এমএনএ বিনোদন ডেস্ক : চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন কিংবদন্তি অভিনেতা বাংলা চলচ্চিত্রের দিকপাল, মুকুটহীন সম্রাট নায়করাজ রাজ্জাক।
আজ বুধবার সকাল সোয়া ১০টা ২০ মিনিটে রাজধানীর বনানী বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
দাফনের সময় রাজ্জাকের তিন ছেলে বাপ্পারাজ, বাপ্পি ও সম্রাট, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-বন্ধু আর চলচ্চিত্র অঙ্গনের কলা-কুশলীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় চোখের জলে সবাই চলচ্চিত্রের এই প্রাণ-পুরুষকে সমাহিত করেন।
এর আগে দু’দফায় জানাজা শেষে গতকাল মঙ্গলবার তাকে দাফন করার কথা থাকলেও নায়করাজের মেজ ছেলে বাপ্পি কানাডা থেকে দেশে ফিরতে দেরি করায় দাফন করা হয়নি। আজ ভোরেই বাপ্পি দেশে ফিরেছেন।
রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে এ কিংবদন্তি অভিনেতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেখান থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকালে তার মরদেহ শেষবারের মতো নিয়ে যাওয়া হয় গুলশানের বাসভবন ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’-তে। মরদেহ সেখানে পৌঁছতেই স্বজনদের কান্না-আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে আশপাশ। সেখান থেকে বেলা ১১টায় মরদেহ নিয়ে আসা হয় তার প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে।
শেষবারের মতো নায়করাজের এফডিসিতে আগমনে শোকার্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আগত শিল্পী-কলা-কুশলীরা ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে ওঠেন।

এফডিসিতে লাশবাহী গাড়ি খোলা রেখেই শেষবারের মতো সবাই দেখেন নায়করাজকে। এরপর একে একে শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ। তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, চলচ্চিত্র পরিবার, সিনেম্যাক্স মুভি পরিবার, আওয়ামী সাংস্কৃতিক লীগ, বাংলাদেশ ফিল্ম ক্লাব, চলচ্চিত্র গ্রাহক সংস্থা, চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি, সিনে স্থিরচিত্রগ্রাহক সমিতি, জাসাসসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। ব্যক্তিগতভাবে রাজ্জাককে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, অভিনেতা আলমগীর, চিত্রনায়িকা সারাহ বেগম কবরী, সুচন্দা, ববিতা, চম্পা, শাবনূর, চিত্রনায়ক শাকিব খান, ফেরদৌস, আমিন খান, রুবেল, আহমেদ শরীফ, ওমর সানি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি অভিনেতা মিশা সওদাগর, চলচ্চিত্র পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবর, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ, চলচ্চিত্র পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম প্রমুখ। শ্রদ্ধা জানানোর পর সেখানেই তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে তার সহকর্মীদের শ্রদ্ধা নিবেদন ও প্রথম জানাজা শেষে এফডিসি থেকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয় রাজ্জাকের মরদেহ। তার অনেক আগেই সেখানে আসতে শুরু করেন রাজ্জাকের ভক্ত-অনুরাগীরা। হাজার হাজার মানুষ ফুল হাতে অপেক্ষা করতে থাকেন তাদের প্রিয় অভিনেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।
সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা শেষে গুলশানের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় তার মরদেহ। সেখান স্বজনরা আরেকবার দেখার পর গুলশানের আজাদ মসজিদে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে আবারও তার লাশ রাখা হয় ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘরে। তার মেজ ছেলে বাপ্পির জন্য অপেক্ষা করা হয়।
আজ বুধবার তার ছেলে কানাডা থেকে দেশে ফেরার পর সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে বনানী কবরস্থানে রাজ্জাকের দাফন সম্পন্ন হয়।
- নায়করাজ রাজ্জাককে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর অপেক্ষায় জনমদুদ্রে রূপ নেয়া সর্বসাধারণ।
- নায়করাজ রাজ্জাককে শেষ শ্রদ্ধা জানান সর্বসাধারণ।
- শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় জমিয়েছেন শিল্পী, কলা-কুশলীসহ রাজ্জাক ভক্তরা।
- শহীদ মিনারে সর্ব সাধারণের শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।
- এফডিসি থেকে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য নায়করাজের লাশ এ্যাম্বুলেন্সে করে নেয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।
- নায়করাজের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় তার কর্মস্থল এফডিসিতে।
- বাংলা সিনেমার সর্বাধিক জনপ্রিয় এই অভিনেতা ছিলেন সদা ব্যক্তিত্বপূর্ণ।
- কালজয়ী অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক।
দেশের চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি অভিনেতার মৃত্যুতে শোকাহত ভক্ত-অনুরাগী ও সহকর্মীরা। রাজ্জাকের মৃত্যুতে তিন দিনের শোক পালন করছে এফডিসি।
নায়ক আবদুর রাজ্জাক ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি ভারতের কলকাতার টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ওখানেই তার বেড়ে ওঠা। স্কুল জীবনে থাকা অবস্থায় তার অভিনয়ের হাতেখড়ি। শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা স্কুলের মঞ্চনাটক বিদ্রোহীতে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই নায়ক রাজের অভিনয়ে সম্পৃক্ততা। পাকিস্তানেও তিনি অভিনয় নিয়ে কাজ করেছেন।
দেশভাগের পরে ১৯৬৪ সালে সেইসময়ের পূর্বপাকিস্তানে চলে আসেন সপরিবারে। টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ নামের একটি নাটকে অভিনয় করে দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেন। সিনেমায় অভিনয়ের আগে সহকারী পরিচালনা করেছিলেন আবদুল জব্বার খানের অধীনে।
দমফাঁটানো হাসির সিনেমা ফেকু ওস্তাগড় লেন সিনেমায় ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করে সবার নজর কাড়েন। এরপর কার বউ, ডাক বাবু, আখেরী স্টেশন-সহ আরও বেশ ক’টি ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ও করে ফেলেন। এরপর ১৯৬৬ সালে বেহুলা চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ঢাকাই ছবিতে সদর্পে উপস্থিত হন দর্শকনন্দিত এই নায়ক। তিনি প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। পরিচালনা করেছেন প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র। জহির রায়হান পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী বিপ্লবী সিনেমা ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় ‘ফারুক’ চরিত্রটি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আখেরি স্টেশন, বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নীচে, জীবন থেকে নেয়া, নাচের পুতুল, পিচঢালা পথ, আবির্ভাব, দ্বীপ নেভে নাই, টাকা আনা পাই, অশ্রু দিয়ে লেখা, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, ছুটির ঘন্টা, চন্দ্রনাথ, শুভদা, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, বড় ভালো লোক ছিল, বাবা কেন চাকর তার ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক।
নায়করাজ রাজ্জাক প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন ‘কি যে করি’ ছবিতে অভিনয় করে। এরপর আরও চারবার তিনি জাতীয় সম্মাননা পান। এছাড়া ইন্দো-বাংলা কলা মিউজিক পুরস্কার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার, ২০১১ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র আজীবন সম্মাননা, ইফাদ ফিল্ম ক্লাব পুরস্কার পান তিনি।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক









