Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে, বাড়ি ফেরার পরও হাসপাতালে ফিরছে শিশুরা

হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে, বাড়ি ফেরার পরও হাসপাতালে ফিরছে শিশুরা

এমএনএ প্রতিবেদক

রাজধানীর শিশু হাসপাতালগুলোতে মধ্যরাতেও দেখা গেছে ভিড়ের চিত্র। এক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১৩টি পরিবার তাদের অসুস্থ শিশু নিয়ে হাসপাতালে আসে, কিন্তু অধিকাংশই সিট না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

যশোর থেকে আসা এক বছরের শিশু আয়মান সাদিককে ভর্তি করাতে এসে মাত্র ৩৩ মিনিটের মধ্যে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয় তার পরিবারকে। একইভাবে যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, খুলনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পরিবারগুলোও সিট সংকটে পড়ে অন্য হাসপাতালে ছুটছে।

একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার সদস্য জানান, “রাতভর জ্বর ও হাম নিয়ে শিশু আসছে। কিন্তু সিটের তুলনায় রোগী অনেক বেশি, তাই অনেককেই ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।”

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ ক্রমেই উদ্বেগজনক চিত্র ধারণ করছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতাল থেকে আংশিক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই তারা আবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগেই ছাড়পত্র দেওয়া এবং বাড়িতে যথাযথ যত্ন ও পুষ্টির অভাবের কারণেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অপুষ্টির মতো জটিলতা বাড়ছে।

রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে অনেক শিশুকে ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে করিডোরেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাজারীবাগের বাসিন্দা খাদিজার সাত মাস বয়সী সন্তান আরিয়ান এমনই এক রোগী। ঈদের আগে হালকা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিন দিনের চিকিৎসায় তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়ি ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই তার অবস্থার অবনতি ঘটে। বর্তমানে সে তীব্র কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে এবং পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর ডিএনসিসি হাসপাতালে। ১৭ মাস বয়সী শিশু রাফসান একাধিক হাসপাতালে ঘুরে বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন। একবার সুস্থ হয়ে বাড়ি গেলেও পরে আবার নিউমোনিয়া ও জ্বরে আক্রান্ত হয় সে।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, “শুধু জ্বর কমলেই রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া উচিত নয়। সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।” তিনি জানান, হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়, ফলে ফুসফুসে সংক্রমণ হয়ে নিউমোনিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া চোখের জটিলতা থেকে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। এ কারণে হামের রোগীদের ভিটামিন-এ প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একবার হলে সাধারণত দ্বিতীয়বার হয় না, তবে এটি শরীরকে এতটাই দুর্বল করে দেয় যে অন্যান্য সংক্রমণ সহজেই আক্রমণ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ত্বকের র্যাশ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে, তাই নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১২ হাজার ৩২০ জন সম্ভাব্য হামে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ২৪১। একই সময়ে সম্ভাব্য ও নিশ্চিত মিলিয়ে ১৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ১৮৭ জন রোগী শনাক্ত এবং ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি। ডিএনসিসি হাসপাতালের ৩০০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ডে প্রায় পূর্ণসংখ্যক রোগী ভর্তি রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ টিকাদানে ঘাটতি। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশু, যারা নির্ধারিত টিকার এক বা একাধিক ডোজ পায়নি, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

এছাড়া অপুষ্ট শিশু, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু এবং ১ থেকে ৫ বছর বয়সীরা মারাত্মক জটিলতার ঝুঁকিতে রয়েছে।

হামের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি, চোখ ও নাক দিয়ে পানি পড়া এবং পরে শরীরে র্যাশ দেখা যায়। সাধারণত তৃতীয় দিন থেকে কপাল, কান ও মাথার পেছন থেকে র্যাশ শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। র্যাশ ওঠার আগেই মুখের ভেতরে ছোট দানার মতো দাগ দেখা যেতে পারে।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের ঝুঁকি কমাতে শিশুদের পূর্ণ টিকাদান নিশ্চিত করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুর জন্য প্রয়োজন— সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া; পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার ও মায়ের দুধ; পরিচ্ছন্ন পরিবেশ; নিয়মিত রোদে রাখা; ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ না দেওয়া।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিবন্ধিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই নিরাপদ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার, চিকিৎসক এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে এই সংক্রমণ মোকাবিলার প্রধান পথ।

x

Check Also

দীর্ঘ ২৫ বছরেও শেষ হয়নি রমনা বটমূলের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে হামলা মামলার বিচার

বিশেষ প্রতিবেদন বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনে যখন সারাদেশে আনন্দ-উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে, তখনও অনেকের মনে ফিরে ...