আন্দোলন-নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বললেন খালেদা
Posted by: News Desk
December 24, 2017
এমএনএ রিপোর্ট : বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, আগামী দিনে যে কর্মসূচি আসবে সে কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত হতে হবে। আন্দোলন ও নির্বাচন সবকিছুর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে হলে আমাদেরকে আরেকবার জেগে উঠতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্যান্য রাজনৈতিক দল যারা আছে তাদেরকেও আহ্বান জানাই আসুন, আপনারা আমরা সবাই ঐক্য করি। ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করি। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করি।
আজ রবিবার সন্ধ্যায় মহানগর নাট্যমঞ্চে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন ও মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে এসব কথা বলেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
সমাবেশের আয়োজন করে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল। এতে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজীজ উলফাত। সমাবেশ পরিচালনা করেন মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহমেদ খান।
বেলা ১২টার এই সমাবেশে উদ্বোধন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরম্নল ইসলাম আলমগীর। বিকেলে কোরআন তেলওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশে শুরু হয়। সমাবেশে প্রায় এক ঘন্টা বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসন। সম্মেলনে ইসতিয়াক আজিজ ইলফাত ও সাদেক আহমেদ খান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুননির্বাচিত করা হয়।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ মাঠে গিয়ে ভোট চাচ্ছে আর আমরা ঘরে বসেও সমাবেশ করতে পারব না এটাতো কখনও হতে পারে না। স্বাধীন দেশ আওয়ামী লীগের জন্য আজকে আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। কাজেই আওয়ামী লীগের শৃঙ্খলমুক্ত হতে হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, আমাদের মাধ্যমেই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র এসেছিল, জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। আবারও বিএনপির মাধ্যমে এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
গুম-খুন পরিস্থিতিসহ নানা ইস্যুতে সরকারকে দায় করে খালেদা জিয়া বলেন, দেশে কোনো প্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে চলছে না। সবাই দেখেছে, কিভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার কারণে প্রধান বিচারপতিকে (সুরেন্দ্র কুমার সিনহা) সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সরকারের অপকর্ম প্রকাশ করেছিলেন, তিনি ১৫৪ জন অনির্বাচিত সংসদ সদস্যের বিষয়ে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। সংসদকে অকার্যকর ঘোষণা করেছিলেন। রধান বিচারপতিকে তার এজলাসে আর বসতে দেয়া হলো না। বাড়িতেও বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তার অপরাধ এ সরকারের অপরাধ নিয়ে তিনি সত্য কথা বলেছেন। সেজন্য তাকে তাকে দেশের বাইরে যেতে বাধ্য করা হলো। তার স্ত্রীকে যেতে দেয়া হলো না। বিদেশেও তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হলো। প্রধান বিচারপতি হিসেবে যে সম্মানটুকু পাওয়ার তাও দেয়া হয়নি। তিনি দেশে আসতে চেয়েছিলেন। তিনি পদত্যাগপত্র দেননি। কিন্তু জোর করে তার পদত্যাগপত্র নেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধাদের ভয় পায় দাবি করে বিএনপি প্রধান বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা শুনলেই তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ভয় পায়। আজকে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তারা মুখে শুধু মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযুদ্ধ করে। অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ করতে দেয় না। এই যে মুক্তিযোদ্ধারা, এরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। এদের প্রত্যেককে সম্মান করা উচিত। এই হলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আওয়ামী লীগের প্রীতি ও সম্মান? আওয়ামী লীগ কাউকে সম্মান দিতে জানে না তাই জনগণও তাদেরতে সম্মান দেয় না।
রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে বিএনপি দাওয়াত পায় না জানিয়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদেরও এসব প্রোগ্রামে দাওয়াত করা হয় না। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীমকে বঙ্গভবনের দাওয়াত পাওয়ার পরেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি অভিযোগ করে খালেদা বলেন, মেজর জেনারেল ইব্রাহীম একজন রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা। তাকে বঙ্গভবনে দাওয়াত দেওয়ার পরও সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এরপর তাকে ১৬ ডিসেম্বর প্যারেড গ্রাউন্ডে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি দাওয়াত পাওয়ার পরও ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। ১৬ ডিসেম্বর আর ২৬ মার্চের অনুষ্ঠানে আমরা দাওয়াত পাই না। এই হলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাদের আচরণ।
স্বাধীনতার সুফল কেবল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের লোকজন ভোগ করছে অভিযোগ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, কাউকে কথা বলতে দেওয়া হয় না। সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হয় না। এর নাম কি গণতন্ত্র? এটাই কি স্বাধীনতার সুফল। আসলে স্বাধীনতার সুফল কেবল আওয়ামী লীগ ও তাদের লোকজন ভোগ করছে। তারা লুটপাট করছে। তারা নিজেরা সভা-সমাবেশ করে ভোট চাইছে। কিন্তু অন্যদের তা করতে দিচ্ছে না। এভাবে তো চলতে পারে না।
খালেদা জিয়া বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে আওয়ামী লীগ সব সময় মিথ্যাচার করে। তারা সত্য গোপন করতে চায়। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এটা সবাই জানে। এমনকি বাংলাদেশের বাইরের সবাইও জানে। আমাদের দেশ এমনিতেই স্বাধীন হয়ে যায়নি। অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। অনেক মা-বোনের সম্ভ্রমহানি হয়েছে।
পাকিস্তানিরা গণতন্ত্র কেড়ে নিয়েছিল বলেই তাদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল উল্লেখ করে বিএনপি প্রধান বলেন, আজকে একই অবস্থা বিরাজ করছে দেশে। জনগণ ভোট দিতে পারে না। তাদের ভোট দিতে দেওয়া হয় না। আওয়ামী লীগ ও তাদের অনুসারী দল ছাড়া দেশে আর যত রাজনৈতিক দল আছে, তারা সবাই অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। সেজন্য দরকার একটি নিরপেক্ষ সরকার। (প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনার অধীনে কখনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। জনগণ ভোট দিতে পারবে না। তারা শুধু সংবিধান সংবিধান করে। সংবিধান তো তারা লঙ্ঘণ করেছে। ১৫৪ জন অনির্বাচিতদের দিয়ে সংসদ চালাচ্ছে, এটাই তো সংবিধান লঙ্ঘন। তারা বলে নির্বাচিত সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না। তাহলে তারাও তো অনির্বাচিত, তাদের অধীনে কিভাবে নির্বাচন হবে?
সরকারের বিরুদ্ধে ‘একটার পর একটা অপকর্ম’র অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, তারা খুন-গুম করছে। সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। তাদের লক্ষ্য একটাই, সেটা হলো বাকশাল কায়েম করা। এর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাকে গুম করা হয়। তারা অনেক লোককে ধরে নিয়ে গেছে। তারা যখন আবার ফিরে আসে, তখন ভয়ে কোনো কথা বলে না। তাদের এমনভাবে ভয় দিয়ে দেওয়া হয়, যেন কিছু না বলে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, সচিবালয়ে রাতের অন্ধকারে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ভালো ভালো অফিসারদের দিনের পর দিন বছরের পর বছর ওএসডি করে রাখা হচ্ছে। এক সময় তাদেরকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। পুলিশেও সেরকম করা হয়েছে। পুলিশের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র মানা হয় না। তাদের লোকদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। যারা ভাল অফিসার, তাদের ভাল পোস্টিং দেওয়া হয় না। ভালো অফিসারদের পদোন্নতি না দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণ দিশেহারা দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, চালের কেজি তো দশ টাকা থাকার কথা ছিল। কিন্তু এখন চালের কেজি ৭০ টাকা। এর চেয়েও বেশি আছে। ডাল ১০০ টাকার ওপরে। পেঁয়াজ ১২০ টাকা। কোনো মানুষের কিছু কিনে খাওয়ার উপায় নেই। ৬০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। কেন এই অবস্থা? কারা এজন্য দায়ী? আওয়ামী লীগের লোকেরাই দায়ী। এই সরকারই দায়ী। ঘাটে-ঘাটে আওয়ামী লীগের লোকদের টাকা দিতে হয়। ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। এদিকে সরকারের কোনো নজর নাই। শুধু গালাগালি দেয়। চুরি করে তারা, আর দোষ দেয় আমাদের। এভাবে একটা দেশ চলতে পারে না।
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে, আবার প্রতিবেশী দেশ ভারতও আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছে। তাদেরও ধন্যবাদ জানাই আশ্রয় দেয়ার জন্য। আমরা চাই সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে থাকতে, দেশের উন্নতি করতে। কোনো ভেদাভেদ রাখতে চাই না। জনগণের ওপর ছেড়ে দিতে চাই। তারা যাকে সম্মান জানাবে তারাই দেশের দায়িত্বে আসবে। আমরা বলেছি আপনারা যদি এতো ভাল কাজ করে থাকেন, তাহলে জনগণের ওপর ছেড়ে দেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তো আপনারাই করেছিলেন। ’৯৬ সালে আমরা অল্প ব্যবধানে হেরেছিলাম। আমরা সেই নির্বাচন মেনে নিয়েছিলাম। ’৯৬ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর জনগণ তাদের চিনতে পেরেছিল। তাই ২০০১ সালে আমরা দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সরকার গঠন করেছিলাম।
এর আগে, বিকেল সাড়ে ৪টায় মহানগর নাট্যমঞ্চের সমাবেশস্থলে এসে উপস্থিত হন খালেদা জিয়া। এসময় দলীয় নেতাকর্মীরা স্লোগান দিয়ে তাকে স্বাগত জানান।
দুপুরের পর থেকেই মহানগর নাট্যমঞ্চ এলাকায় আসতে থাকেন দলীয় নেতাকর্মীরা। তবে সমাবেশ হয় নাট্যমঞ্চের ভেতরে। বাইরেও কয়েক হাজার নেতাকর্মী জড়ো হন। এটি মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ হলেও উপস্থিতি বেশি দেখা যায় বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের।
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহীম, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম-মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক কর্নেল (অব.) জয়নাল আবেদিন এবং মুক্তিযোদ্ধা দলের মিজানুর রহমান খান, নজরুল ইসলাম খোকা, আবদুল মালেক খান, সামাদ মোলতা প্রমুখ।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
খালেদা নির্বাচনের আন্দোলন প্রস্তুতি নিতে বললেন 2017-12-24