দীর্ঘ কয়েকমাসে সারা পৃথিবীব্যাপী সার্বিক মন্দাভাবের কারণে আগামীতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে দুর্দিনের আভাস। এ অবস্থায় আগামীর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখনি প্রস্তুতি নেয়া জরুরি।
অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলো যে কঠিন সময় পার করছে, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, দেশের অর্থনীতির ৭৫ শতাংশই এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে চাহিদা না থাকায় একদিকে রফতানি আয় কমবে। অন্যদিকে শ্রম সংকুচিত হয়ে আসায় রেমিটেন্সেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যা আমলে নেয়া উচিত। একটি দেশের অর্থনীতি মূল্যায়নের মাপকাঠি হচ্ছে জিডিপি। জিডিপির আকার মূল্যায়নে সাধারণত দুটি পদ্ধতির সাহায্য নেয়া হয়। একটি হল, চলতি বাজার মূল্যের ভিত্তিতে এবং অন্যটি হল, মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে। গত বছরের শেষদিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে জিডিপির আকার অনুযায়ী বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৪তম হলেও জনগণের ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে তা ছিল ৩৩তম। সে সময় বিশ্বব্যাংক আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলেও অভিমত প্রকাশ করেছিল। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের যেসব ঝুঁকি রয়েছে, তার অভিঘাতগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলা না গেলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, শ্রমশক্তি রফতানিতে ভাটা ও চীনের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ার প্রভাব উল্লেখযোগ্য। এর ফলে সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির আশা করলেও তা ৬ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি অর্জিত হবে না বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে বিশ্বব্যাংক।
বস্তুত সরকার মুখে যাই বলুক, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমে খারাপের দিকে যাওয়ার আশংকাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হওয়া বিশ্ব অর্থনীতির দুর্দিন সংকট আরও ঘনীভূত করবে- তা বলাই বাহুল্য। দেখা যাচ্ছে, দেশে মূল্যস্ফীতি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারে যে আস্থাহীনতা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, তারও কোনো সমাধান দিতে পারেনি সরকার। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক দেশের ২৩ হাজার প্রভাবশালীর দায়মুক্তির ঘটনাও অর্থনীতির ওপর অশুভ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন অনেকে। দুর্নীতি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান অন্তরায় হলেও সরকারের কাছ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে আমদানি ব্যয়বৃদ্ধির তুলনায় রফতানি আয় বৃদ্ধি না পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমেই চাপ বাড়ছে। রফতানি আয় সীমিত হওয়ার বিপরীতে আমাদের অন্য অবলম্বন হতে পারত কৃষি খাত। কিন্তু কৃষি খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও বিগত দশকগুলোয় আমরা মোটামুটি এগিয়েছি। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, জাতি হিসেবে আমরা কোনোমতে টিকে থাকব- এই আশায় তো এদেশের মানুষ স্বাধীনতা চায়নি। আমাদের চাওয়া ছিল- অন্তত একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। একটা স্বস্তির অর্থনীতির মধ্যে বাস করা। দেশের অর্থনীতিকে ‘স্বস্তি’র জায়গায় নিতে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা দরকার, সরকার সেই শক্তি অর্জন করবে- এটাই প্রত্যাশা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক


