বিশেষ প্রতিবেদক
বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিপুল সংখ্যক উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী নিয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বর্তমান মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব পদমর্যাদার আরও ১৫ জন উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পালন করছেন।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে এখন একইসঙ্গে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা কাজ করায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি বাড়বে নাকি উল্টো সমন্বয়হীনতা তৈরি হবে—তা নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলাদের মতে, এই কাঠামোর ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের প্রভাবই থাকতে পারে। তাদের ভাষ্য, একই মন্ত্রণালয়ে একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স তৈরি হয়, নতুন নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ তৈরি হয় এবং কাজের ত্রুটি দ্রুত নজরে আসে। তবে সমন্বয়ের অভাব দেখা দিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি, দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার সংঘাতও তৈরি হতে পারে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেয়। সরকারের বয়স এখনো মাত্র তিন মাস হওয়ায় পুরো কাঠামোর কার্যকারিতা মূল্যায়নের সময় হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপি সরকার গঠন করায় আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা নেতাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার চাপ ছিল। সেই বাস্তবতা থেকেই মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর সংখ্যা বেড়েছে।
তবে প্রশাসনের ভেতরে ইতোমধ্যে কিছু মন্ত্রণালয়ে সমন্বয় ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ব্যবস্থা আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। প্রত্যাশিত ফল না এলে আগামী বাজেটের পর মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসতে পারে।
উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের বিস্তৃত কাঠামো
বর্তমান সরকারের অধীনে ২০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারী রয়েছেন। মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন— মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ — প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা; নজরুল ইসলাম খান — কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা; মো. রুহুল কবির রিজভী — শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা; মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ — জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা; ও রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর — অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা।
প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন— হুমায়ুন কবির; ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম; ডা. জাহেদ উর রহমান; মাহদী আমিন ও রেহান আসিফ আসাদ। এছাড়া প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে রয়েছেন— বিজন কান্তি সরকার; তানভীর গনি; ও এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
সচিব পদমর্যাদার বিশেষ সহকারী হিসেবে রয়েছেন— ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান; ও ড. মো. সাইমুম পারভেজ।
যেসব মন্ত্রণালয়ে সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এবং উপদেষ্টা এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার রয়েছেন।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তে প্রতিমন্ত্রীকে পাশ কাটিয়ে মন্ত্রী সরাসরি ফাইল নিষ্পত্তি করছেন। আবার সীমিত ক্ষমতার কারণে প্রতিমন্ত্রীও কিছু ক্ষেত্রে সক্রিয় হচ্ছেন না। অন্যদিকে উপদেষ্টাও নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম–এর মধ্যে সমন্বয় ঘাটতির কথাও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
এদিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম এবং উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান—এই তিন স্তরের কাঠামোকে অনেকে অপ্রয়োজনীয় বলছেন, কারণ এটি তুলনামূলক ছোট মন্ত্রণালয়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়েও মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী ও উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান রয়েছেন। সরকারের কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা ও কখনো মন্ত্রীকে দেখা গেলেও প্রতিমন্ত্রীকে খুব কমই দেখা যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, এই কাঠামোর কার্যকারিতা বুঝতে আরও সময় লাগবে।
তিনি বলেন, “একজন থাকলে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ তৈরি হয়। দুজন বা তিনজন থাকলে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স তৈরি হয়। একইসঙ্গে নতুনদের প্রশিক্ষণও হয়।”
তার মতে, সরকারপ্রধানকে রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হয়। দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করা নেতাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করাও একটি বাস্তবতা।
অন্যদিকে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, সব মন্ত্রণালয়ে এই ধরনের বহুমাত্রিক নেতৃত্ব প্রয়োজন নেই।
তার ভাষায়, “কৃষি, স্থানীয় সরকার কিংবা অর্থ মন্ত্রণালয়ে এটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সবখানে নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এটি রাজনৈতিকভাবে অ্যাকোমোডেট করার জন্য করা হয়েছে।”
‘দ্য মিনিস্টারস, মিনিস্টার অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টারস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) আইন, ১৯৭৫’ অনুযায়ী মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বেতন-ভাতা ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা পান।
বর্তমানে— একজন মন্ত্রীর মাসিক বেতন ১ লাখ ৫ হাজার টাকা; ও একজন প্রতিমন্ত্রীর মাসিক বেতন ৯২ হাজার টাকা। এই বেতনের ওপর আয়কর প্রযোজ্য নয়।
মন্ত্রীদের জন্য রয়েছে— দৈনিক ভাতা ২ হাজার টাকা; নিয়ামক ভাতা মাসিক ১০ হাজার টাকা; স্বেচ্ছাধীন তহবিল ১০ লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন কেনার জন্য ৭৫ হাজার টাকা। এছাড়াও সরকারি বাসভবন বা বাড়িভাড়া, সরকারি গাড়ি ও নিরাপত্তা সুবিধা, ও পরিবারসহ ভ্রমণ ব্যয়। এর বাইরে তারা পান একজন একান্ত সচিব, সহকারী একান্ত সচিব ও অন্যান্য জনবল সুবিধা।
প্রতিমন্ত্রীরা পান— দৈনিক ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা; নিয়ামক ভাতা ৭ হাজার ৫০০ টাকা; স্বেচ্ছাধীন তহবিল সাড়ে ৭ লাখ টাকা; সরকারি বাসভবন বা বাড়িভাড়া; ও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত সহায়ক সুবিধা।
সব মিলিয়ে, বর্তমান সরকারের বড় মন্ত্রিসভা ও বিস্তৃত উপদেষ্টা কাঠামো একদিকে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক দক্ষতা ও সমন্বয় সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। এখন দেখার বিষয়, এই কাঠামো শেষ পর্যন্ত সরকারের কার্যক্রমে গতি আনে, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

