রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি : চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুরের শিবনগর এলাকায় জঙ্গি আস্তানা সন্দেহভাজন জঙ্গিদের একটি আস্তানা সকাল থেকে ঘিরে রাখার পর সন্ধ্যায় চূড়ান্ত অভিযান ‘অপারেশন ঈগল হান্ট’ শুরু হয়েছে।
আজ বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে সোয়াত টিমসহ আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা এ অভিযান শুরু করে।
এর পর সেখানে মুহুর্মুহু গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।
বিকালে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসার পর উপজেলার শিবনগর-ত্রিমোহনী গ্রামে আমবাগান ঘেরা ওই বাড়ির কাছে পৌঁছান সোয়াত সদস্যরা। আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিল কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার টিএম মুজাহিদুল ইসলাম জানান, এই অভিযানের নাম দেয়া হয়েছে ‘অপারেশন ঈগল হান্ট’।
অভিযানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দুপুরে শিবগঞ্জ ও নাচোল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুটি অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি এনে রাখা হয় ঘটনাস্থলের কাছে। সকালেই ওই এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। রাতে অভিযান চালানোর জন্য এনে রাখা হয় জেনারেটর।

সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে আজ সকাল ছয়টা থেকে ত্রিমোহনী শিবনগর ও আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় ১৪৪ ধারা বজায় থাকবে। বিষয়টি এলাকায় মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সোয়াতবাহিনী জঙ্গি সন্দেহে জিম্মি আবু মোল্লার মাকে ওই বাড়িতে থাকা দু’টি শিশু উদ্ধারের জন্য ভিতরে পাঠায়। কিন্তু আবু মোল্লা ও তার স্ত্রী শিশু দু’টিকে ফেরত দেয়নি। আবুর মা ফিরে আসার পর অভিযান শুরু করে সোয়াত। ঘটনাস্থলে বর্তমানে কাউন্টার টেরোরিজম, পুলিশসহ প্রশাসনের বিভিন্ন সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
আজ বুধবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে উপজেলার শিবনগর-ত্রিমোহনী গ্রামে সাইদুর রহমান ওরফে জেন্টু বিশ্বাসের মালিকানাধীন ওই বাড়িটি ঘিরে ফেলেন স্থানীয় পুলিশ ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা। একপর্যায়ে বাড়ি থেকে গ্রেনেড ও গুলি ছোড়া হয় বলে দাবি করে পুলিশ।
গোমস্তাপুর সার্কেলের এএসপি মাইনুল ইসলাম জানান, একতলা ওই বাড়িতে রফিকুল আলম আবু (৩০) নামের এক ব্যক্তি এবং তার স্ত্রী-সন্তানসহ চারজন থাকে বলে তাদের কাছে প্রাথমিক তথ্য রয়েছে।
কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, ঘিরে রাখা বাড়িটির মালিক সাইদুর রহমান ওরফে জেন্টু বিশ্বাস।
সাইদুরের ছেলে আনারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁদের বাড়িটি ফাঁকা পড়েছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে পরিবার নিয়ে বাড়িটিতে ওঠেন আবু। ভাড়ার বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো চুক্তি হয়নি।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ত্রিমোহনী শিবনগর গ্রামেরই বাসিন্দা আবু। ঘিরে রাখা বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে তাঁদের বাড়ি। তাঁর বাবা আফসার আলী। মা ফুলসানা বেগম।
মা ফুলসানা বেগমের ভাষ্য, তাঁদের সঙ্গে আবু ও তাঁর স্ত্রী সুমাইয়া খাতুনের বনিবনা হচ্ছিল না। এ কারণে আবু পরিবার নিয়ে বাড়ি ছাড়েন।
ফুলসানা বেগম জানান, প্রায় আট বছর আগে সুমাইয়ার সঙ্গে আবুর বিয়ে হয়। আবু হাটে-বাজারে মসলা বিক্রি করতেন। ত্রিমোহনী বাজারে তাঁর একটা দোকানও আছে।
ফুলসানা বেগমের ভাষ্য, তাঁদের সঙ্গে আবু ও তাঁর স্ত্রীর সম্পর্ক ভালো ছিল না। আবুর চলাফেরা ও ধর্মীয় রীতিনীতি পালন নিয়ে বাবা আফসারের সঙ্গে মতবিরোধ চলছিল। একপর্যায়ে আবু শিবগঞ্জের আব্বাস বাজার এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে ওঠেন। আবু সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করতেন।
স্থানীয় কয়েক ব্যক্তির ভাষ্য, আবু ত্রিমোহনী আলিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছেন। স্থানীয় ৮-১০ জন ব্যক্তির সঙ্গে চলাফেরা করতেন তিনি। অন্যদের সঙ্গে তেমন মিশতেন না। তাঁরা আলাদাভাবে নামাজ পড়তেন। তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে মাহফুজুর রহমান ওরফে মোহন (২৮) ও আবদুস সালাম (৩৫) নামের দুজনকে গতকাল মঙ্গলবার রাতে শিবনগর এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ। তবে তাঁদের আটক করার বিষয়ে পুলিশ কিছু বলেনি।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, সাইদুরের বাড়িতে ওঠার কিছুদিন আগে শ্বশুরবাড়ি থেকে নিজেদের বাড়িতে আসেন আবু। কিন্তু বাবার সঙ্গে ফের বিরোধ দেখা দেওয়ায় সাইদুরের বাড়িতে ওঠেন।
সাইদুরের ছেলে আনারুল বলেন, এলাকার ছেলে হিসেবে আবুকে বাড়িটি ভাড়া দেন তাঁরা। আজ ভোররাতে বাড়িটি ঘিরে ফেলে পুলিশ।
শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুল ইসলাম বলেন, বাড়ির ভেতর থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে। জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিযানে থাকা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঘিরে রাখা বাড়িতে আবু, তাঁর স্ত্রী, দুই শিশুসন্তান আছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। ভেতরে আরও দুজন থাকতে পারেন। বাড়িটি ঘিরে ফেলার পর পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছুড়েছে।
কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ওই কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াত ঘটনাস্থলে আসার পর চূড়ান্ত অভিযান শুরু হবে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

