মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ) : আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে আবারও মুখরিত হয়ে উঠেছে টঙ্গীর তুরাগতীর। চার দিন বিরতি দিয়ে গতকাল শুক্রবার বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে জুমার নামাজে লাখো মুসল্লির ঢল নামে। ইজতেমা প্রাঙ্গণের বিশাল শামিয়ানা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে আশপাশের অন্তত তিন বর্গকিলোমিটার এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
শুধু তাই নয়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও নামাজে দাঁড়িয়ে যান হাজারো মুসল্লি। এর আগে ফজরের নামাজের পর পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম ও তাবলিগ জামাতের মুরব্বি মাওলানা আবদুর রহমানের আমবয়ানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। তার উর্দুভাষার মূল এ বয়ান তাৎক্ষণিকভাবে বাংলায় তর্জমা করে শোনান মাওলানা দেলোয়ার হোসেন ও এহসানুল হক। এবার ইজতেমায় ৩০-৩৫ লাখ মুসল্লি অংশ নিচ্ছেন বলে ধারণা কর্তৃপক্ষের।
বৃহত্তম জুমা : সময় তখন দুপুর ১টা ৩০ মিনিট। খুতবার আজান শুরুর সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ মুসল্লির বিশাল জমায়েত স্তব্ধ হয়ে যায়। কাকরাইল মসজিদের পেশ ইমাম ও তাবলিগ জামাতের বাংলাদেশের জিম্মাদার হাফেজ মোহাম্মদ জুবায়ের হোসেনের ১০ মিনিটের খুতবা ধ্যানমগ্ন হয়ে শ্রবণ করেন মুসল্লিরা। শেষে তারই ইমামতিতে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আদায় করেন পবিত্র জুমার নামাজ।
জুমার নামাজে অংশ নিতে ইজতেমায় যোগ দেওয়া লাখ লাখ মুসল্লি ছাড়াও সকাল থেকেই ঢাকা, গাজীপুর, টঙ্গীসহ আশপাশের এলাকা থেকে দলে দলে মুসল্লিরা ময়দানের দিকে আসতে থাকেন। দুপুর ১২টার দিকে মাঠ উপচে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। মাঠে স্থান না পেয়ে মুসল্লিরা আশপাশের রাস্তা, গলিতে জুমার নামাজে শরিক হন। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় খুতবা শুরুর আগেই। অগণিত মুসল্লি মহাসড়কে দাঁড়িয়ে জুমার নামাজ আদায় করেন।
বিশ্ব ইজতেমার আয়োজক কমিটির মুরব্বি মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, জুমায় কয়েক লাখ মুসল্লি অংশ নিয়েছেন। ১৬০ একর এলাকাজুড়ে নির্মিত চটের প্যান্ডেল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। মূল প্যান্ডেলের বাইরেও নিজ উদ্যোগে শামিয়ানা তৈরি করে নিয়েছেন মুসল্লিরা। ময়দানে স্থান না পেয়ে মুসল্লিরা মহাসড়ক, অলিগলিসহ যে যেখানে পেরেছেন হোগলা, পাটি, চটের বস্তা, খবরের কাগজ, চাদর ও পলিথিন বিছিয়ে জুমার নামাজে শরিক হন।
জুমায় বিশিষ্টজনের অংশগ্রহণ : ইজতেমা ময়দানে বৃহত্তর এই জুমার নামাজে অংশ নেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর জেলা প্রশাসক এসএম আলম, জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ, সিটি মেয়র (ভারপ্রাপ্ত) আসাদুর রহমান কিরণ, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্যাহ খান ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।
আমবয়ান : জুমার নামাজের পর শুরু হয় জরুরি বয়ান। ভারতের খ্যাতিমান বুজুর্গ ও তাবলিগ জামাতের মুরব্বি মাওলানা ইসমাইল হোসেন গোদরাদী জুমার নামাজের পর বয়ানে অংশ নেন। এ সময় উর্দু ভাষার মূল বয়ান তাৎক্ষণিক বাংলায় তর্জমা করেন মাওলানা নুরুর রহমান। আসর ও মাগরিবের পর জরুরি আমবয়ানে অংশ নেন দিল্লির মাওলানা সাদ, মাওলানা এহসানুল হক, মাওলানা ওমর ফারুক।
উর্দু ভাষার মূল বয়ানকে বিদেশি ভাষাভাষি মেহমানদের জন্য বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, আরবি, ফার্সিসহ কয়েকটি ভাষায় তাৎক্ষণিক ভাষান্তর করে শোনানো হয়। ইমান, আমল, আখলাকসহ তাবলিগের ছয় উসুল বা মূলনীতির ওপর তাবলিগের শীর্ষ মুরব্বিদের বয়ান প্রতিদিনই তাৎক্ষণিক ভাষান্তর করে শোনানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
পাঁচস্তরের নিরাপত্তা : ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাঁচস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ।
তিনি জানান, ইজতেমায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ১০ হাজার সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। ময়দানের আশপাশে পুলিশ ও র্যাবের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন এবং পুরো এলাকায় সিসি ক্যামেরা ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বসিয়ে কড়া নজরদারি থাকছে। আকাশপথে র্যাবের নিরাপত্তা হেলিকপ্টার ও তুরাগে স্পিড বোট টহল অব্যাহত রয়েছে।
বিদেশি মেহমান : প্রথম দফায় অংশগ্রহণকারী বিদেশি মেহমানদের অনেকেই ময়দানে রয়ে গেছেন। দ্বিতীয় পর্বে নতুন করে গতকাল পর্যন্ত ১,৮৭০ জন বিদেশি মেহমান ইজতেমায় অংশ নিয়েছেন।
প্রথমবার এসেছিলেন প্রায় ৮ হাজার মুসল্লি। ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিয়ানমার, শাদ, নেপাল, ভুটান, সুদান, ইন্দোনেশিয়া, লিবিয়া, ইতালি, ইরান, ইরাক, নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়াসহ ৯৬টি দেশের মুসল্লিরা এবার ইজতেমায় যোগ দিয়েছেন।
মুসল্লির মৃত্যু : বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে যোগ দিতে আসা আবদুর রহমান (৬২) নামে এক মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে মারা যান তিনি। আবদুর রহমান বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মাঝবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। ইজতেমায় মরদেহের জিম্মাদার মো. আদম আলী জানান, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে নিজ খিত্তায় মারা যান আবদুর রহমান। জুমার পর তার জানাজা হয়।
ইজতেমা ময়দান এক ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন : ইজতেমা এলাকায় গতকাল শুক্রবার সকাল সোয়া ৮টা থেকে ৯টা ১০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মুসল্লিদের নিরাপত্তা কাজে ব্যবহৃত সিসি টিভিসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি অচল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া পানি উত্তোলন বিঘ্নিত হয়।
ইজতেমা পরিচালনা কমিটির মুরব্বি ইঞ্জিনিয়ার মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, ইজতেমা ময়দানের ভেতরে বিশেষ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সচল ছিল বলে সেখানে কোনো সমস্যা হয়নি। গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, সিসিটিভি পরিচালনা সাময়িক বিঘ্নিত হলেও নিরাপত্তার কাজে বড় সমস্যা হয়নি।
ইজতেমা এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে নিয়োজিত ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) টঙ্গী অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, টঙ্গীতে ডেসকো এলাকার টঙ্গী ব্রিজ সংলগ্ন সাব-স্টেশনের বৈদ্যুতিক ইনসুলেটরের ওপর একটি কাক বসার কারণে স্পার্ক করায় সাময়িক বৈদ্যুতিক সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক






