খালেদা জিয়ার অবর্তমানে বিএনপি যেভাবে চলবে
Posted by: News Desk
February 8, 2018
এমএনএ রিপোর্ট : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে যাওয়ায় তাঁর অবর্তমানে দলটি কিভাবে চলবে তা নিয়ে বিএনপির ভেতরে-বাইরে চলছে ব্যাপক জল্পনা কল্পনা। এ ব্যাপারে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে দল পরিচালনায় তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা।
আজ বৃহস্পতিবার বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার পর তাকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়েছে। তারেক রহমানকে ১০ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ অবস্থায় দল কার নেতৃত্বে কীভাবে চলবে- সেই বিষয় নিয়েই বিএনপির ভেতর-বাইরে চলছে নানা আলোচনা। বিএনপি প্রধানের অনুপস্থিতিতে দলে ফাটল ধরার শঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না দলের নীতিনির্ধারকরা। সাম্প্রতিক সময়ে বেগম জিয়া নিজেই একাধিকবার বৈঠকে দলের মধ্যে ঐক্যের গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে এ-ও বলেন, ‘বেইমানদের আর দলে ঠাঁই নয়।’
বিএনপির প্রধান দুই ব্যক্তির একজন কারাগারে অন্যজন বিদেশে অবস্থান করায় দল কীভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলছে। সম্প্রতি এ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনাও হয়েছে। দলটি বলছে, আগামী কয়েক সপ্তাহ দলের করণীয় চেয়ারপারসন নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলে নতুন নীতি গ্রহণের প্রয়োজন হবে না।
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারপারসনের সাময়িক অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানই ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। দলের নেতৃত্বের প্রশ্নে বিএনপি নেতাকর্মীরা গঠনতন্ত্রের ৭ ধারার (গ) (২) উপধারা সামনে আনেন। সেখানে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ”চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে তিনিই (সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান) ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে চেয়ারম্যানের সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন।” তবে দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখান থেকে তার দল পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
জানা যায়, তারপরও দল পরিচালনায় সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানেরই দিকনির্দেশনা থাকবে। তা ছাড়া কারান্তরীণ বিএনপি চেয়ারপারসনও সেখান থেকে দিকনির্দেশনা দেবেন। দুই শীর্ষ নেতার দিকনির্দেশনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটি দল পরিচালনা করবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা ও পরামর্শে দল চলবে। তিনি দলের দ্বিতীয় ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। এজন্য তারেকের দেশে ফেরার দরকার আছে কি না জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, না এজন্য তাঁর দেশে ফেরার দরকার নেই। ওখান থেকেই নির্দেশনা দিতে পারবেন।
একই কথা বলছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দীন আহমেদ। তিনি বলেছেন, তারেকের পরামর্শে দলের স্থায়ী কমিটি দল পরিচালনা করবেন। কোনো সমস্যা হবে না।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, তারা আশা করছেন খালেদা জিয়া শিগগিরই জামিনে মুক্তি পাবেন। এরপর সবকিছু তাঁর নির্দেশেই পরিচালিত হবে। এই সময়ে তারেক দূর থেকে মূল দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তারেকের বক্তব্য প্রচারে হাইকোর্টের বিধিনিষেধ থাকায় তাঁর পক্ষে সরাসরি কিছু করা সম্ভব হবে না। খালেদা জিয়া জামিনে মুক্ত হওয়া পর্যন্ত বিএনপির মূল পরামর্শক থাকবেন তিনি। তাঁর পরামর্শই বাস্তবায়ন করবে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।
এই সময়ে সংগঠন পরিচালনায় সব কাজ সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনিই দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মসূচি পালন করবেন। মাঠপর্যায়ে নির্দেশনাসহ সব কাজ করবেন। তবে নীতি নির্ধারণী কোনো বিষয়ে মির্জা ফখরুল একক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। এ জন্য তাঁকে বর্তমান স্থায়ী কমিটির নেতাদের ওপর নির্ভর করতে হবে।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ স্থায়ী কমিটির নয় সদস্য। অন্য আট সদস্য হলেন মওদুদ আহমদ, মাহবুবুর রহমান, তরিকুল ইসলাম, জমিরউদ্দীন সরকার, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৫(গ) ধারায় সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানকে দ্বিতীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তির মর্যাদা দিয়েছে। চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান স্থায়ী কমিটি, নির্বাহী কমিটির সভা ডাকাসহ চেয়ারপারসনের অন্য সব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দল পরিচালনায় এই দুজন ছাড়া অন্যদের কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কেননা এ দুজনের বাইরে কেউই দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠক ডাকতে পারেন না। আর এ বৈঠক না হলে কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন পায় না।
স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও দল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা নানা বিষয়ে পরামর্শ দেবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। শীর্ষ দুই নেতার দিকনির্দেশনা ও স্থায়ী কমিটির পরামর্শে তৃণমূলে দলের সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগেও খালেদা জিয়ার লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশে সফরে বিএনপি মহাসচিব সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ নিয়ে দল পরিচালনা করেন।
জানা যায়, বিএনপির নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশই চেয়েছিলেন, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তারই পুত্রবধূ ডা. জোবায়দা রহমান দলের হাল ধরুক। কিন্তু দলের একটি অংশ এ-ও শঙ্কা প্রকাশ করছেন, প্রতিহিংসার রাজনীতির মুখোমুখি হয়ে ক্লিন ইমেজ থাকা ডা. জোবায়দা রহমানও মামলা-হামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে লন্ডনে চিকিৎসাধীন তারেক রহমানকে দেখাশোনা করাও তার কঠিন হয়ে পড়বে। সামগ্রিক বিবেচনায় জোবায়দা রহমানের এখন দেশে না ফেরাই ভালো বলে মনে করেন তারা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, ‘বেগম জিয়া জেলে গেলেও কার্যত তার নির্দেশনায় দল চলবে। সুতরাং দল পরিচালনায় কোনো সমস্যা হবে না। তা ছাড়া লন্ডনে আমাদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকনির্দেশনাও থাকবে। স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ দলের চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সবাই দল পরিচালনায় সহযোগিতা করবে। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।’
খালেদা জিয়ার চলবে অবর্তমানে বিএনপি যেভাবে 2018-02-08