Don't Miss
Home / নগর-মহানগর / কোরবানির ঈদ সামনে: সীমান্তে চোরাই পশুর নির্মম বাণিজ্য, ক্ষতবিক্ষত গরু-মহিষ ঢুকছে দেশে

কোরবানির ঈদ সামনে: সীমান্তে চোরাই পশুর নির্মম বাণিজ্য, ক্ষতবিক্ষত গরু-মহিষ ঢুকছে দেশে

এমএনএ প্রতিবেদক

কোরবানির ঈদ যত ঘনিয়ে আসে, ততই সক্রিয় হয়ে ওঠে সীমান্তজুড়ে চোরাই পশুর অবৈধ বাণিজ্য। ভারত থেকে বাংলাদেশে চোরাই পথে আনা গরু ও মহিষের এই যাত্রা শুধু অবৈধই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে চরম অমানবিকতার শিকার হয় পশুগুলো। সীমান্তের বিভিন্ন রুটে নদী সাঁতরে, কাঁটাতারের নিচ দিয়ে বা ওপর দিয়ে পশু পার করার পাশাপাশি সিলেটের পাহাড়ি সীমান্তে চালু রয়েছে আরও ভয়ংকর এক পদ্ধতি—পশুর চার পা বেঁধে উঁচু টিলা বা পাহাড়ের চূড়া থেকে বাংলাদেশের দিকে গড়িয়ে দেওয়া।

এভাবে সীমান্ত পার করার সময় অনেক পশুই গুরুতর আহত হয়, পা ভেঙে যায়, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে বলে জানা গেছে। আহত পশুগুলোর শরীরে নানা ধরনের ক্ষত ও ত্রুটি দেখা যায়, যা পরে বাজারে তোলার আগে সাময়িকভাবে চিকিৎসা দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।

সম্প্রতি রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য জানা গেছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যাপারী জানান, ভারতীয় মুররা জাতের কয়েকটি মহিষ সিলেট সীমান্ত দিয়ে দুই দিন আগে দেশে আনা হয়েছে। পশুগুলোর শরীরে ক্ষতের দাগ স্পষ্ট ছিল। কোমর, পিঠ, গলা, হাঁটু এবং শিংয়ের গোড়ায় চামড়া উঠে গেছে। চোখেমুখে ক্লান্তি ও যন্ত্রণার ছাপ ছিল স্পষ্ট।

ওই ব্যবসায়ীর ভাষ্য, “পশুগুলোর চার পা শক্ত করে বেঁধে টিলার ওপর থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে গড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এতে প্রায়ই পশু আহত হয়, অনেক সময় পা ভেঙে যায় বা মারা যায়। মরলে টাকা দিতে হয় না, কিন্তু আহত হলেও দাম দিতে হয়। তাই যেভাবেই হোক এপারের চোরাকারবারিরা তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করে।”

তিনি আরও বলেন, ঈদের বাজার ধরতেই দ্রুত এসব পশু হাটে তোলা হয়েছে। “ওষুধ আর মলম দিলে কয়েকদিনেই ঠিক হয়ে যাবে”—বলেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ঈদকে কেন্দ্র করে সীমান্তে এই চোরাচালান বাড়লেও সারা বছরই বিভিন্ন সীমান্তপথে এমন অবৈধ বাণিজ্য চলে। সিলেট ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও ঘুষের বিনিময়ে পশু চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশীয় খামারিরা লোকসানের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে প্রাণী নির্যাতনেরও ভয়াবহ চিত্র সামনে আসছে।

প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের নির্যাতনের শিকার পশু শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও চরম আঘাতপ্রাপ্ত হয়। অনেক সময় বাহ্যিক ক্ষত শুকিয়ে গেলেও অভ্যন্তরীণ জখম দীর্ঘস্থায়ী হয়। অবৈধ পরিবহন, মারধর, ক্ষুধা ও আতঙ্ক একসঙ্গে পশুগুলোর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের চোরাচালান শুধু আইন ভঙ্গ নয়, এটি প্রাণী নির্যাতনেরও জঘন্য উদাহরণ। সীমান্ত নজরদারি জোরদার, অবৈধ পশু পরিবহন রোধে যৌথ উদ্যোগ এবং পশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ খামার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

ইসলামিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রুটিযুক্ত বা গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত পশু কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে শিং ভাঙা বা চলাচলে অক্ষম পশু কোরবানি শরিয়তসম্মত নয় বলে তারা উল্লেখ করেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে কোরবানিযোগ্য পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দেশীয় উৎপাদন দেশের চাহিদা পূরণে সক্ষম। তিনি বলেন, দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা ও জাতীয় স্বার্থে অবৈধভাবে পাচার বা চোরাই পথে আসা পশু ক্রয়ের বিষয়ে জনগণকে সচেতন হতে হবে।

অন্যদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, অবৈধভাবে আসা পশু কিনে কোরবানি দেওয়া কতটা সমীচীন—এ বিষয়ে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি প্রয়োজন। তিনি বলেন, কোরবানির পশু ক্রয় ও ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা বৃদ্ধি, দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা এবং চামড়া সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

তিনি আরও বলেন, দেশে কোরবানির পশুর চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি থাকা সত্ত্বেও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অবৈধ বা চোরাই পথে পশু প্রবেশের ঘটনা ঘটছে। দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় জনগণকে অবৈধভাবে আসা পশু বর্জনের আহ্বান জানান তিনি।

x

Check Also

একই মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা: গতি বাড়াবে নাকি সমন্বয় সংকট সৃষ্টি করবে?

বিশেষ প্রতিবেদক বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিপুল সংখ্যক ...