মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ) : বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দীর্ঘ দিনের শরিক ইসলামী ঐক্যজোট।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে জোটের ত্রি-বার্ষিকী সম্মেলনে চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী এই ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, “ইসলামী ঐক্যজোট এখন থেকে স্বতন্ত্রভাবে রাজনীতি করবে। সেজন্য আমরা ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেলাম। আমরা আর জোটে নেই।”
গত ৫ জানুয়ারি নয়া পল্টনে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সমাবেশে জোটের শরিক নেতাদের অনুপস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনার মধ্যেই ইসলামী ঐক্যজোটের এ ঘোষণা এলো।
এই সম্মেলনে নেজামীকে চেয়ারম্যান ও মুফতি মুহাম্মদ ফয়েজুল্লাহকে জোটের মহাসচিব পদে পুনর্নির্বাচিত করা হয়।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ‘ওলামাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া’ জরুরি হয়ে উঠেছে মন্তব্য করে নেজামী বলেন, ইসলামী ঐক্যজোট এখন ‘স্বকীয়তা ধরে রেখে’ সাংগঠনিক তৎপরতায় আরও মনোযোগী হবে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নেবে।
এর আগে গতবছর সেপ্টেম্বরে বিএনপি জোটে ভাঙন ধরিয়ে বেরিয়ে যায় শেখ শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)।
ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-এনডিএফ নামে নতুন ১০ দলের নতুন এক জোটের ঘোষণা দিয়ে নীলু সে সময় অভিযোগ করেছিলেন, ২০ দলের জোটে বিএনপি-জামায়াত সব সিদ্ধান্ত ‘চাপিয়ে দিতো’।
বিএনপি নেতারা অনেকদিন ধরেই বলে আসছেন, সরকার ২০ দলীয় জোটে ভাঙন ধরানোর জন্য ‘বিভিন্নভাবে’ চেষ্টা করে যাচ্ছে। দলের ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ আজ বৃহস্পতিবারও একই অভিযোগ করেন।
জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “জোট ভাঙার এই ষড়যন্ত্র সফল হবে না।… আন্দোলনের জন্য বিএনপিই যথেষ্ট।”
জোট ছাড়ার কারণ হিসেবে পরে এক প্রশ্নের জবাবে ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান নেজামী বলেন, ‘আমরা ২০ দলীয় জোটে থাকাকালীন ভালোভাবে দলীয় কাজকর্ম করতে পারিনি। জোটেও ঠিকমতো সময় দিতে পারিনি। এ টানাপড়েনে আমরা সাংগঠনিকভাবে অনেক পিছিয়ে পড়েছি। তাই সংগঠনকে জোরদার করতে জোট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি।’
বিএনপির কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি বা নেতিবাচক আচরণের কারণে জোট ছেড়েছেন কি-না, এ প্রশ্নের না-সূচক জবাব দেন ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান নেজামী।
২০ দলীয় জোট ছাড়ার ব্যাপারে বিএনপিকে আগেই জানিয়েছেন কি-না, এ প্রশ্নের জবাবে আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, ‘না, আগে জানাইনি। এখন তারা জানবেন।’
১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগকে সরকার থেকে হঠাতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জামায়াতের তখনকার আমির গোলাম আযম এবং ইসলামী ঐক্যজোটের তখনকার চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠনের ঘোষণা দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
সেই থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির সঙ্গেই ছিল ইসলামী ঐক্যজোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট থেকে নির্বাচন করে জাতীয় সংসদে দুটি আসনও পেয়েছিল তারা।
তবে খালেদা জিয়া ও মহাসচিব পর্যায়ের ওইসব বৈঠকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নেতারা অংশ না নিলেও তারা এখনও ২০ দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয়নি।
ফজলুল হক আমিনীর মৃত্যুর পর ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান হন আবদুল লতিফ নেজামী। ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা চারদলীয় জোট কলেবরে বেড়ে ১৮ দলীয় যে জোট হলে ইসলামী ঐক্যজোটও সঙ্গে থাকে।
বিএনপি ও ইসলামী ঐক্যজোট ছাড়া সে সময় জোটের বাকি শরিকরা ছিল জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিশ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), কল্যাণ পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), লেবার পার্টি, ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, ন্যাপ ভাসানী, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, পিপলস লীগ ও ডেমোক্রেটিক লীগ।
পরে পর্যায়ক্রমে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও সাম্যবাদী দল এই জোটে যোগ দিলে তা ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়।
শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও দলের নেতা ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বে একটি অংশ ওই নামেই ২০ দলে থেকে যায়। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, জোটের ‘একটি দলও কমেনি’।
আবদুল লতিফ নেজামী ২০ দল ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পরও ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মাওলানা আবদুর রকিবের নেতৃত্বে আলাদা কমিটি করে বিএনপি জোটে থাকার প্রক্রিয়া চলছে বলে দলীয় নেতাকর্মীদের খবর।
তবে বিএনপির তরফে অনেকদিন ধরেই অভিযোগ করা হচ্ছিল, ২০ দলীয় জোট ভাঙার জন্য সরকারের পক্ষে থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে। জোট ছাড়ার জন্য সরকারের কোনো চাপ ছিল কি-না, এ প্রশ্নের জবাবে নেজামী বলেন, ‘জোট ছাড়ার পেছনে সরকারের কোনো চাপ ছিল না।’
গুঞ্জন রয়েছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে চলছে টানাপড়েন। জোটের অভ্যন্তরেই কথা উঠেছে হেফাজতে ইসলাম-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দল মামলা ও ধরপাকড় থেকে ‘বাঁচতে’ সরকারের দিকে ঘেঁষছে। এছাড়া মূল্যায়ন না করায় বিএনপির ওপর আগে থেকেই ক্ষুব্ধ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল। পৌর নির্বাচনে ‘বঞ্চিত’ হয়ে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। এসব দলের অধিকাংশ নেতা হেফাজত সহিংসতার বিভিন্ন মামলার আসামি। তারা আবার হেফাজতেরও দায়িত্বশীল নেতা। ইসলামী ঐক্যজোট মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিবের পদে রয়েছেন। সহিংসতার একাধিক মামলার ‘পলাতক’ আসামি তিনি।
হেফাজত-সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা জানান, গত দুই বছরে মামলার কারণে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারছেন না। বিএনপিও প্রাপ্য মূল্যায়ন করছে না। তাই অস্তিত্ব রক্ষায় সরকারের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করে চলছে। মামলা থেকে বাঁচতে ঐক্যজোট ও জমিয়ত ২০ দল ছাড়তে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। ধর্মভিত্তিক দলগুলো ২০ দল ছেড়ে নতুন জোট গড়তে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক




