এমএনএ অর্থনীতি ডেস্ক : অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে গত মাসের মাঝামাঝি থেকেই বাড়তে শুরু করেছে সব ধরনের সবজি ও কাঁচা খাদ্যপণ্যের দাম। পাইকারি ও খুচরা—দুই বাজারের ব্যবসায়ীরাই বন্যার অজুহাত দেখিয়ে, উত্পাদন কম হওয়া এবং বন্যায় রাস্তাঘাট ভেঙেচুরে ডুবে যাওয়ায় ট্রাকের সময় ও ভাড়া বৃদ্ধির কথা বলে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার যুক্তি দেখাচ্ছে। কিন্তু আড়তদারদের কাছ থেকে জানা গেছে, বাজারে সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমেনি। আবার ট্রাক ভাড়া যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক
বৃদ্ধির হিসাব মেলে না। তা ছাড়া পাইকারি বাজারে খাদ্যপণ্যের যে মূল্য দেখা গেছে, খুচরা বাজারে গিয়ে তা বেড়ে যাচ্ছে অস্বাভাবিক মাত্রায়। এসব অনুসন্ধানে এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বৃষ্টি-বন্যার অজুহাতে খাদ্যপণ্যের বাজারে আগুন লেগেছে মূলত অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার প্রবণতায়।
দেশে বাড়তে থাকা বন্যার পানির অজুহাতে সবজি ক্ষেতের ক্ষতি হওয়ায় এবং পণ্য পরিবহনে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে সকল পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী কয়েক দিনে এই দাম আরও বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে চাল আমদানিতে সরকারের শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তের পর চালের দাম কমার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সম্প্রতি সরকারের চাল আমাদানির উদ্যোগ গ্রহণের পর থেকে কমতে শুরু করেছিল চালের দাম। কিন্তু বন্যার পানি বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ কারণে গত কয়েকদিনে চালের দাম দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম কমলেও তার প্রভাব পড়েনি রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে। তবে খুচরা ও পাইকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পারিক দোষারোপের বিষয়টি লক্ষ্য গেছে।
চালে বাড়তি খরচের কারণে যখন সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়েছে, তখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সব ধরনের কাঁচা পণ্যের বাড়তি দাম। অর্থাৎ দেশের মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান উপকরণ ভাত-তরকারি খেতেই আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বাজারের তথ্য মতে, পেঁয়াজ ও মরিচের মতোই দ্বিগুণ হয়েছে সব ধরনের সবজির দাম। আবার ঢাকার পাইকারি বাজারে যে দাম, খুচরা বাজারে তার চেয়ে ৩০-৩৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের সবজিই। খুচরা বাজারে ৭০ থেকে ৮০ টাকার কমে পাওয়া যাচ্ছে না কোনো সবজি। বেগুন পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা কেজি দরে। আর খুচরা বাজারে বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়, যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৪০ টাকায়, যার পাইকারি মূল্য ১০০ টাকা। আবার প্রতি কেজি বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকায়, যা বৃষ্টি-বন্যা শুরুর আগে ছিল ৪০-৪৫ টাকা। অথচ এর পাইকারি মূল্য ৫০-৫৫ টাকা। একইভাবে কেজিতে ৩৫-৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে কচুর লতি ও চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকায়, করল্লা ১০০-১২০ টাকা ঝিঙা ১১০-১২০ টাকা, পটোল ৭০-৮০ টাকায় এবং পেঁপে ৬০ টাকায় এবং কচুর মুখী ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে কম দামের সবজি বলতে বাজারে রয়েছে শুধু আলু, ২৫-২৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর এক মাস আগে ফার্মের মুরগির যে ডিম বিক্রি হতো ডজনপ্রতি ৮০ টাকায় তা এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারে প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়। কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায়। অথচ কাঁচা মরিচের পাইকারি দাম ৮০-১০০ টাকা কেজি। বন্যা শুরুর আগে কাঁচা মরিচ খুচরা বিক্রি হয়েছে ৯০-১০০ টাকা কেজি দরে। এই বাজারে প্রায় সকল প্রকার সবজির দাম ৭০ টাকার উপরে।
মজিবুর রহমান নামের এক ক্রেতা এই প্রতিবেদককে বলেন, এক সপ্তাহ পর বাজারে এসে অনেকটাই অবাক হওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষাকালে সাধারণত কাঁচা মরিচের দাম বাড়তে দেখা গেলও এক সপ্তাহ ব্যবধানে সকল সবজির দামই দ্বিগুন হয়েছে।
ঢাকার শুক্রাবাদে বাজার করতে আসা আরিফুল ইসলাম বলেন, বন্যা হচ্ছে, ঠিক আছে। একটু দাম বাড়তে পারে। তাই বলে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়াটা মানা যায় না। ১০০ টাকা দিয়ে দুই কেজি সবজিও কিনতে পারছি না। এখন তো মনে হচ্ছে, খাওয়াই কমিয়ে দিতে হবে।
হাতিরপুল বাজারের সবজি বিক্রেতা মাসুদ মিয়া বলেন, আমরা বেশি দামে সবজি কিনি, তাই বিক্রিও করতে হয় বেশি দামে। আর সারা দেশে বন্যা হচ্ছে, ক্ষেতখামার তলিয়ে গেছে। তাই সবজির উত্পাদন কম। আমরা পাচ্ছিও কম। এ কারণে দামও বেড়ে গেছে।
এছাড়াও শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার ও বাড্ডার কয়েকজন সবজি বিক্রেতাও দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে একই ধরনের যুক্তি তুলে ধরেন।
এই বাজারের খুচরা বিক্রয়কারী গোলাম রশীদ জানান, হুট করেই বন্যা শুরু হওয়ায় সবজির দাম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সকল প্রকার সবজি পাইকারি বাজার থেকে ৫০ টাকার উপরে কিনতে হচ্ছে আমাদের। পাইকারি বাজারে দাম কমলে এখানেও কমবে।
এখানে বাজার করতে আসা আলতাফ হোসেন নামের এক সরকারি কর্মচারী বলেন, বন্যার দোহাই দিয়ে ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির কারণে নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে সংসার চালানো এখন দুষ্কর হয়ে উঠেছে।
এই বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী নূরন্নবী বলেন, বন্যার কারণে সবজি ক্ষেতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে সবজির দাম আরও বাড়তে পারে।
বন্যার কারণে সবজির মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটলেও পাইকারি বাজারে দাম কমার পরও ক্রেতাদের থেকে বেশি নেওয়া হচ্ছে পেঁয়াজের দাম।
রাজধানীর শ্যাম বাজারের পেঁয়াজ আমদানিকারক রতন সাহা এই প্রতিবেদককে বলেন, গত তিনদিন আগে থেকে কমেছে পেঁয়াজের দাম। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পাইকারি বাজারে দাম কমার পরও খুচরা বাজারে তার প্রভাব না পড়ার জন্য সরকারের নজরদারির অভাবকে দোষারোপ করেন এই ব্যবসায়ী।
বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার অনেকটাই ভারতের ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে রতন সাহা বলেন, ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়ার আমাদের দেশে বেড়েছিল। আবার দাম কমার পর আমাদের এখানেও কমেছে। তবে বন্যার কারণে আবার পেঁয়াজের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে দেশে চাল আমদানিতে দ্বিতীয় দফায় শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তের ঘোষণার পর চালের দাম কমতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

