বিশেষ প্রতিবেদন
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গতিশীল ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রশাসনে পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ব্যাপক হারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এই প্রবণতা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
সচিব পর্যায়ে পরিবর্তন
সূত্র জানায়, বর্তমানে সরকারের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই সংখ্যা ছিল ৭৯ জন। সম্প্রতি কয়েকজনের চুক্তি বাতিল হওয়ায় তা কমে ৬৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে সাবেক আমলা এবিএম আব্দুস সাত্তার এবং স্বরাষ্ট্র সচিব হিসেবে মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে যেসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের অধিকাংশই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত।
ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণই হবে একমাত্র মাপকাঠি। একই সঙ্গে কেউ যেন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছিল।
তবে প্রশাসনের উচ্চপদে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেওয়ার ফলে অনেক নিয়মিত কর্মকর্তা বিষয়টিকে ইশতেহারের ঘোষণার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জটিলতা
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিমাত্রায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনের স্বাভাবিক কাঠামো ও ক্যারিয়ার ব্যবস্থায় নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।
প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
পদোন্নতিতে স্থবিরতা: চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের কারণে নিচের স্তরের নিয়মিত কর্মকর্তারা অনেক সময় প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন।
হতাশা ও ক্ষোভ: দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়, যা প্রশাসনের গতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
চাকরির অনিশ্চয়তা: চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ নির্দিষ্ট হওয়ায় কর্মস্থলে স্থায়িত্বের অভাব দেখা দেয়।
সুবিধা বঞ্চনা: স্থায়ী কর্মকর্তাদের মতো পেনশন, গ্রাচুইটি বা দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা সাধারণত চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা পান না।
প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা: বারবার চুক্তি নবায়ন বা নতুন চুক্তি দেওয়ার ফলে স্বাভাবিক পদোন্নতি প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।
স্বজনপ্রীতির ঝুঁকি: নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে পদে বসাতে এই পদ্ধতি ব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আইনি জটিলতা: বিদ্যমান ও পূর্ববর্তী বিধানের মধ্যে সাংঘর্ষিকতা থাকলে আইনি সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মত
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অনেক আগে অবসরে যাওয়া আমলাদের আবার দায়িত্বে আনা হলে নিয়মিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব তৈরি হয়। এতে প্রশাসনে পদোন্নতি নিয়ে জট তৈরি হতে পারে এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে প্রশাসনের কার্যকারিতার ওপর।”
অন্যদিকে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া মনে করেন, সীমিত পরিসরে এবং দক্ষতা বিনিময়ের উদ্দেশ্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া অস্বাভাবিক বা অবৈধ কিছু নয়। তার মতে, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রশাসনের কাজের গতি বাড়ানো সম্ভব।
কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সচিবালয়ের কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
তাদের প্রশ্ন, প্রশাসনে কি কেবল চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারাই ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গড়তে সক্ষম? নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে কি মেধা, সততা ও দক্ষতার অভাব রয়েছে?
তাদের মতে, প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার কিছুটা সরে এসেছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

