Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / শিল্পী এস এম সুলতানের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী আজ

শিল্পী এস এম সুলতানের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী আজ

এমএনএ রিপোর্ট : বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী আজ ১০ আগস্ট। এ উপলক্ষে নড়াইলের জেলা প্রশাসন ও এসএম সুলতান ফাউন্ডেশন দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শিল্পীর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কোরআন খানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী।
বরেণ্য এ শিল্পী ১৯২৪ সালের এই দিনে নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে অবস্থিত মাছিমদিয়া গ্রামে বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। শিল্পীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নড়াইলের সুলতান মঞ্চ ও শিশুস্বর্গে ৪ দিনব্যাপী ‘সুলতান উত্সবের’ আয়োজন করা হয়েছে।
বাঙালি জাতিসত্তার গভীরতম অন্তর ভূমিতে সহস্র বছর ধরে যে অমিত শক্তি সুুপ্ত ছিল তারই নান্দনিক শৈল্পিক প্রকাশের অন্যতম সূর্যসারথি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান।
১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট তত্কালিন মহকুমা শহর নড়াইলের চিত্রা নদীর পাশে সবুজ শ্যামল ছায়া ঘেরা, পাখির কলকাকলীতে মুখরিত মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শিল্পী এসএম সুলতান। দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টে ভোগার পর ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
প্রিয় জন্মভূমি নড়াইলের কুড়িগ্রামের নিজ বাড়ির আঙিনায় তাকে শায়িত করা হয়। রাজমিস্ত্রি পিতা মেছের আলীর নান্দনিক সৃষ্টির ঘঁষামাজার মধ্য দিয়ে ছোট বেলার লাল মিঞার (সুলতান) চিত্রাঙ্কনে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ হয়।
রাজমিস্ত্রি বাবার সংসারে দারিদ্রতার মাঝেও ১৯২৮ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে লেখাপড়া শুরু করেন এসএম সুলতান। স্কুলের অবসরে বাবার রাজমিন্ত্রী কাজে সহযোগিতার করার ফাঁকে ছবি আঁকতে শুরু করেন। এ সময় তার আঁকা ছবি স্থানীয় জমিদারদের দৃষ্টি আর্কষণ করে।
রাজনীতিক ও জমিদার শ্যামাপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৩৩ সালে নড়াইলের জমিদার ব্যারিস্টার ধীরেন রায়ের আমন্ত্রণে ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল পরিদর্শনে আসলে তার একটি পোট্রেট আঁকেন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র এসএম সুলতান। মুগ্ধ হন শ্যামাপ্রাসাদসহ অন্যরা।
লেখাপড়া ছেড়ে ১৯৩৮ সালে কলকাতায় গিয়ে ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন সুলতান। সে সময় চিত্র সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সোহরাওয়ার্দীর সুপারিশে অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ১৯৪১ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তির সুযোগ পান এসএম সুলতান।
১৯৪৪ সালে আর্ট স্কুল ছেড়ে ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন তিনি। এ সময় কাশ্মীরের পাহাড়ে উপজাতীয়দের সঙ্গে বসবাস এবং তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে চিত্রাঙ্কন শুরু করেন।
১৯৪৫-৪৬ সালে ভারতের সিমলায় তার প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে লাহোরে সুলতানের চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন।
১৯৫০ সালে চিত্রশিল্পীদের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদানের জন্য তিনি আমেরিকা যান। এরপর ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের একক ও যৌথ চিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। পাবলো পিকাসো, ডুফি, সালভেদর দালি, পল ক্লী, কনেট, মাতিসের ছবির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। সুলতানই একমাত্র এশিয়ান শিল্পী যার ছবি এসব শিল্পীদের ছবির সঙ্গে একত্রে প্রদর্শিত হয়েছিল।
১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে আসেন সুলতান। শিশু-কিশোরদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি চারুকলা শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের ১০ জুলাই নড়াইলে ‘দি ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৭ সালে স্থপন করেন ‘শিশুস্বর্গ’।
এদিকে, সুলতান তার সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ১৯৯২ সালে ৯ লাখ মতান্তরে ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৫ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট দ্বিতলা নৌকা (ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ) নির্মাণ করেন। এই নৌকায় করে তিনি শিশুদের নিয়ে চিত্রা নদীতে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়তেন। নৌকাটি চিত্রা নদীর পাড়ে দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকায় অনেকটা ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে।
সুলতানের শিল্পকর্ম ছিল বাংলার কৃষক, কৃষাণী, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, মাঠ, নদী, হাওড়, বাওড়, জঙ্গল, সবুজ প্রান্তর ইত্যাদি। চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি বাঁশি বাজাতেন। পুষতেন সাপ, বেজি, বানর, খরগোস, মদনটাক, ভল্লুক, ময়না, গিনিপিগ, মুনিয়া, ষাঁড়সহ বিভিন্ন পশু-পাখি।
সুলতানের মৃত্যুর পর পশুপাখিগুলো ঢাকায় চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া হলেও আজও তা নড়াইলে ফিরিয়ে আনা হয়নি। সুলতানের নামে প্রতিষ্ঠিত এসএম সুলতান আর্ট কলেজটি শ্রেণিকক্ষের সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। সুলতানপ্রেমী তথা নড়াইলবাসী এসএম সুলতান সংগ্রহশালাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু কারার জোর দাবি জানিয়েছেন।
চিত্রাপাড়ের লালমিয়া শিল্পের মূল্যায়ন হিসেবে পেয়েছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ‘ম্যান অব এশিয়া’ পুরস্কার।
এছাড়া কালোত্তীর্ণ এই শিল্পী ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্সিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি এবং ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা পান। সুলতানের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য শিল্পীর মৃত্যুর পর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শিল্পীর বাসভবন সংলগ্ন ২ একর ৫৭ শতক জমির ওপর নির্মিত হয়েছে এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা।
চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৭০ বছরের জীবনে তিনি তুলির আঁচড়ে দেশ, মাটি, মাটির গন্ধ আর ঘামে ভেজা মেহনতী মানুষের সাথে নিজেকে একাকার করে সৃষ্টি করেছেন “পাটকাটা”, “ধানকাটা”, “ ধান ঝাড়া”, “ধান ভানা”, “ জলকে চলা”, “ চর দখল”, “গ্রামের খাল”, “গ্রামের দুপুর”, “নদী পারা পার”, “ধান মাড়াই”, “জমি কর্ষণে যাত্রা”, “মাছ ধরা”, “নদীর ঘাটে”, “গুন টানা”, “ফসল কাটার ক্ষণে”, “শরতের গ্রামীণ জীবন”, “শাপলা তোলা”র মত বিশ্ববিখ্যাত সব ছবি।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সুলতানের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সুলতান সংগ্রহশালা চত্বরে আজ বৃহস্পতিবার কোরআনখানি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শিল্পীর কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ, শিশুস্বর্গ মিলনায়তনে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও পুরষ্কার বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এসএম সুলতান শিশু চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আগামী ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর তিনদিনব্যাপী নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ চত্বরে, সুলতান মঞ্চ ও শিশুস্বর্গে ‘সুলতান উৎসব’ অনুষ্ঠিত হবে। সুলতান ফাউন্ডেশনের আয়োজনে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর চিত্রা নদীতে পুরুষ ও মহিলা মাঝি মাল্লার নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
সুলতান ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী জানান, শিল্পীর ৯৩তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
x

Check Also

বিসিবি নির্বাচন নিয়ে হাইকোর্টের অবস্থান: ‘নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবো না’

খেলাধুলা প্রতিবেদক আগামী ৭ জুন অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নির্বাচনে স্থগিতাদেশ চেয়ে করা রিট ...