বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎস—পণ্য রফতানি ও প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)—গত এক বছরে বিপরীতমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলেও রফতানি আয়ের উল্লেখযোগ্য পতনের কারণে সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে রফতানি ও রেমিট্যান্স মিলিয়ে দেশে এসেছে প্রায় ৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে রফতানি আয় ৪৮ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিট্যান্স ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
এর আগের বছর একই সময়ে মোট বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ছিল প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে রফতানি আয় ছিল ৫৫ বিলিয়ন এবং রেমিট্যান্স ৩০ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন ডলার বাড়লেও রফতানি আয় কমেছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার। এতে মোট প্রবাহে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।
রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দেশে প্রায় ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবাহ প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ পথে অর্থ প্রেরণে প্রবাসীদের আগ্রহ বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার সমন্বয় এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের সুবিধা সম্প্রসারণের ফলে রেমিট্যান্সে এই প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে কিছুটা স্বস্তি আনছে, তবে রফতানি আয়ের বড় পতন সেই স্বস্তিকে সীমিত করে দিচ্ছে।
রফতানিতে টানা পতন
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দেশের রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।
এ নিয়ে টানা আট মাস ধরে রফতানি আয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই–মার্চ) মোট রফতানি আয় হয়েছে ৩৫.৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম।
পোশাক খাতে চাপ
দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে এই খাতেও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য ধাক্কা লেগেছে।
২০২৫ সালের মার্চে তৈরি পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে দাঁড়িয়েছে ২.৭৮ বিলিয়ন ডলারে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নিটওয়্যার রফতানি কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রফতানি কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা হ্রাস এবং ক্রয়াদেশ কমে যাওয়াই এ পতনের প্রধান কারণ।
বৈশ্বিক ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব
রফতানিকারকদের মতে, ইউরোপীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশের কম দামে পণ্য সরবরাহ, বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে এবং শিল্পকারখানায় সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
নীতিগত সহায়তার দাবি
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় রফতানিকারকরা সরকারের কাছে কিছু জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার, উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা।
সামনের চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদদের মতে, রফতানি ও রেমিট্যান্স—এই দুই খাত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান ভিত্তি। তবে বর্তমানে এই দুই উৎসের অসম প্রবণতা অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, রফতানি বাজার বৈচিত্র্য করা, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা না গেলে রফতানি আয়ের নিম্নমুখী ধারা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

