : তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে চাকুরী বাজার দিনকে দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। একটা সময় নিজের যোগ্যতা, মামা চাচার জোরে এবং টাকা দিয়ে চাকুরী পেলেও সময়ের স্রোতে বর্তমানে যেন লটারীর টিকেট জেতার মতো অবস্থাতে পৌঁছে গেছে চাকুরী। ঠিক এমন মূহুর্তে যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো হাজির হয়েছে ফ্রিল্যান্সিং। অথচ বর্তমানে সম্ভাবনাময় ফ্রিল্যান্স খাতকে ধ্বংস করার জন্য উঠে পরে লেগেছে অর্থলোভী কিছু মানুষ। লোভ-লালসা আর প্রতারণার বেড়াজালে দেশে ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে গড়ে উঠছে ধোকাবাজির ব্যবসা।
ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং শব্দের মূল অর্থ হল মুক্ত পেশা। অর্থাৎ মুক্তভাবে কাজ করে আয় করার যে পেশা তাকেই আসলে ফ্রিল্যান্সিং বলা হয় । আর একটু সহজ ভাবে বললে, ইন্টারনেটের ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের কাজ করিয়ে নেয়। নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কাউকে দিয়ে এসব কাজ করানোকে ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং বলে। যারা আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে দেন, তাঁদেরকে বলা হয় ফ্রিল্যান্সার।
বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিশাল বাজার বা অনলাইন মার্কেট প্লেস এর শীর্ষ ভাগ আমাদের পাশের দেশ ভারতের হাতে। ফ্রিল্যান্সিং সার্ভিসে ভারতের পাশাপাশি ফিলিপিনস, পাকিস্তান, নেপাল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইউক্রেন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চীন, রাশিয়া, পানামা, মিসর এবং আরও অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অনলাইন মার্কেট প্লেসে বাংলাদেশ অনেক দেরিতে প্রবেশ করলেও স্বপ্ন দেখার মতো বিষয় হচ্ছে, ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিংয়ে আমরা ধীরে ধীরে হলেও এগিয়ে যাচ্ছি। সম্ভাবনাময় দেশের কাতারে চলে এসেছে বাংলাদেশ।
ঘরে বসে বৈদেশিক মুদ্রা আনার মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ তৈরি হয়েছে দেশে। ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে অনেকে সফলতা অর্জন করেছেন। অর্জিত সফলতা শেয়ার করছেন অন্যের সাথে। এতে অনেকেই উপকৃত হচ্ছে। তবে দেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠী সঠিক গাইড লাইনের অভাবে সম্পৃক্ত হতে পারছে না এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সাথে।
এই শতাব্দীর শুরুতে যেমন বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাইকারী হারে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়িয়ে একটা প্রজন্মকে বেকার করেছে। বেকার বলতে সেসময় যারা এই বিষয়ে পড়াশোনা করে বেরিয়েছিল ঠিক তখন বাংলাদেশে সেভাবে কাজের ক্ষেত্র তৈরী ছিল না। অনেকেই বিষয়টাকে টাইপিস্টের কাজ মনে করতো। সেসব শিক্ষার্থীদের বেশীরভাগই হয় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে অথবা পেশা পরিবর্তন করেছে।
প্রত্যেকের জীবনে অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই অর্থ বানানোর মোক্ষম উপায় হলো শর্টকার্ট ওয়ে। এই শর্টকার্ট ওয়ের সবচেয়ে বড় দিকটা হলো ঠকানো বা প্রতারণা করা। বাংলাদেশে যখনই নতুন একটা বিষয় এসেছে তখনই সেটাকে টাকা বানানোর উপায় মনে করে একদল অর্থলোভী মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এরাই আক্ষরিক অর্থে শেষ করে দিচ্ছে একটা প্রজন্মকে।
বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে রীতিমতো ব্যবসা শুরু হয়েছে। পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন কিংবা দেয়াল লিখন এবং এ ফোর সাইজের কাগজে লিখে দেওয়া হচ্ছে “ইন্টারনেটে ঘরে বসে আয় করতে চান তাহলে এই নম্বরে যোগাযোগ করুন”।
এই বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে হুজুগে বাঙ্গালী খ্যাত আমরা যাচ্ছি বা যোগাযোগ করছি সেসব প্রতিষ্ঠানের সাথে। সেসব প্রতিষ্ঠানও সুযোগ বুঝে শুনাচ্ছে ঘরে বসে বড়লোক হওয়ার গল্প। গল্পের পর বলছে কয়েকটি কথা। যেমন- প্রশিক্ষণ নিতে হবে, টাকার বিনিময়ে রেজিষ্ট্রেশন করতে হবে তাহলে বিড ছাড়াই ইন্টারনেটে কাজ পাওয়া যাবে।
সেসব প্রতিষ্ঠানে কেউ কেউ আবার বলছেও আমি দুইমাসে বিড ছাড়াই এতো ডলার ইনকাম করেছি। এতে অনেকেই প্রলুব্ধ হচ্ছে আবার কেউ কেউ ফিরে যাচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে খরচ হয় ৪,০০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা এবং রেজিষ্ট্রেশন করতে ৭,৫০০ টাকা বা তার বেশী খরচ করতে হয়। বিনিময়ে মাসিক রিটার্ণ আসে ১,০০০ টাকা থেকে ২,২০০ টাকা এবং সঙ্গে থাকে সদস্য করার চাপ।
অনেকটা এমএলএম ব্যবসার মতো। অনেকেই চেষ্টা চালিয়ে যায় কেউবা মাঝপথে ছেড়ে দেয়। কারণ একটা সময় এসে তাঁদের উপলব্ধী হয় যে কাজটি তারা করছে তা বেশী দিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ সেসব অর্থলোভী প্রতিষ্ঠান সবটুকু প্রশিক্ষণার্থীদের শিখিয়ে দেয় না। সবটুকু শিখিয়ে দিলে পরে যদি ঐ প্রশিক্ষাণার্থী নিজেই অন্যকে শিখিয়ে আয় করা শুরু করে এই ভয়ে। একটা সময় প্রশিক্ষণ নেওয়া বা রেজিষ্ট্রেশন করা ব্যক্তি যখন বুঝতে পারে আসলে তিনি উলু বনে মুক্তা ছড়াতে গেছেন তখনই সরে আসেন এবং হয়ে পড়েন হতাশ। মুখ ফিরিয়ে নেন এই দিক থেকে। অন্যকেউ নিরুৎসাহিত করেন।
ইন্টারনেটে কাজের সুযোগ
এইসব অর্থলোভী ব্যক্তির জন্য দেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে তা কখনোই কেউ চিন্তা করছে না। যেমনটা এক সময় কম্পিউটার সায়েন্সে পড়া কিংবা আজ থেকে ৯ /১০ বছর আগে ডাটা এন্ট্রি কাজ করার মতো অবস্থা ছিল। বর্তমানের এই ক্ষতির প্রভাব অনেকটা নিম্নরুপ-
- বেকার জনগোষ্ঠী প্রতারণার শিকার হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
- পরিচিত অন্যকে প্রভাবিত করবে এই ফ্রিল্যান্সিং দুনিয়ায় না আসার জন্য।
- দেশ হারাবে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।
- চাকুরী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়বে দিনকে দিন।
- চাপ পড়বে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির উপর।
তবে যেহেতু বিষয়টা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তাই এই ব্যাপারে সরকার এবং বেসরকারী পর্যায়ের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিৎ। যাতে করে সহজ, সরল এবং পরিশ্রমী একটা প্রজন্মকে এইসব অর্থলোভী ব্যক্তির হীন মানসিকতার হাত থেকে বাঁচানো যায়।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

