এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলো ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন। কেউ প্রত্যাশাই করেনি এতোদিন ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ স্থায়ী হবে। যুদ্ধ শুরু হবার পর বিশ্লেষকরা অনুমান করেছেন এই অসম যুদ্ধের স্থায়ীত্ব হবে বড় জোর এক সপ্তাহ।প্রাণহানি হচ্ছে দু’পক্ষের।রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে ইউক্রেনের আবাসিক ও বানিজ্যিক এলাকা ধ্বংস হতে চলেছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে পশ্চিমা বিশ্ব তীব্র প্রতিবাদ জানালেও ইউক্রেনে শান্তি পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসেনি কেউ। তাদের সন্দেরজনক ভূমিকা উদ্বেগের বিষয়।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার কারণ ন্যাটোতে ইউক্রেনের যোগদানের সিদ্ধান্ত। ন্যাটোর সামরিক জোট রাশিয়ায় আক্রমণের মূল কারণ বলে মনে করা হয়। ইউক্রেন ভৌগলিকভাবে রাশিয়ার খুব কাছাকাছি অবস্থিত। একসময় এই দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল।ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় নির্মিত। স্বাধীনতা অর্জনের পর ইউক্রেন একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে কাজ শুরু করে।যার মূল ভিত্তি রাজনৈতিক আদর্শ।
কিন্তু ন্যাটোতে যোগদানের ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ইচ্ছা খুব একটা স্পস্ট ছিলনা। তাদের ন্যাটোতে যোগদানের ফলে রাশিয়াকে অস্বস্থির মধ্যে ফেলে। ইউক্রেনের যোগদানের উদ্দেশ্য যদি উন্নয়ন বিষয়ক হতো, তাহলে রাশিয়ার মাথা ব্যথার কারণ হতোনা।কিন্তু ন্যাটো ইউক্রেনের যোগদানের উদ্দেশ্য সামরিক জোট হবার কারণে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমন করতে বাধ্য হয়।
ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগদানের ইঙ্গিত পাবার পর রাশিয়া ভদ্রোচিতভাব হুমকিও দিয়েছে, ইউক্রেনের অবিবেচক প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এসবের কোন তোয়াক্কাই করেননি। তার মধ্যে রাজনৈতিক দুরদর্শিতার অভাব ছিল।যার মাশুল ইউক্রেনের জনগনকে দিতে হচ্ছে।রাশিয়ার ইউক্রেনের ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্য ছিলনা।শুধু ন্যাটো জোটে যোগদান থেকে ইউক্রেনকে নিবৃত করাই এই আক্রমনের উদ্দেশ্য।সামরিক শক্তির দিক থেকে রাশিয়ার ধারে কাছেও নেই ইউক্রেন। কিন্তু এই অসম যুদ্ধে রাশিয়া যদি হেরেও যায় ইউক্রেনকে আবার মাথা তুলে দাড়াতে সময় লাগবে কমপক্ষে ৫০ বছর।
পশ্চিমা মিডিয়া ক্রমাগত ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরছে। কিন্তু রাশি এ বিষয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া জোরপূর্বক কোন আক্রমণে যাচ্ছেনা।ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করে হয়তো তারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের অগ্রযাত্রা বিলম্বিত করছে। মারিউপোল ও ডনবাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে আক্রমণের সময় কিয়েভকে ঘিরে রেখেছে। কিয়েভও দখল করে নিতে পারতো। কিন্তু তা তারা করেনি।তাদের অপারেশন ঠিলা চাতুর্যে ভরা। ধীরগতির অগ্রযাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি কম হচ্ছে।সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার সুযোগ করে দিয়েছে।ফলে এ পর্যন্ত অর্ধকোটি মানুষ আশেপাশের দেশে আশ্রয় নেবার সুযোগ পেয়েছে।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি পশ্চিমা মিত্রদের কাছে থেকে যুদ্ধে সহায়তা প্রত্যাশা করেছিল, সে রকম সহযোগিতা পাচ্ছেনা। যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রদের কাছে যে সামরিক সহায়তা পাচ্ছে, তা এই যুদ্ধ আরো বিলম্বিত হবার সুযোগ তৈরি করছে, ইউক্রেনীয় জনগনকে আরো বিপর্যস্থ করে তুলবে।
পশ্চিমা দেশগুলোর ভাবা উচিত ছিল, এটি একটি অসব যুদ্ধ। এই যুদ্ধে্ ইউক্রেণ বিজয় লাভ করার কথা ভাবাই যায়না। তাদের উচিত দুইপক্ষের সাথে আলোচনা করে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা। তা না করে তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়াকে বিষিয়ে তুলেছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ইউক্রেনকে উসকে দিয়ে তার মন্তব্যে বলেছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের শক্ত প্রতিরোধের কারণে সহজে এই যুদ্ধের অবসান নাও হতে পারে। যুদ্ধ আগামী ২০২৩ সাল পর্যন্ত হতে পারে। তিনি আবার একথা বলে নিজের স্তুতি করেছেন যে পুতিন বাহিনী অনেক শক্তিধর এবং তিনি বিজয়ী হবার মতো অবস্থানে আছেন। এই পশ্চিমা নেতার এধরনের মন্তব্য বিরল বটে।
দু’বছর ধরে যুদ্ধ চলতে থাকলে ইউক্রেনের অবস্থা কী হতে পারে তা সহজে অনুমেয়। যুদ্ধ শেষে ইউক্রেনকে পুরুজ্জীবিত করতে মিত্রদের ঋণ সহায়তার উপর নির্ভর করতে হবে। যা ইউক্রেনের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। জেলেনস্কিও এক সময় তার ভুলগুলো বুঝতে পারবেন, তখন তার আর কিছুই করার থাকবেনা।
ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই জেলেনস্কি একের পর এক ভুল করে বসলো।যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে তিনি সামরিক সেনাপতির মতো পোশাক পরে সামাজিক মাধ্যমে তার যুদ্ধে সরব উপস্থিতি জানান দেন। যদিওবা তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি। তার স্ত্রীকেও অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে যুদ্ধে অংশগ্রহনের চিত্রে দেখা গেছে।তিনিও সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেননি। তাদের গোপন আস্তানা থেকে জেলেনস্কি দেশের জনগনের ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সের পুরুষদের দেশে থাকতে বলেছেন।এবং তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।দেশের শাসক হয়ে জনগনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবার নির্দেশ একটি মানবিক অপরাধ বটে।ফলে অনেক পরিবার জেলেনস্কির নির্দেশ অমান্য করে যুদ্ধে অংশ না নিয়ে ইউক্রেন ছেড়েছে পরিবারসহ।
পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তিকে ধ্বংস করতে অনেক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে রাশিয়ার উপর। রাশিয়ার গ্যাস বিক্রি বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞা আমলে নেয়নি রাশিয়া। বরং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় করতে অভ্যন্তরীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মনোযোগ দিচ্ছে।
অনেক বহুজাতিক কোম্পানী রাশিয়া ছেড়ে চলে গেলে অনেকে বেকার হয়ে পড়ে। কিন্তু পুতিন সরকার তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে তাদেরকে সরকারী কাজে সম্পৃক্ত করেছে। রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পুতিনের কৌশল।রাশিয়া থেকে গ্যাস করতে উৎসাহিত করতে গ্যাসের দাম কমিয়ে গ্যাস কিনতে বাধ্য করা হয় আমাদানীকারক দেশগুলোকে।
রাশিয়া এবং ইউক্রেন বিশ্বের শীর্ষ শস্য উৎপাদনকারী দেশ।বিশ্বের চাহিদার ৩০ শতাংশ গম এই দুই দেশ সরবরাহ করে থাকে।কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিশ্বের একটি বড় অংশ এখন খাদ্যসংকটে রয়েছে।রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদ্য সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। খাদ্য নিয়ে রাজনীতি তীব্র হয়ে উঠবে। বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ার কিছু দেশ এই সংকটে পড়বে। তখন এসব খাদ্য সংকট মোকাবেলায় পশ্চিমা দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।মানবতার স্বার্থে খাদ্য নিয়ে রাজনীতি থেকে বিরত থাকা উচিত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের উন্নয়নে অবদান রেখে থাকে। কিন্তু এই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের ভূমিকা শান্তি ও মানবাধিকারের জন্য সহায়ক বলে মনে হয়না। শান্তি ও মানবতা প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র ভূমিকা রাখতে পারতো।কিন্ত তা না করে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করবে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।যা ইউক্রেনকে ধ্বংস করার্ পথ করে দেয়া ছাড়া আর কী বা হতে পারে! রাশিয়াকে ঘায়েল করার যুক্তরাষ্ট্রের এই অপকৌশল রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ বিলম্বিত হবে। সেই সাথে বিশ্ব শান্তি বজায় রাখা কঠিনতর হয়ে পড়বে।
পশ্চিমাদেশের সহযোগিতা পেতে জেলেনস্কি প্রচার চালাচ্ছে যে, রাশিয়া আরো কয়েকটি দেশে আগ্রাসন চালাতে পারে।এই অপপ্রচার বিভিন্ন দেশের সমর্থন পাবার কৌশল। তার এই অপপ্রচারে কেউ সাড়া দেয়নি।যুদ্ধ থামাতে রাশিয়ার সাথে আলোচনার প্রস্তাবের পাশাপাশি হুমকি দিতেও পিছপা হননা জেলেনস্কি। আসলে বাস্তবে জেলেনস্কি অত্যন্ত দুর্বল ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। কিন্তু তিনি একটা বিষয় অনুধাবন করছেনা, তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তাকে সব কিছু বিচক্ষণের সাথে সব সামাল দিতে হবে! অন্যথায় তার জন্য অনেক বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।
বিশ্বনেতাদের কর্মকান্ড থেকে অনুমান করা যায় তারা শান্তি ও মানবতার স্বার্থে ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ চায় কিনা! কারণে যুদ্ধ শুরুর দু মাসের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে তাদের কোন বাস্তব উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি।
আমরা প্রত্যাশা করি, এই যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব এগিয়ে আসবে। সারা পৃথিবীর শান্তি ও মানবিক পরিবেশ রক্ষায় দুই দেশকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে এনে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ফিরিয়ে আনতে হবে।পুতিনকেও এই যুদ্ধ বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে বিশ্বশান্তি বজায় রাখার প্রত্যয়ে।একটি শক্তিধর দেশ হিসেবে রাশিয়ার কাছে সেই ভূমিকেই আশা করে শান্তিকামী বিশ্ব।জেলেনস্কি ইউক্রেনের অপরিপক্ক রাষ্ট্র পরিচালক বলে মনে হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তার উগ্র আচরণ ইউক্রেনের জনগনে মৃত্যুকুপে ঠেলে দিয়েছে। এই বিষয়টি তিনি একদিন অনুধাবন করবেন, যখন সব শেষ হয়ে যাবে।
আজ মানবতা কেন ভুলুন্ঠিত! বিশ্ব শান্তির পথে কে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে! খাদ্য সংকট তীব্রতর হলে কে এই অবস্থার জন্য দায়ী? এসব বিষয় নিয়ে বিশ্বনেতাদের বৈঠকে বসতে আজই।
আমরা চাই, বিশ্ব শান্তির জয় হোক, মানবতার জয় হোক, শান্তিময় হোক পুরো বিশ্ব।
লেখক : মিয়া মনসফ, যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

