এমএনএ অর্থনীতি ডেস্ক : করোনার ধাক্কা বেশ ভালোভাবেই সামলে উঠেছে দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প। বছরখানেক আগেও যেখানে পোশাক রফতানি একেবারে তলানিতে নেমেছিল, সেখানে এখন রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৩২ শতাংশের ওপরে। এই অবস্থার মধ্যে এক মাসেই বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ২৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বিজিএমইএ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, করোনার প্রকোপ কমে আসায় বিশ্ববাজার থেকে প্রচুর রফতানি আদেশ আসছে দেশে। কারখানাগুলোয় কাজ চলছে পুরোদমে। কার্যাদেশ এভাবে আসতে থাকলে পোশাক রফতানি আরও বাড়বে বলেও জানিয়েছেন তারা।
এদিকে পোশাক রফতানি বাড়লেও লাভের মুখ দেখতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি সুতার অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে লাভ দূরের কথা অনেক ক্ষেত্রে লোকসান দিয়েই কারখানা চালাতে হচ্ছে শিল্প মালিকদের।
এমনটিই জানালেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতির পেছনে প্রধান কারণ মূলত দুটি। প্রথমত করোনা মহামারির মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ বৃহৎ চেইন শপ বন্ধ ছিল। ফলে তাদের শোরুমগুলো একরকম পোশাক শূন্য ছিল। করোনার প্রকোপ কমে আসায় শোরুম পুরোদমে খোলা হয়েছে। খালি শোরুমগুলো এখন পোশাকে ভরতে ব্যস্ত চেইন শপ মালিকরা। ফলে পোশাকের চাহিদা বেড়েছে প্রচুর। দ্বিতীয়ত, নানা কারণে চীনে পোশাকের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে অনেক খানি। একইভাবে চীন থেকে পর্যাপ্ত কাঁচামাল না পাওয়ায় ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াতেও উৎপাদন কমেছে। এই তিন বৃহৎ বাজারে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে বাজারে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। এ জন্যই মূলত পোশাক রফতানি বাড়ছে। তবে পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হতো এবং এর সুফল মালিক-শ্রমিক উভয়েই পেত। সুতা ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সে সুফল মিলছে না।
ইপবি সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছর ২০২০-২০২১ জুলাই-নভেম্বরের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর মাসে পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধি ২২.৯ শতাংশ। আবার সদ্য শেষ হওয়া নভেম্বর মাসে পোশাক রফতানি মোট প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩২.৩৪ শতাংশ। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতে প্রবৃদ্ধি ৩৩.০৫ শতাংশ এবং ওভেন খাতে প্রবৃদ্ধি ৩১.৪৮ শতাংশ।
নভেম্বর মাসের রফতানি আয়ের দিকে তাকালে দেখা যায় এ সময়ে ৩.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পোশাক রফতানি হয়েছে, অর্থাৎ ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। টাকার অঙ্কে নভেম্বরে পোশাক রফতানিতে আয় হয়েছে সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা (এক ডলার= ৮৫ টাকার হিসাবে)। ২০২০ সালের নভেম্বরে রফতানির পরিমাণ ছিল ২.৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১ সালের অক্টোবরে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি হয়েছিল।
তবে এ প্রবৃদ্ধিতেও সন্তুষ্ট হতে পারছেন না পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। এ বিষয়ে বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম সময়ের আলোকে বলেন, টেক্সটাইল, ডাইস ও রাসায়নিকসহ অন্যান্য কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। ফ্রেইট খরচ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এটা স্পষ্ট যে রফতানি মূল্যের যে আপাতত বৃদ্ধি হয়েছে তা মূলত কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধিজনিত ব্যয়কে সমন্বয় করেছে। সুতরাং যে রফতানি প্রবৃদ্ধি আমরা দেখতে পাচ্ছি তা কোনোভাবেই প্রকৃত প্রবৃদ্ধি নয়।
তিনি আরও বলেন, যদিও বা বিগত কয়েক মাসে রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে এটি ভুলে গেলে চলবে না যে আমাদের কারখানাগুলো অতিমারির ক্ষয়ক্ষতি এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ওমিক্রন নামক নতুন ভ্যারিয়েন্টের আগমনে বৈশ্বিক অর্থনীতি ইতোমধ্যেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। করোনার প্রথম ঢেউ থেকেই ক্রেতারা সতর্ক পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে, এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কড়াকড়ি আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো তাদের খুচরা বাজারের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বেশ ভালো সময় নেবে, যা আমাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। গত বছরের মতো এই বছরেও বড়দিনের বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হলে কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন চালিয়ে নিতে হুমকির মধ্যে পড়বে।
গত তিন মাসের প্রবৃদ্ধির ধারা ইতিবাচক হলেও এই প্রবৃদ্ধি স্থায়ী নাও হতে পারে। কারণ কোভিডজনিত লকডাউন শিথিল করার কারণে বিগত মাসগুলোয় পোশাকের ব্যবহার ও চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওমিক্রনের প্রকোপ বাড়লে সে অবস্থা নাও থাকতে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

