শিক্ষাঙ্গন প্রতিবেদক
দেশের মাধ্যমিক স্তরের ‘ইতিহাস’ ও ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ (বিজিএস) বইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে চলমান এই পরিমার্জনে প্রথমবারের মতো বিস্তারিতভাবে যুক্ত করা হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া-র ১৯৯০-পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার অবদান এবং ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে তার রাজনৈতিক পরিচয়।
এনসিটিবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত, বিতর্কিত বা আংশিকভাবে উপস্থাপিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক অধ্যায়কে নতুনভাবে মূল্যায়নের অংশ হিসেবেই এই সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে দেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পর্কে আরও বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অধ্যায় আলাদাভাবে যুক্ত হচ্ছে
নতুন পাঠ্যবইয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিভিন্ন পর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়া-র ভূমিকা শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে এ সংক্রান্ত বিষয়বস্তু প্রণয়ন ও সম্পাদনার কাজ চলছে। সেখানে তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে যে রাজনৈতিক পরিচয়ে দীর্ঘদিন উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই বিষয়টিও পাঠ্যবইয়ের আলাদা অংশ হিসেবে স্থান পাবে।
৭ নভেম্বর ও ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানও যুক্ত হচ্ছে
নতুন পাঠ্যক্রমে স্থান পাচ্ছে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’-এর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট। দীর্ঘদিন পাঠ্যসূচির বাইরে থাকা এই অধ্যায়কে এবার নতুনভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানও নতুন বইয়ে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। আন্দোলনের পটভূমি, অংশগ্রহণ, গণদাবি এবং এর প্রভাবকে সমসাময়িক ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইতিহাস বইয়ে যুক্ত হচ্ছে বিশেষ জীবনী অধ্যায়
পাঠ্যবইয়ে নতুন একটি বিশেষ অধ্যায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে ১০ থেকে ১২ জন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের জীবনী ও অবদান তুলে ধরা হবে। তালিকায় প্রাচীন বাংলার পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট গোপাল থেকে শুরু করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে।
এছাড়া এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহসহ আরও কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের অবদানও পাঠ্যবইয়ে স্থান পাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইলিয়াস শাহী আমল থেকে আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশ পর্যন্ত ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এসব ব্যক্তিত্বকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
‘লার্নিং জয়’ ধারণায় সহজ হচ্ছে পাঠ্যবই
শুধু নতুন তথ্য সংযোজন নয়, পাঠ্যবইয়ের ভাষা ও উপস্থাপনেও বড় পরিবর্তন আনছে এনসিটিবি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বইয়ের অনেক বিষয় শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশের তুলনায় অতিরিক্ত জটিল হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে এবং বইভিত্তিক শিক্ষা চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এ কারণে নতুন শিক্ষাক্রমে ‘লার্নিং জয়’ বা আনন্দময় শিক্ষার ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে সহজবোধ্য, প্রাণবন্ত ও বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে টিচার্স গাইড, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পাঠ উপস্থাপনেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনসিটিবির বক্তব্য
সার্বিক বিষয়ে ড. এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ের ‘ইতিহাস’ এবং ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের পরিমার্জনের কাজ পুরোদমে চলছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই কাজ শেষ করে জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় শিক্ষাকে আরও আনন্দময় ও সহজবোধ্য করতে কাজ করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় কাঠিন্য কমিয়ে এমন বই তৈরি করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা চাপের মধ্যে না পড়ে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে।
বিশ্লেষকদের মত
শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও, পাঠ্যবইয়ে কোনো রাজনৈতিক পক্ষের ভাষ্য যেন এককভাবে প্রাধান্য না পায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের সামনে গবেষণালব্ধ, তথ্যনির্ভর ও বহুমাত্রিক ইতিহাস তুলে ধরা হলে সেটিই হবে প্রকৃত অর্থে বস্তুনিষ্ঠ শিক্ষা।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পাঠ্যবইয়ে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ঘটনাকে সীমিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ফলে নতুন এই সংযোজন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বোঝার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

