এমএনএ রিপোর্ট : শুরু হয়ে গেছে ঈদ উৎসবের দিন গোনা। এগিয়ে আসছে নাড়ির টানে ঘরে ফেরার সময়। ঈদ যাত্রায় মহাসড়কে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এড়াতে জোরেশোরে চলছে সংস্কার কাজ। সরকারের যথাযথ মন্ত্রণালয় এ নিয়ে রয়েছে সদা তৎপর।
সরকারের নানারূপ অকৃত্রিম প্রচেষ্টা ও আশ্বাসের পরেও প্রতিবারই ঈদযাত্রায় পথের ভোগান্তি নিয়ে কিছুটা হলেও সংশয়ে ভোগেন ঘরমুখো মানুষ। অতিবৃষ্টিসহ নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় সারাদেশের সড়ক-মহাসড়ক বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটা এবার দুশ্চিন্তায় রূপ নিয়েছে। তবে আশার আলো দেখাচ্ছে দ্রুতগতির সংস্কার কাজ। কঠিন হলেও ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রাতদিন চলছে রাস্তাঘাটের মেরামত। মসৃণ না হলেও সড়কগুলো মোটামুটি চলাচলের উপযোগী করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
আগামী ২ সেপ্টেম্বর পবিত্র ঈদুল আজহা। বাস-ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রিও শেষ। ঘরমুখো মানুষ প্রস্তুত হচ্ছেন বাড়ির পথে যাত্রা করার। এবার টানা বৃষ্টি ও বন্যায় সড়কের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঈদ সামনে রেখে এসব সড়ক সংস্কারে নেমেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর।
গত ৯ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ নির্দেশ দেয়, ঈদের সাত দিন আগে অর্থাৎ ২৫ আগস্টের মধ্যে মহাসড়কের সংস্কার কাজ শেষ করতে হবে। গতকাল শেষ হয়েছে সেই ডেটলাইন। এ সময়ের মধ্যে সড়ক ও মহাসড়কের ভাঙাচোরা অংশে ইট বিছিয়ে মেরামত করে সওজ। কোথাও ইট ফেলে, কোথাও বিটুমিন দিয়ে ভরাট করা হয় খানাখন্দ। তবে সংস্থাটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেরামতের পরপরই বৃষ্টি এবং অধিক যানবাহন চলাচলের কারণে আবার রাস্তা ভাঙছে। দীর্ঘস্থায়ী মেরামতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ ও সময় প্রয়োজন। আপাতত ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে স্বল্পমেয়াদি মেরামত করা হচ্ছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামছুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, মেরামত পদ্ধতিতে গলদ রয়েছে, এ কারণেই সংস্কারের পর আবার রাস্তা ভাঙছে। দুই মাস আগে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মহাসড়ক সংস্কার করা হয়েছে। ঠিকভাবে মেরামত করা হলে, দুই মাসে নষ্ট হওয়ার কথা নয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্র (এনডিআরসিসি) জানিয়েছে, এবারের বন্যায় ২১টি জেলার ৭ হাজার ১৩০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত রয়েছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক, জেলা সড়ক এবং গ্রামীণ সড়কও এ হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের ২৩টি পয়েন্ট এক থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকায় ভেঙেচুরে গেছে। ১৮ জায়গায় পানির প্রবল তোড়ে ভেসে গেছে সড়ক-মহাসড়কের অংশবিশেষ।
সড়কের এ বিপুল ক্ষতিই ঈদযাত্রা নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ। আগে-পরে সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির সঙ্গে না মেলায় এবার ঈদের ছুটি তিন দিনই থাকছে। এতে স্বভাবতই মহাসড়কে যাত্রীর চাপ বেশি থাকবে। যে কারণে ভোগান্তির ভয় কাজ করছে। তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আশ্বস্ত করেছেন, আতঙ্কের কারণ নেই।
গত বৃহস্পতিবার তিনি বলেছেন, বৃষ্টি-বাদল-ঝড় যা-ই হোক, যে কোনো মূল্যে সড়ক-মহাসড়ক সচল রাখা হবে। তিনি বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের কাছে বিটুমিনের সড়ক নয়, রাস্তা সচল রাখাই বড় দায়িত্ব। এবারে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা মোটামুটি স্বস্তিদায়ক হবে।’
গত শুক্রবার সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলেছেন, কোনো অজুহাত চলবে না। বৃষ্টির মধ্যেই সড়ক মেরামত করে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে তুলতে হবে।
এদিকে ঈদের আগেই কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন কারণে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সেতুতে টোল আদায়ে ধীরগতির কারণে প্রায় প্রতিদিনই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ৪২ ও গতকাল ৩০ কিলোমিটার যানজট হয় এ মহাসড়কে। অন্যদিকে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা অংশ চার লেনে উন্নীত করার কাজের কারণে মহাসড়কের অবস্থা আগে থেকেই খারাপ। ঈদ উপলক্ষে গর্ত ভরাট করা হলেও বৃষ্টিতে তা আবার ধুয়েমুছে যাচ্ছে। বর্তমানে এই সড়কটি চলাচলের উপযোগী রাখার কাজ চলছে।
সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন সড়কে দ্রুতগতিতে কাজ করছেন সড়ক ও জনপথের লোকজন। সরেজমিন গতকাল দেখা গেছে, হাটিকুমরুল মোড় সংলগ্ন বনপাড়া-নাটোর অভিমুখে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দে ইট দিয়ে হেরিংবোন পদ্ধতিতে মেরামত কাজ চলছে। পাশের নগরবাড়ী-বগুড়া মহাসড়কের উল্লাপাড়ার শ্রীকোলা মোড় থেকে হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার অংশের খানাখন্দ কাটিং মেশিনে এবড়োথেবড়ো বিটুমিনের স্তর তুলে কংক্রিট-বালু দিয়ে মসৃণ করা হচ্ছে। হাটিকুমরুল মোড় থেকে নলকা সেতু পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার অংশের কিছু কিছু স্থানে ইটের মেরামত করা কাজের কঙ্কাল বের হয়ে আছে, সেখানে পাথর ও বিটুমিন দিয়ে সিলকোটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন সওজের লোকজন।
সিরাজগঞ্জ সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী) মাজহারুল হায়দার গণমাধ্যমকে বলেন, বৃষ্টির কারণে আমরা নাজেহাল হয়ে পড়েছি। তারপরও আমরা যথেষ্ট আন্তরিক। হাটিকুমরুল মোড় থেকে চান্দাইকোনা পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার, নলকা সেতুর পশ্চিম পাড়ে কিছু অংশে কাজ বাকি আছে। উল্লাপাড়া সড়কে কাটিং কাজ চলছে। আগামী ৩ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের রংপুর অংশের মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জ এলাকায় শতাধিক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলো মেরামতের কাজ করছে রংপুরের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।
সওজের অতিরিক্ত প্রকৌশলী (রংপুর জোন) ফকির আবদুর রব গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মহাসড়ক যান চলাচল উপযোগী রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বৃষ্টির কারণে সংস্কার কাজের সুফল মিলছে না। সংস্কারের পরপরই ভারি বৃষ্টিতে তা আবার নষ্ট হচ্ছে।
ঢাকা-খুলনা এবং ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া পর্যন্ত চার লেন উন্নীত করার কাজ চলছে। মাওয়া ঘাট পর্যন্ত সড়ক ভালো রয়েছে। তবে দুরবস্থা আরিচা ঘাটের আগে-পরে। রাজবাড়ীতে সড়ক মেরামতের পর তা আবার বেহাল হয়ে পড়েছে। সওজের অতিরিক্ত প্রকৌশলী (খুলনা জোন) রুহুল আমিন জানিয়েছেন, লবণাক্ততার কারণে খুলনা অঞ্চলে সড়কের স্থায়িত্ব কম। বর্ষায় ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কার করা হচ্ছে। যেখানে যেমন প্রয়োজন মেরামত করা হয়েছে। খানাখন্দ ভরাট করা হয়েছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও।
সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রক্ষণাবেক্ষণ) আবুল কাশেম ভূঁইয়া বলেছেন, নিয়মিত মেরামত ও সংস্কার কাজ চলছে। যেসব রাস্তা বন্যা ও বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো ঈদের আগে যতটা সম্ভব যান চলাচল উপযোগী রাখা হবে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

