এমএনএ রিপোর্ট : জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি এবং সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর কঠোর সমালোচনা করেছেন সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।
আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তারা বলেছেন, বাজেটে যেসব বিষয় মানুষের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে কিংবা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে- সেগুলো লাঘব করা হোক। গরিবদের ওপর করারোপ না করে বিত্তবানদের ওপর করা হোক।
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘লুটপাট ও চুরির বাজেট’ আখ্যা দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে সংসদ সদস্যরা আরও বলেছেন, লুটপাটে সিদ্ধহস্ত বলেই খালেদা জিয়া প্রস্তাবিত বাজেটকে লুটপাটের বাজেট বলতে পারেন। তিনি ক্ষমতায় থাকতে দেশকে পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। আয়নায় নিজের চেহারা দেখেই বাজেট নিয়ে কথা বলা উচিত তার।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাাজটের ওপর সাধারণ আলোচনায় সংসদ সদস্যরা এসব কথা বলেন। ১ জুন বাজেট উত্থাপনের পর বুধবার থেকে এর ওপর সংসদ সদস্যদের সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।
এদিন প্রথমে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং পরে ডেপুটি স্পীকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধামন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, সরকারি দলের সংসদ সদস্য ডা. দীপু মনি, অধ্যাপক আলী আশরাফ, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, টিপু মুন্সী, ফাতেমা জোহারা রানী, আনোয়ারুল আজিম খান, সেলিনা বেগম এবং বিরোধী দল জাতীয় পার্টির একেএম মাঈদুল ইসলাম।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি ও সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার কমানোর সমালোচনা করে বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছেন যাদের কাছে একলাখ টাকা আছে, তারাই ধনবান। কিন্তু বর্তমান যুগে একলাখ টাকা কোনো টাকাই নয়। মন্ত্রী হিসেবে তারা মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাজেটে অনুমোদন দিয়েছেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হিসেবে, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে মানুষের দুর্ভোগের বিষয়গুলোও তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, বাজেটে যেসব বিষয় মানুষের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে কিংবা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে- সেগুলো লাঘব করা হোক। ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক আমানত কিংবা সঞ্চয়পত্রের ওপর কর অব্যাহতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই বিত্তবানদের ওপর অনেক বেশি করারোপ করা হয়। আমাদের দেশেও গরিবদের ওপর করারোপ না করে বিত্তবানদের ওপর করা হোক।
মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে সরকার ও মন্ত্রণালয় গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কবরগুলো একই ডিজাইনে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে ৫০ বছর পরও মানুষ বুঝতে পারে এগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের কবর।
যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় বাজেটের বিভিন্ন দিক আলোচনা করে বলেন, উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ। যতদিন শেখ হাসিনার হাতে থাকবে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ।
সরকারি দলের ডা. দীপু মনি বলেন, আমাদের দায়বদ্ধতা মানুষের কাছে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রতিনিয়তই আমাদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। সংসদও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। বিচার বিভাগেরও সংসদের কাছে দায়বদ্ধতা আছে। বাহাত্তরের সংবিধানেও এই দায়বদ্ধতা ছিল। একমাত্র সামরিক শাসন তথা পাকিস্তানের মতো দেশে জনগণের কাছে কোনো দায়বদ্ধতা নেই। জনগণের ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই। আমরা যেন পাকিস্তানের পদাঙ্ক অনুসরণ না করি।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট ও দুঃশাসনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া লুটপাটের বাজেট বলেছেন। লুটপাটে যারা সিদ্ধহস্ত, তারাই এমন কথা বলতে পারেন। আমাদের দেশে কিছু লোক আছে, যারা তাকিয়ে থাকেন পশ্চিমা বিশ্বের তল্পীবাহক হওয়ার জন্য। এই তল্পীবাহক হওয়ার মাধ্যমে তারা দেশ ও জনগণের স্বার্থের ক্ষতি করেন। এরাই আসলে দেশের নব্য মীরজাফর। এদের ব্যাপারে সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, ভ্যাট আইন কার্যকর এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তবে যেসব পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কার্যকরের ক্ষেত্রে কোনো দুর্বলতা যেন সেদিকে তদারকি করতে হবে।
অধ্যাপক আলী আশরাফ ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারী শুল্ক বৃদ্ধি এবং ভ্যাটের শুল্ক বৃদ্ধির সমালোচনা করে বলেন, আর্থ-সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বাজেট গণমুখী ও অবশ্যই বাস্তবায়ন যোগ্য। দেশ আজ উন্নয়নের মহা-দিগন্ত পাড়ি দিচ্ছে। সব ধরণের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই দেশ আজ সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, ব্যাংক আমানতের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করে কয় টাকা পাবেন? কিন্তু এটা নিয়ে সারাদেশে যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে তা মোটেই কাম্য ছিল না। আর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আরও আলোচনা করে ভ্যাটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিন। এক্সাইটেড (উত্তেজিত) না হয়ে ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করুন। কারণ এই বিশাল বাজেট আপনাকেই বাস্তবায়িত করতে হবে।
একেএম মাঈদুল ইসলাম চোরাচালান ও হুন্ডি ঠেকাতে সীমান্ত সিল করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, চোরাচালানে বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব মালপত্র আসছে সেগুলো সিল করে দিন। ল্যাগেজ পার্টি বন্ধ করে দেন। ঈদের সময় কয়েকদিনের জন্য দেশের মার্কেটগুলোতে রেড দিলেই বোঝা যাবে বিভিন্ন দেশ থেকে কত হাজার কোটি টাকার মালামাল চোরাপথে এসেছে? তারা কাস্টমস ডিউটি ও ইনকাম ট্যাক্স দেয় না। হুন্ডি করে দেশের সব টাকা নিয়ে যায়। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বাজেটের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ হবে।
আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, আমরা ভ্যাট দিচ্ছি, ভ্যাট দিতে অভ্যস্ত। কিন্তু ভ্যাট সরকারের কোষাগারে জমা পড়ে কম। এ ব্যাপারে এনবিআরকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। যত ষড়যন্ত্রই হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে যেভাবে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, তাকে ক্ষমতা থেকে নামানোর শক্তি কারো নেই।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

