অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
বাংলাদেশের আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার—এমনটাই জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নয়নেও নেওয়া হচ্ছে সমন্বিত পদক্ষেপ।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের ১৩তম দিনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী এসব কথা তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আর্থিক খাতের গভীরতর সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে যাতে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে শক্তিশালী নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার লক্ষ্য করেছে যে ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই ঘাটতি পূরণ এবং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর সংস্কার জরুরি। অতীতের তুলনায় উন্নত ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকার ঘাটতি অর্থায়নের বিকল্প উৎস খুঁজছে। সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহ, অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব খাত থেকে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া ঋণ গ্রহণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে ধীরে ধীরে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমানো এবং একটি টেকসই ফিসক্যাল স্পেস তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য। মধ্যমেয়াদি বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিবিএফ) এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো (এমটিএমএফ) উন্নয়নে ডায়নামিক ম্যাক্রো-ফিসকাল মডেল ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য তুলে ধরে বলেন— মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: মূল্যস্ফীতি ৫–৬ শতাংশে নামিয়ে আনা; রাজস্ব সংস্কার: করজাল সম্প্রসারণ, অটোমেশন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা; পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা: আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় উদ্যোগ জোরদার; বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: এসএমই খাতকে অগ্রাধিকার, সহজ ঋণপ্রাপ্তি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন; সামাজিক সুরক্ষা: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানব উন্নয়ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি; ও পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, মূলধন গঠনে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে আরও স্বাধীনতা দেওয়া হবে এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ কমিশন গঠনের কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি করপোরেট বন্ড, সুকুক এবং গ্রিন বন্ড চালুর মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে বহুমাত্রিক ও গতিশীল করা হবে।
অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব প্রবাহের স্বাভাবিক চক্র সক্রিয় রাখার মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের আর্থিক খাত আরও স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

