মহসীনুল করিম
বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনা একসময় ছিল অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী ভোগান্তির অন্যতম আলোচিত ক্ষেত্র। বেসরকারি হজ এজেন্সির প্রতারণা, বিমান টিকিট সিন্ডিকেট, সৌদি আরবে নিম্নমানের আবাসন, ভিসা জটিলতা এবং শেষ মুহূর্তের বিশৃঙ্খলা প্রায় প্রতি বছরই হজযাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়াত। এছাড়া হজযাত্রী পুনঃস্থাপন (রিপ্লেসমেন্ট) সুবিধাকে কেন্দ্র করে ভুয়া নিবন্ধন, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং নিম্নমানের হজ ব্যাগ সরবরাহ নিয়েও অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের সময়ে ধর্মমন্ত্রী কাজি শাহ মোফাজ্জাল হোসেন কায়কোবাদ–এর নেতৃত্বে হজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগকে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলতি বছরের হজ কার্যক্রমে গত ১৯ এপ্রিল থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ৭৮ হাজার বাংলাদেশি হজযাত্রীকে বড় ধরনের জটিলতা ছাড়াই সৌদি আরবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আগামী ২৬ মে আরাফাত দিবসের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হবে এবারের হজ।
ধর্মমন্ত্রী কাজি শাহ মোফাজ্জাল হোসেন কায়কোবাদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে হজযাত্রীদের “খাদেম” হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি নিজেকে হাজিদের সেবাকর্মী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, হজযাত্রীদের যেন কোনো ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে না হয়, সেটিই ছিল মন্ত্রণালয়ের প্রধান লক্ষ্য।
তিনি জানান, সৌদি আরবের নতুন নিয়ম অনুযায়ী এবার অধিকাংশ হজযাত্রীর ভিসা ফ্লাইট শুরুর আগেই সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রায় শতভাগ যাত্রীর ইমিগ্রেশন ঢাকাতেই শেষ হওয়ায় দুই দেশের বিমানবন্দরেই ভোগান্তি কমেছে। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের টিম সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করেছে এবং ছোটখাটো সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা হয়েছে।
অতীতের অনিয়মের দীর্ঘ ইতিহাস
বাংলাদেশে হজ ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় সংকট ছিল বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলোর অনিয়ম। বিভিন্ন সময়ে টাকা নিয়ে হজে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়া, নিম্নমানের আবাসন, খাবার ও পরিবহন সংকট এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বহু এজেন্সির বিরুদ্ধে।
২০১৪ সালে সরকার ২০৮টি হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। পরে ২০১৭ সালেও প্রায় ৯০টি এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে। কয়েকটির লাইসেন্স বাতিল ও জরিমানার সুপারিশ করা হয়।
২০১৬ সালে সময়মতো ভিসা ও সৌদিতে বাড়ি ভাড়া নিশ্চিত করতে না পারায় প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি হজযাত্রীর হজ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। একই সময়ে বিমান টিকিট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও ওঠে। অভিযোগ ছিল, কিছু প্রভাবশালী এজেন্সি ও টিকিট ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে প্রতিজনের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করত।
সংসদীয় তদন্ত কমিটিগুলো অতীতে মক্কা ও মদিনায় বাড়ি ভাড়া প্রক্রিয়াকে দুর্নীতির বড় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। উন্নত আবাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অনেক যাত্রীকে নিম্নমানের ও দূরবর্তী ভবনে রাখা হতো।
কঠোর নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার
বর্তমান সরকারের সময়ে হজ ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অনিয়মে জড়িত এজেন্সির বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিল, আর্থিক জরিমানা ও নিবিড় নজরদারির মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।
সরকারি পর্যায়ে সরাসরি তদারকি বাড়ানো হয় এবং পুরো হজ ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হয়। এতে এজেন্সিগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরে আসে এবং সেবার মান উন্নত হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
হজ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। ‘লাব্বাইক’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন, ফ্লাইট তথ্য, গাইডলাইন, চিকিৎসাসেবা ও জরুরি সহায়তা এক প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া হাজিদের খুঁজে পেতেও প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ৮৯২ জন হারিয়ে যাওয়া হজযাত্রীকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
প্রতি ৪৬ জন হাজির জন্য একজন প্রশিক্ষিত গাইড নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি মক্কা ও মদিনায় সার্বক্ষণিক মেডিকেল টিম ও সেবা কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে।
ব্যয় কমিয়ে স্বস্তি
হজ ব্যয় কমানোও সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ সালের সরকারি হজ প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় কম।
বিশেষ করে বিমান ভাড়া কমানোয় হজযাত্রীরা বেশি সুবিধা পেয়েছেন। গত দুই বছরে বিমান ভাড়া প্রায় ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এছাড়া ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো ও প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমের ফলে সামগ্রিক খরচও হ্রাস পেয়েছে।
সরকারি প্যাকেজের উদ্বৃত্ত প্রায় ৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা হাজিদের ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্তও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। পাশাপাশি সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ে জমা থাকা বিভিন্ন এজেন্সির প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ফেরত এনে সংশ্লিষ্টদের হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দৃঢ় প্রশাসনিক নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে দেশের হজ ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

